
আজকের পর্যটকের চোখে কাপ্তাই হ্রদ বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর জলভূমিগুলোর একটি। নীল-সবুজ জলের মধ্যে ছোট ছোট পাহাড়ি দ্বীপ, দূরে মেঘে ঢাকা পর্বত, নৌকার সরু পথ এবং সূর্যাস্তের আলো—সব মিলিয়ে এর ছবিতে এক ধরনের প্রশান্তি আছে। কিন্তু এই শান্ত জলের নিচে আছে বসতবাড়ি, আবাদি জমি, বৌদ্ধবিহার, বাজার, পথ এবং মানুষের স্মৃতি। আছে পুরোনো রাঙামাটি শহরের অংশ ও চাকমা রাজার প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ। যে হ্রদকে এখন পর্যটনের ভাষায় সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়, পাহাড়ি মানুষের স্মৃতিতে সেটিই ‘কান্নার হ্রদ’।
কাপ্তাই হ্রদ প্রকৃতির তৈরি নয়। কর্ণফুলী নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এটি সৃষ্টি করা হয়েছিল। প্রকল্পটি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের শিল্পায়ন ও আধুনিকায়নের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হয়। রাষ্ট্রের চোখে এটি ছিল অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রা; কিন্তু যে ভূখণ্ডের মানুষ তাদের ঘর, জমি ও সামাজিক জগৎ হারিয়েছিলেন, তাঁদের কাছে সেই আলো এসেছিল এক গভীর অন্ধকারের বিনিময়ে।
কাপ্তাই বাঁধের ইতিহাস তাই শুধু প্রকৌশল বা বিদ্যুতের ইতিহাস নয়। এটি রাষ্ট্র কীভাবে উন্নয়নের লাভ ও ক্ষতি বণ্টন করে, কার সম্মতি প্রয়োজন মনে করে এবং একটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বকে জাতীয় অগ্রগতির হিসাবের বাইরে সরিয়ে রাখে—তার ইতিহাস।
আধুনিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন ও স্নায়ুযুদ্ধের উন্নয়ন
কর্ণফুলী নদী থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ধারণা ঔপনিবেশিক আমলেই আসে। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়; পরবর্তী কয়েক দশকে বিভিন্ন স্থান নিয়ে সমীক্ষা চলে। ভারত ভাগের পর পূর্ব পাকিস্তান সরকার দ্রুত শিল্পায়নের জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে চায়। ১৯৫০-এর দশকের শুরুতে কাপ্তাইকে বাঁধের স্থান হিসেবে বেছে নেওয়া হয় এবং ১৯৫৭ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয়। ১৯৬২ সালে প্রকল্পের প্রথম পর্যায় শেষ হলে দুটি ৪০ মেগাওয়াট ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়। পরে আরও ইউনিট যোগ করে কেন্দ্রটির ক্ষমতা বাড়ানো হয়।
এই প্রকল্পকে তার সময়ের আন্তর্জাতিক রাজনীতি থেকে আলাদা করে দেখা যায় না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার নতুন রাষ্ট্রগুলো উন্নয়ন সহায়তার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। বৃহৎ বাঁধ, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেচব্যবস্থা এবং শিল্পকারখানাকে আধুনিকতার দৃশ্যমান প্রতীক হিসেবে দেখা হতো। পশ্চিমা সহায়তা শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয় ছিল না; নতুন রাষ্ট্রগুলোকে কমিউনিস্ট প্রভাব থেকে দূরে রাখার কৌশলও এর সঙ্গে যুক্ত ছিল।
কাপ্তাই প্রকল্পে পাকিস্তান সরকারের পাশাপাশি মার্কিন অর্থ ও কারিগরি সহায়তা ছিল। নির্মাণে যুক্ত ছিল মার্কিন প্রতিষ্ঠান। গবেষক অমৃত দিওয়ান জালা কাপ্তাই বাঁধকে মার্কিন সহায়তা, স্নায়ুযুদ্ধ এবং পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অধিকার—এই তিনটির সংযোগে বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর গবেষণা দেখায়, উন্নয়নের ভাষায় প্রকল্পটি জাতীয় অগ্রগতির প্রতীক হলেও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জমি, রাজনৈতিক অবস্থান এবং সম্মতির প্রশ্ন পরিকল্পনার কেন্দ্রে ছিল না।
