
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ভেতর থেকে জন্ম নেওয়া একটি দল কি তার প্রতিষ্ঠার আদর্শ থেকেই দূরে সরে যাচ্ছে? ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেওয়ার পর থেকে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) যে অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনের মুখে পড়েছে, তা এখন প্রশ্ন তুলছে দলটির ভবিষ্যৎ অবস্থান নিয়েই।
জোট গঠনের শুরু থেকেই বিরোধ
নির্বাচনের আগে জামায়াতের ব্যানারে গড়ে ওঠা জোটে এনসিপি যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত দলের ভেতরেই সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। যুগ্ম আহ্বায়ক নুসরাত তাবাসসুম এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে দলের সব নির্বাচনি কার্যক্রম থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। তিনি অভিযোগ করেন, ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে জোটবদ্ধ হওয়া তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে একধরনের প্রতারণা করা হয়েছে।
এই অসন্তোষ বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। সময়ের সঙ্গে এটি রূপ নেয় ব্যাপক পদত্যাগের স্রোতে। রাঙামাটি জেলা কমিটির অন্তত সাতজন শীর্ষ নেতা একযোগে পদত্যাগ করেন, আর সামগ্রিকভাবে দলটির শীর্ষ পদে থাকা অন্তত ১৭ জন নেতা দল ছাড়েন। পদত্যাগকারীদের অনেকেই একই কারণ উল্লেখ করেছেন— গণঅভ্যুত্থানের রাজনীতি থেকে সরে আসা এবং “জামায়াত ট্যাগ” এড়ানোর তাগিদ।
নারী নেতৃত্বের প্রস্থান
জুনে এসে এই ভাঙন নতুন মাত্রা পায়, যখন একে একে দল ছাড়েন এনসিপির বেশ কয়েকজন নারী নেত্রী। তাদের বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে একই আক্ষেপ— যে দলকে তারা বহুত্ববাদী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভেবেছিলেন, নির্বাচনী রাজনীতির চাপে তা ক্রমশ জামায়াতের ছায়ায় ঢুকে পড়ছে। এক নেত্রীর ভাষায়, জুলাই রাজনীতির পুরো ধারাকেই কৌশলের নামে জামায়াতের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে।
জোট ছাড়ার গুঞ্জন, নাকি কৌশলগত দূরত্ব?
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হচ্ছে, খেলাফত মজলিস জোট ছাড়ার পর এনসিপির ভেতরেও জোটে থাকার লাভ-ক্ষতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছে। দলীয় সূত্রের বরাতে বলা হচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদে সাংগঠনিক বিস্তারের প্রশ্নে জামায়াত-নির্ভরতা কতটা সহায়ক— তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে দলের ভেতরেই। পাশাপাশি কওমি ঘরানার ইসলামপন্থী দলগুলোর সঙ্গে বিকল্প সমন্বয় এবং আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন জোট গঠনের সম্ভাবনাও বিবেচনায় রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
তবে এই আলোচনার বিপরীতে ভিন্ন সুরও শোনা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে এসব জল্পনাকে নিছক “চটুল আলাপ” বলে অভিহিত করে দাবি করা হয়েছে, এনসিপি আসলে জামায়াত জোটেই থাকছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, নির্বাচন-পরবর্তী সময় থেকে দলটি ১১ দলীয় ঐক্যের কর্মসূচিতে সক্রিয় না থাকলেও, তা জোট ত্যাগের সিদ্ধান্ত নয় বরং কর্মসূচিভিত্তিক দূরত্ব।
কেন এই টানাপোড়েন গুরুত্বপূর্ণ
এনসিপির অবস্থান শুধু একটি দলীয় সিদ্ধান্তের প্রশ্ন নয়— এটি জুলাই গণঅভ্যুত্থান-উত্তর রাজনীতির একটি বড় পরীক্ষা। যে তরুণ নেতৃত্ব রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে রাজনীতিতে এসেছিল, নির্বাচনী বাস্তবতার চাপে তাদের জোট-রাজনীতি কতটা মূল আদর্শ থেকে সরে যাচ্ছে— এই প্রশ্নই এখন দলের অভ্যন্তরে ও বাইরে সবচেয়ে বড় বিতর্কের বিষয়।
আপাতত পরিষ্কার এটুকুই— কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে জোট ভাঙার ঘোষণা দেয়নি। তবে পদত্যাগের ধারাবাহিকতা, নেতৃত্বের প্রকাশ্য অসন্তোষ এবং সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাসের গুঞ্জন মিলিয়ে এনসিপির ভেতরে একটি গভীর সাংগঠনিক টানাপোড়েন যে চলছে, তা অস্বীকারের উপায় নেই। স্থানীয় সরকার নির্বাচন যতই এগিয়ে আসবে, ততই স্পষ্ট হবে দলটি শেষ পর্যন্ত কোন পথে হাঁটে।
আপনার মতামত জানানঃ