দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অন্যতম আলোচিত অধ্যায় হয়ে আছে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তিনি ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকেই দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক, আন্তর্জাতিক আইন, প্রত্যর্পণ চুক্তি, রাজনৈতিক আশ্রয় এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে নানা প্রশ্ন সামনে আসে। সম্প্রতি ভারতের সংসদীয় পররাষ্ট্রবিষয়ক স্থায়ী কমিটিকে নরেন্দ্র মোদি সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করলেও দেশটির মাটি ব্যবহার করে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারবেন না। একই সঙ্গে বাংলাদেশের পাঠানো প্রত্যর্পণ অনুরোধও ভারতের প্রচলিত আইন ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এই অবস্থান শুধু একটি ব্যক্তিকে ঘিরে নয়; বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতি, প্রতিবেশী নীতি এবং রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
ভারতের সংসদীয় পররাষ্ট্রবিষয়ক স্থায়ী কমিটির সর্বশেষ প্রতিবেদনে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে উঠে এসেছে। কংগ্রেস নেতা শশী থারুরের সভাপতিত্বে পরিচালিত কমিটির বৈঠকে সরকার জানায়, ভারত মানবিক কারণে শেখ হাসিনাকে অবস্থানের সুযোগ দিলেও তার ভূখণ্ডকে অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করতে দেবে না। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি নতুন কোনো নীতি নয়। বহু দেশই রাজনৈতিক আশ্রয় বা মানবিক কারণে কাউকে আশ্রয় দিলেও সেই ব্যক্তিকে স্বাগতিক দেশের ভূমি ব্যবহার করে নিজ দেশের রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দেয় না। ভারতের বক্তব্যও মূলত সেই আন্তর্জাতিক রীতির সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এই ঘোষণার গুরুত্ব আরও বেড়েছে কারণ সাম্প্রতিক সময়ে শেখ হাসিনার সম্ভাব্য বাংলাদেশ প্রত্যাবর্তন নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়েছিল। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চলতি বছরের শেষ নাগাদ তিনি বাংলাদেশে ফিরতে পারেন—এমন সম্ভাবনার প্রসঙ্গও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশের আইনমন্ত্রী এম আসাদুজ্জামান জানান, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেফতার করা হতে পারে। ফলে তার অবস্থান, প্রত্যাবর্তন এবং সম্ভাব্য বিচারপ্রক্রিয়া এখন কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; বরং তা আন্তর্জাতিক কূটনীতিরও আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
ভারতের অবস্থানকে বোঝার জন্য দেশটির দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতির দিকে তাকাতে হয়। স্বাধীনতার পর থেকে ভারত বহু রাজনৈতিক নেতা, মানবাধিকারকর্মী এবং সংকটাপন্ন ব্যক্তিকে মানবিক কারণে আশ্রয় দিয়েছে। তিব্বতের ধর্মীয় নেতা দালাই লামা থেকে শুরু করে প্রতিবেশী বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব—অনেকেই বিভিন্ন সময়ে ভারতে অবস্থান করেছেন। তবে একই সঙ্গে ভারত সবসময় একটি নীতি অনুসরণ করেছে—তাদের ভূখণ্ড যেন অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বা সশস্ত্র কার্যক্রম পরিচালনার কেন্দ্র না হয়। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও সরকার সেই নীতিরই পুনরাবৃত্তি করেছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
এদিকে বাংলাদেশের পাঠানো প্রত্যর্পণ অনুরোধ নিয়ে ভারতের বক্তব্যও তাৎপর্যপূর্ণ। কোনো ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণ করা হবে কি না, তা শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং সংশ্লিষ্ট দেশের আইন, দ্বিপক্ষীয় চুক্তি, আদালতের মতামত এবং মানবাধিকার বিষয়ক বিবেচনার ওপরও নির্ভর করে। ভারত জানিয়েছে, ঢাকার অনুরোধ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আইনি প্রক্রিয়া অনুসারে পর্যালোচনা করছে। অর্থাৎ বিষয়টি নিয়ে এখনই কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া হচ্ছে না। এর মাধ্যমে ভারত একদিকে আইনের শাসনের প্রতি আনুগত্যের বার্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে কূটনৈতিক ভারসাম্যও বজায় রাখার চেষ্টা করছে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বাস্তবতা অবশ্য শেখ হাসিনাকে ঘিরেই সীমাবদ্ধ নয়। গত কয়েক বছরে দুই দেশের সম্পর্ক নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেছে। নিরাপত্তা সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বাণিজ্য, নদীর পানি বণ্টন, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক সংযোগের মতো বহু ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কিছু বিষয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ভারতের সংসদীয় কমিটিও তাদের প্রতিবেদনে এই বাস্তবতা তুলে ধরে ভবিষ্যৎ সম্পর্ককে আরও স্থিতিশীল করার জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছে।