বড় বাঁধ নির্মাণের প্রশাসনিক যুক্তি ছিল সরল: নদীকে নিয়ন্ত্রণ করা হবে, বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে, শিল্প বাড়বে এবং তার সুবিধা গোটা অর্থনীতি পাবে। কিন্তু লাভের এই জাতীয় হিসাবের পাশে ক্ষতির স্থানীয় হিসাব যথাযথভাবে রাখা হয়নি। কত পরিবার কোথায় যাবে, নতুন জমি কোথায় পাবে, তাদের কৃষি ও সামাজিক সম্পর্ক কীভাবে টিকবে—এসব প্রশ্ন প্রকৌশলগত পরিকল্পনার অধীন হয়ে পড়ে।
এর পেছনে পার্বত্য চট্টগ্রামের ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারও ছিল। সমতলের প্রশাসনের কাছে পাহাড় ছিল দূরবর্তী সীমান্তাঞ্চল; সেখানে বসবাসকারী চাকমা, মারমা এবং অন্যান্য জুম্ম জনগোষ্ঠীর ভূমি ব্যবস্থাকে ব্যক্তিমালিকানাভিত্তিক সমতলের ভূমি আইনের মতো দেখা হতো না। বহু জমির মালিকানা ছিল প্রথাগত ও সামষ্টিক। ফলে ক্ষতিপূরণের প্রশাসনিক হিসাবে কাগজে নিবন্ধিত সম্পত্তির গুরুত্ব পেলেও মানুষের বন, জুমভূমি, নদী, উপাসনালয় ও সামাজিক ভূগোলের মূল্য প্রায় অদৃশ্য থেকে যায়।

জল বাড়তে থাকলে যে দেশ হারিয়ে গেল
বাঁধের কাজ শেষ হওয়ার পর কর্ণফুলীর পানি আটকে বিশাল জলাধার তৈরি হতে থাকে। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিচু উপত্যকা, গ্রাম, ধানক্ষেত, ফলের বাগান, রাস্তা এবং ধর্মীয় স্থাপনা ডুবে যায়। বিভিন্ন গবেষণায় পরিমাণে কিছু পার্থক্য থাকলেও বহুল স্বীকৃত হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৫৪ হাজার একর আবাদি জমি নিমজ্জিত হয়েছিল—যা তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রামের মোট চাষযোগ্য জমির প্রায় ৪০ শতাংশ। প্রায় ১৮ হাজার পরিবার বা এক লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হন। তাঁদের প্রায় ৭০ শতাংশ ছিলেন চাকমা; মারমা ও অন্যান্য পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হন।
এক লাখ শুধু একটি সংখ্যা নয়। এর অর্থ হাজার হাজার পরিবারের কৃষিজমি, বসতভিটা ও জীবিকার ভিত্তি একসঙ্গে হারিয়ে যাওয়া। পাহাড়ি অঞ্চলে সমতল ও উর্বর জমি এমনিতেই সীমিত। বাঁধের পানিতে সবচেয়ে উর্বর নদী-উপত্যকা ডুবে যাওয়ায় শুধু ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার নয়, পুরো অঞ্চলের খাদ্য ও ভূমি ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি হয়। নতুন স্থানে গিয়ে একই ধরনের জমি পাওয়া সম্ভব ছিল না। কেউ উঁচু পাহাড়ে জুমচাষে ফিরে যান, কেউ অনিশ্চিত শ্রম ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় নির্ভর হন, আবার বহু মানুষ অঞ্চল ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন।
পানির নিচে চলে যায় পুরোনো রাঙামাটির অংশ এবং চাকমা রাজার প্রাসাদ। হারিয়ে যায় বহু বৌদ্ধবিহার, শ্মশান ও ঐতিহাসিক স্থান। রাষ্ট্র ক্ষতিপূরণের হিসাব জমি ও ঘরের দামে করতে চেয়েছিল, কিন্তু একটি জনগোষ্ঠীর স্মৃতি, পূর্বপুরুষের সমাধি, ধর্মীয় স্থান কিংবা সামাজিক সম্পর্কের মূল্য নির্ধারণের কোনো কার্যকর পদ্ধতি ছিল না। একটি গ্রাম শুধু কিছু ঘরের সমষ্টি নয়; সেখানে আত্মীয়তা, পারস্পরিক শ্রম, ধর্মীয় আচার, বাজার এবং পরিবেশের সঙ্গে বহু প্রজন্মের সম্পর্ক থাকে। স্থানান্তর মানে সেই সম্পূর্ণ জগৎ ভেঙে যাওয়া।
পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি ছিল, কিন্তু ব্যবস্থা প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য ও অসংগঠিত ছিল। একটি তুলনামূলক গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রায় ১৮ হাজার বাস্তুচ্যুত পরিবারের মধ্যে মাত্র ৪ হাজার ৯৩৮ পরিবারকে পুনর্বাসিত করা হয়েছিল। ক্ষতিপূরণ নিয়েও অভিযোগ ছিল—অনেক পরিবার পর্যাপ্ত অর্থ পায়নি, কেউ কোনো ক্ষতিপূরণই পায়নি, আবার যাঁরা পেয়েছিলেন তাঁদের জন্যও সমমূল্যের চাষযোগ্য জমি কেনা কঠিন ছিল। প্রথাগত অধিকারে ব্যবহৃত জমির নথি না থাকায় বহু মানুষ প্রশাসনিক স্বীকৃতির বাইরে পড়ে যান।
এই বাস্তুচ্যুতিকে পাহাড়ি মানুষের স্মৃতিতে ‘বড়া পরং’ বা মহাপ্রস্থান নামে স্মরণ করা হয়। আনুমানিক ৪০ হাজার চাকমা ভারতে চলে যান; আরও বহু মানুষ তৎকালীন বার্মা বা বর্তমান মিয়ানমারের দিকে আশ্রয় নেন। সংখ্যাগুলো সূত্রভেদে ভিন্ন, তবে সীমান্ত অতিক্রম করা মানুষের ব্যাপ্তি নিয়ে গবেষকদের মধ্যে দ্বিমত নেই। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যাওয়া চাকমাদের একটি অংশ পরে অরুণাচল প্রদেশে বসতি স্থাপন করেন। তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মের নাগরিকত্ব, ভূমি ও রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে বিরোধ বহু দশক ধরে চলেছে। অর্থাৎ কাপ্তাইয়ের পানি শুধু একটি জনপদ ডোবায়নি; দক্ষিণ এশিয়ায় দীর্ঘস্থায়ী শরণার্থী ও রাষ্ট্রহীনতার সমস্যাও তৈরি করেছে।
যাঁরা পার্বত্য চট্টগ্রামে থেকে গেলেন, তাঁদের জন্যও বাস্তুচ্যুতি শেষ হয়নি। উর্বর জমি হারানো, জনসংখ্যার চাপ এবং ভূমির অনিশ্চয়তা অঞ্চলের রাজনৈতিক অসন্তোষকে গভীর করে। কাপ্তাই বাঁধ একাই পার্বত্য চট্টগ্রামের পরবর্তী সংঘাতের কারণ নয়—জাতীয় পরিচয়, সাংবিধানিক স্বীকৃতি, বসতি স্থাপন, সামরিকীকরণ এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নও ছিল। কিন্তু বাঁধের অভিজ্ঞতা পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর কাছে একটি শক্তিশালী ঐতিহাসিক শিক্ষা হয়ে ওঠে: রাষ্ট্র উন্নয়নের নামে তাদের অস্তিত্ব ও সম্মতিকে উপেক্ষা করতে পারে। সেই অবিশ্বাস পরবর্তী রাজনীতির ভিতরে দীর্ঘ ছায়া ফেলেছে।
বিদ্যুতের লাভ, ইতিহাসের দেনা
কাপ্তাই জলবিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের বিদ্যুৎব্যবস্থায় বাস্তব অবদান রেখেছে। এটি এখনো দেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎকেন্দ্র। হ্রদকে কেন্দ্র করে মৎস্য আহরণ, নৌযোগাযোগ ও পর্যটনের অর্থনীতিও গড়ে উঠেছে। কয়েক প্রজন্ম ধরে বহু মানুষ এই নতুন জলভিত্তিক অর্থনীতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছেন। অতএব কাপ্তাইয়ের ইতিহাসকে শুধু একটি ব্যর্থ প্রকল্প হিসেবে দেখলে ছবির একটি অংশ বাদ পড়ে যাবে। বাঁধ বিদ্যুৎ দিয়েছে, অর্থনৈতিক কার্যক্রম সৃষ্টি করেছে এবং বাংলাদেশের জাতীয় অবকাঠামোর অংশ হয়েছে।
কিন্তু প্রকল্পের লাভ থাকলেই তার অন্যায় মুছে যায় না। বরং প্রশ্ন হলো, সেই লাভের জন্য যাঁরা সবচেয়ে বড় মূল্য দিয়েছেন, তাঁরা কি লাভের ন্যায্য অংশ পেয়েছেন? বিদ্যুৎ দূরের শহর ও শিল্পাঞ্চলে পৌঁছেছে; কিন্তু বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন, ভূমি ও নাগরিক অধিকার বহু ক্ষেত্রে অনিরসিত থেকেছে। উন্নয়নের সুবিধা জাতীয়, আর ক্ষতি স্থানীয় ও জাতিগত হলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব আরও বেশি হওয়া উচিত ছিল।
