ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কের ইতিহাসে উত্থান-পতন নতুন কোনো ঘটনা নয়। ভৌগোলিক বাস্তবতা, অর্থনৈতিক নির্ভরতা, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং অভিন্ন নদীর মতো অসংখ্য ইস্যু দুই দেশকে যেমন একে অপরের ঘনিষ্ঠ করে, তেমনি রাজনৈতিক পরিবর্তন, সীমান্ত সংকট কিংবা অভ্যন্তরীণ ঘটনাও বারবার এই সম্পর্ককে কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করায়। সাম্প্রতিক সময়ে সেই পরীক্ষার নতুন নাম হয়ে উঠেছে শেখ হাসিনা ইস্যু। দুই বছর ধরে টানাপোড়েনের পর যখন ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে সম্পর্ক ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার ইঙ্গিত মিলছিল, তখন ভারতের রাজধানীতে একটি সংবাদ সম্মেলনে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে শেখ হাসিনার বক্তব্য এবং তা ঘিরে বাংলাদেশের তীব্র প্রতিক্রিয়া নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—দুই দেশের সম্পর্ক কি আবারও দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার দিকে যাচ্ছে, নাকি এটি কেবল সাময়িক রাজনৈতিক উত্তাপ?
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ভিত্তি কেবল কূটনৈতিক নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, অর্থনীতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন। তাই যেকোনো রাজনৈতিক সংকটের প্রভাব সীমান্তের দুই পাশেই অনুভূত হয়। গত দুই বছরে সেই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নাটকীয় পরিবর্তন আসে। দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনা সরকার বিদায় নেয় এবং তিনি ভারতে আশ্রয় নেন। এরপর থেকেই দুই দেশের সম্পর্কের কেন্দ্রে উঠে আসে তাঁর অবস্থান, প্রত্যর্পণ এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রশ্ন।
বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলার অগ্রগতি এবং তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি ক্রমেই কূটনৈতিক আলোচনার প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে। ঢাকার দৃষ্টিতে বিষয়টি বিচারিক ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। অন্যদিকে ভারত শুরু থেকেই বলে আসছে, তারা পরিস্থিতি মানবিক ও আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করছে। এই দুই ভিন্ন অবস্থানই সম্পর্কের মধ্যে দীর্ঘদিনের অস্বস্তির জন্ম দিয়েছে।
তবে চলতি বছরের শুরুতে পরিস্থিতিতে কিছুটা পরিবর্তনের আভাস দেখা যায়। বাংলাদেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ বাড়তে থাকে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা বিভিন্ন ধরনের ভিসা পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, জ্বালানি এবং আঞ্চলিক সংযোগ নিয়ে আলোচনাও গতি পায়। কূটনৈতিক মহলে তখন ধারণা তৈরি হয়েছিল, অতীতের উত্তেজনা ধীরে ধীরে প্রশমিত হচ্ছে এবং দুই দেশ বাস্তবতার ভিত্তিতে নতুন সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইছে।
ঠিক সেই সময়ে দিল্লিতে একটি সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল অংশগ্রহণ নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। সেখানে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতি, নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং দেশে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে বক্তব্য দেন। তাঁর বক্তব্যের রাজনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি এই প্রশ্নটিও সামনে আসে—ভারতের মাটিতে বসে একজন দণ্ডিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী কীভাবে এমন রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পেলেন?
বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া ছিল তাৎক্ষণিক এবং কড়া। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, এমন ঘটনা দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। একই সঙ্গে এটিকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অসম্মান বলেও উল্লেখ করা হয়। শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের দাবিও নতুন করে জোরালোভাবে সামনে আনা হয়। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের মন্ত্রী ও নীতিনির্ধারকের বক্তব্যেও একই ধরনের বার্তা উঠে আসে—ভারত যদি সত্যিই সম্পর্ক উন্নয়ন চায়, তাহলে বাংলাদেশবিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ দেওয়া উচিত নয়।
অন্যদিকে ভারত সরকার শুরু থেকেই এই ঘটনার দায় এড়ানোর চেষ্টা করেছে। তাদের দাবি, সংবাদ সম্মেলনটি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং এতে ভারত সরকারের কোনো ভূমিকা ছিল না। সেখানে শেখ হাসিনা যা বলেছেন, তা ভারতের সরকারি অবস্থান নয়। কিন্তু এই ব্যাখ্যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহল ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। অনেকের মতে, ভারতের মতো একটি রাষ্ট্রে উচ্চপ্রোফাইল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের এমন কর্মকাণ্ড সরকারি মহলের অজান্তে হওয়া কঠিন।
এই ঘটনায় একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—দুই দেশের সম্পর্ক এখনও আস্থার সংকট থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেনি। আনুষ্ঠানিক বৈঠক, কূটনৈতিক সৌজন্য কিংবা অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়লেও রাজনৈতিক বিশ্বাসের ঘাটতি রয়ে গেছে। আর সেই কারণেই একটি মাত্র ঘটনা সম্পর্ককে আবারও উত্তেজনার মুখে ঠেলে দিতে পেরেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকা ও দিল্লির বর্তমান সম্পর্ককে বোঝার জন্য শুধু বর্তমান ঘটনাকে দেখলে চলবে না। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক স্মৃতি, পারস্পরিক প্রত্যাশা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রভাব। বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের পর নতুন নেতৃত্ব ভারতের কাছ থেকে সমমর্যাদার সম্পর্ক প্রত্যাশা করছে। অন্যদিকে ভারতও দক্ষিণ এশিয়ায় তার কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় বাংলাদেশকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে উভয় পক্ষই সম্পর্ক নষ্ট করতে চায় না, কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা তাদের বারবার কঠিন অবস্থানে দাঁড় করায়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শেখ হাসিনা এখন শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা নন; তিনি বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের অন্যতম সংবেদনশীল কূটনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছেন। তাঁর অবস্থান, বক্তব্য, সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন কিংবা প্রত্যর্পণ—প্রতিটি বিষয়ই দুই দেশের সম্পর্কের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। ফলে ভবিষ্যতে তাঁর যেকোনো রাজনৈতিক পদক্ষেপ আবারও নতুন উত্তেজনার কারণ হতে পারে।
তবে এর মধ্যেও বাস্তবতার একটি বড় দিক রয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বছরে কয়েক বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হয়। বিদ্যুৎ আমদানি, জ্বালানি সহযোগিতা, রেল ও সড়ক যোগাযোগ, নৌপথ ব্যবহার, সীমান্ত নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ দমন এবং আঞ্চলিক সংযোগ—এসব ক্ষেত্র দুই দেশের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি জলবায়ু পরিবর্তন, নদী ব্যবস্থাপনা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার মতো বিষয়েও দুই দেশের সমন্বয় প্রয়োজন। তাই রাজনৈতিক উত্তেজনা থাকলেও সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের বিশ্লেষণও একই ধরনের। তাঁদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে উভয় দেশই নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে তুলে ধরবে। প্রকাশ্যে কড়া বক্তব্য, কূটনৈতিক প্রতিবাদ কিংবা রাজনৈতিক সমালোচনা বাড়তে পারে। কিন্তু পর্দার আড়ালে যোগাযোগ বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ ও ভারত কেউই দীর্ঘমেয়াদি বৈরিতার ঝুঁকি নিতে চাইবে না।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যত বেশি উত্তপ্ত হবে, শেখ হাসিনা ইস্যু তত বেশি গুরুত্ব পাবে। একইভাবে ভারতে এই বিষয়টি রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিবেচনার অংশ হয়ে উঠতে পারে। ফলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অনেকাংশে নির্ভর করবে দুই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর।
কূটনীতির একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো—সংকটের মধ্যেও যোগাযোগ চালিয়ে যাওয়া। অতীতেও বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নদীর পানি বণ্টন, সীমান্ত হত্যা, ছিটমহল, বাণিজ্য বৈষম্য কিংবা নিরাপত্তা ইস্যুতে বড় মতপার্থক্য ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সংলাপের মাধ্যমেই অধিকাংশ সমস্যার সমাধানের পথ খোঁজা হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতেও সেই অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক সপ্তাহ দুই দেশের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। নতুন কোনো কূটনৈতিক বৈঠক, উচ্চপর্যায়ের সফর কিংবা আনুষ্ঠানিক বার্তা সম্পর্কের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিতে পারে। একই সঙ্গে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বা দেশে ফেরার প্রশ্নে নতুন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে সেটিও পরিস্থিতিকে নতুন মোড় দিতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, ঢাকা–দিল্লি সম্পর্ক আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে আবেগের চেয়ে বাস্তবতা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক বক্তব্য সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু দুই দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা তাদের পরস্পরের কাছাকাছিই থাকতে বাধ্য করবে। তবু আস্থার সংকট দূর না হলে ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা আবারও সম্পর্ককে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে। তাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সংযত কূটনীতি, নিয়মিত সংলাপ এবং পারস্পরিক সংবেদনশীলতার প্রতি সম্মান। কারণ বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক শুধু দুই সরকারের নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক ভবিষ্যতের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।
আপনার মতামত জানানঃ