এর মধ্যে অন্যতম হলো বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য দ্রুত স্বাভাবিক ভিসা কার্যক্রম চালু করা। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তাজনিত কারণে ২০২৪ সালে পর্যটক ভিসা কার্যক্রম সীমিত হওয়ার পর দুই দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা দূরত্ব তৈরি হয়। শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা ও পর্যটনের জন্য প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি ভারতে যান। ভিসা প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ যেমন ভোগান্তিতে পড়েছেন, তেমনি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ওপরও এর প্রভাব পড়েছে। সংসদীয় কমিটির মতে, জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ যত বেশি হবে, সম্পর্ক তত বেশি শক্তিশালী হবে। তাই দ্রুত ভিসা স্বাভাবিক করার সুপারিশকে অনেকেই ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
প্রতিবেদনে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রেক্ষাপটে নতুন করে আলোচনা শুরু করার আহ্বান জানানো হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি বণ্টন দীর্ঘদিন ধরেই একটি সংবেদনশীল ইস্যু। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নদীর প্রবাহ, বর্ষার ধরণ এবং পানির প্রাপ্যতা পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে নতুন বাস্তবতা বিবেচনায় এনে চুক্তি নবায়নের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংসদীয় কমিটি। একই সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার রাজ্য সরকারের মতামতকেও গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে কূটনৈতিকভাবে সক্রিয় থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যদিও এই বিষয়টি বাংলাদেশে প্রায়ই রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেয়, তবুও প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। অতীতেও বিভিন্ন সময়ে উভয় দেশ এ ধরনের উদ্বেগ ও প্রত্যাশার কথা কূটনৈতিক পর্যায়ে তুলে ধরেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের এই সংসদীয় প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভারসাম্যপূর্ণ ভাষা। একদিকে মানবিক নীতির কথা বলা হয়েছে, অন্যদিকে অন্য দেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা না করার কঠোর অবস্থানও পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। আবার একই সঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও উন্নত করার জন্য ভিসা, পানি বণ্টন এবং জনগণের যোগাযোগ বৃদ্ধির মতো বাস্তবধর্মী বিষয়েও জোর দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ পুরো প্রতিবেদনের কেন্দ্রবিন্দু শুধু শেখ হাসিনা নন; বরং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ রূপরেখাও এতে প্রতিফলিত হয়েছে।
বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকেও এই ঘটনাপ্রবাহ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শেখ হাসিনার অবস্থান ও সম্ভাব্য প্রত্যর্পণ দেশের রাজনীতি, বিচারপ্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক—তিন ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলতে পারে। যদি ভারত প্রত্যর্পণ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, তবে সেটি দুই দেশের সম্পর্কের ওপর তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। আবার যদি আইনি প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়, তবে বিষয়টি আরও দীর্ঘ সময় আলোচনায় থাকতে পারে।
আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে রাজনৈতিক আশ্রয়, প্রত্যর্পণ এবং মানবিক বিবেচনার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা সবসময়ই একটি জটিল বিষয়। কোনো রাষ্ট্র তার ভূখণ্ডে অবস্থানরত ব্যক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বৈধ আইনি অনুরোধও বিবেচনা করে। ফলে এক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া, কূটনৈতিক আলোচনা এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা—সবকিছুই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সব মিলিয়ে ভারতের সংসদীয় কমিটিকে মোদি সরকারের দেওয়া এই বার্তা দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করছে। এতে যেমন শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ অবস্থান নিয়ে ভারতের নীতির একটি পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়, তেমনি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ অগ্রাধিকারগুলোরও প্রতিফলন ঘটে। মানবিক আশ্রয়, আইনের শাসন, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা, ভিসা সহযোগিতা, নদীর পানি বণ্টন এবং পারস্পরিক আস্থা—এই কয়েকটি বিষয়ই আগামী দিনে দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। শেখ হাসিনাকে ঘিরে আলোচনার বাইরে গিয়েও এই ঘটনাটি তাই দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক বাস্তবতা এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।
আপনার মতামত জানানঃ