কাপ্তাই প্রকল্প এমন এক সময়ে নির্মিত হয়েছিল, যখন বড় বাঁধের সামাজিক ও পরিবেশগত ক্ষতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড আজকের মতো শক্ত ছিল না। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পূর্বানুমতি, পূর্ণ সামাজিক প্রভাব সমীক্ষা, জীবিকাভিত্তিক পুনর্বাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিপূরণ এখন উন্নয়ন আলোচনার স্বীকৃত নীতি। কিন্তু অতীতের মানদণ্ড দুর্বল ছিল বলে ঐতিহাসিক দায় শেষ হয়ে যায় না। রাষ্ট্র চাইলে এখনো ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও তাঁদের উত্তরসূরিদের নথিভুক্ত করতে পারে, অসম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ পর্যালোচনা করতে পারে, ডুবে যাওয়া সাংস্কৃতিক স্থানের ইতিহাস সংরক্ষণ করতে পারে এবং হ্রদের আয় থেকে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য ন্যায্য অংশ নিশ্চিত করতে পারে।
এই ইতিহাস সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও বৈপরীত্য আছে। পর্যটনের বিজ্ঞাপনে কাপ্তাই হ্রদের সৌন্দর্য দৃশ্যমান, কিন্তু সেই জলের নিচে হারানো গ্রামগুলোর নাম সাধারণ মানুষ খুব কমই জানেন। বাঁধ ও বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকৌশল সাফল্য হিসেবে স্মরণ করা হয়, বাস্তুচ্যুতির ইতিহাস থাকে বিচ্ছিন্ন গবেষণা, পারিবারিক স্মৃতি ও পাহাড়ি শিল্পীদের কাজে। রাষ্ট্রীয় ইতিহাস যখন কেবল উৎপাদিত মেগাওয়াটের হিসাব রাখে, তখন ডুবে যাওয়া জনপদের মানুষ দ্বিতীয়বার হারিয়ে যান—প্রথমবার ভূমি থেকে, দ্বিতীয়বার স্মৃতি থেকে।
কাপ্তাইয়ের অভিজ্ঞতা আজও প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশে বিদ্যুৎকেন্দ্র, অর্থনৈতিক অঞ্চল, সড়ক, বন্দর ও জলবায়ু অভিযোজন প্রকল্পের জন্য নিয়মিত ভূমি অধিগ্রহণ হচ্ছে। প্রতিটি প্রকল্পেই উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে। কিন্তু কাপ্তাই শেখায়, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে বাধা বা পরিসংখ্যান হিসেবে দেখলে উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক ক্ষত তৈরি করে। যথাযথ পরামর্শ, সম্মতি, পুনর্বাসন ও লাভের অংশীদারত্ব ছাড়া প্রকল্প শেষ হতে পারে, কিন্তু তার সামাজিক মূল্য পরিশোধ শেষ হয় না।
‘কান্নার হ্রদ’ নামটি তাই কেবল আবেগের ভাষা নয়। এটি জাতীয় উন্নয়নের হিসাবের একটি অনুপস্থিত কলাম। সেই কলামে আছে প্রায় এক লাখ মানুষের বাস্তুচ্যুতি, হারানো আবাদি জমি, সীমান্ত পেরিয়ে যাওয়া পরিবার এবং জলের নিচে চাপা পড়া একটি সামাজিক ভূগোল। কাপ্তাইয়ের বিদ্যুৎ বাংলাদেশের আধুনিকতার অংশ; তার নিচে ডুবে থাকা জনপদও বাংলাদেশের ইতিহাসের সমান অংশ। একটিকে উদ্যাপন করে অন্যটিকে ভুলে গেলে উন্নয়নের গল্প সম্পূর্ণ হয় না।
আজ হ্রদের শান্ত জলের দিকে তাকালে পাহাড়ের প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। কিন্তু ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় অন্য এক প্রতিচ্ছবি—রাষ্ট্রের আলো জ্বালাতে যাঁদের ঘর অন্ধকার হয়েছিল, তাঁদের। কাপ্তাইয়ের সত্যিকারের ইতিহাস শুরু হবে সেদিন, যেদিন আমরা হ্রদের সৌন্দর্যের সঙ্গে তার নিচে হারানো মানুষের নামও স্মরণ করতে শিখব।
আপনার মতামত জানানঃ