
নির্বাচনী জোট আর রাজনৈতিক জোট এক জিনিস নয় — এই পার্থক্যটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে এবার নগ্নভাবে সামনে এসেছে। ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গড়ে ওঠা জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য ভাঙছে ঠিক তখনই, যখন নির্বাচন কমিশন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তফসিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
কারা বেরিয়ে গেল
গত ২৫ জুলাই কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার অধিবেশনে খেলাফত মজলিস (আবদুল বাছিত আজাদ) আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয়, তারা ১১ দলীয় ঐক্যের সব কর্মসূচি থেকে বিরত থাকবে। দলটির প্রচার সম্পাদক প্রকৌশলী আব্দুল হাফিজ খসরুর ভাষ্য: এটি আনুষ্ঠানিক জোট ছিল না, ছিল জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে একটি সমঝোতা; নির্বাচন শেষ, সমঝোতার প্রয়োজনও শেষ। এখন তাদের লক্ষ্য নিজেদের সংগঠন গোছানো এবং স্থানীয় নির্বাচনের নিজস্ব প্রস্তুতি।
তার আগে থেকেই বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন কার্যত জোটের বাইরে। ঘোষণা না দিয়েও ১২ ফেব্রুয়ারির পর থেকে দলটি জোটের কোনো কর্মসূচিতে যায়নি। দলের মহাসচিব মাওলানা ইউসুফ সাদিক হক্কানীর অভিযোগ — নির্বাচনে তাদের একটি আসনও ছাড় দেওয়া হয়নি, আর যথাযথ মূল্যায়নও হয়নি।
ভাঙনের ইঙ্গিত জমছিল কয়েক মাস ধরেই: ১৩ জুন চট্টগ্রামের বিভাগীয় সমাবেশের পর খেলাফত মজলিস অনুরোধ জানায় ভবিষ্যতে তাদের দল ও নেতাদের নাম ব্যানারে না রাখতে; এরপর ময়মনসিংহ, রংপুর ও সিলেটের সমাবেশ বর্জন; বরিশালের পোস্টারে দুই খেলাফতের নেতাদের নাম না থাকা নিয়ে প্রকাশ্য বিতর্ক।
অসন্তোষের চার স্তর
জোটের ভেতরের সূত্রগুলো যে অভিযোগগুলো সামনে আনছে, সেগুলো মূলত চারটি:
আসন বণ্টন। নির্বাচনে জামায়াত ৬৮, এনসিপি ৬, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২ ও খেলাফত মজলিস ১টি আসনে জেতে। সাধারণ ৭৭ ও সংরক্ষিত ১৩ — মোট ৯০ আসন নিয়ে জোটটি প্রধান বিরোধী শক্তিতে পরিণত হয়। কিন্তু ছোট শরিকদের হিসাবে, ভাগ-বাঁটোয়ারায় তারা কার্যত শূন্য হাতে ফিরেছে।
উচ্চকক্ষে প্রতিনিধিত্ব। সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রস্তাবিত উচ্চকক্ষে কে কতটুকু জায়গা পাবে — এ নিয়ে অনিশ্চয়তা ছোট দলগুলোর ক্ষোভ বাড়িয়েছে।
স্থানীয় নির্বাচনে একক প্রার্থী। খেলাফত মজলিসের রংপুর মহানগর সভাপতি তৌহিদুর রহমান মণ্ডল রাজু প্রকাশ্যে অভিযোগ করেন, ১১টি সিটি করপোরেশনে জামায়াত এককভাবেই মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করেছে। এনসিপিও সিটি, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন মিলিয়ে ১০০ প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে।
সিদ্ধান্তে অবমূল্যায়ন। শরিকদের বক্তব্য, লিয়াজোঁ কমিটি কার্যকরভাবে মতামত নেয়নি; গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে মূলত জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে।
জামায়াত এসব অস্বীকার করেছে। দলের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়েরের বক্তব্য — এটি স্থায়ী জোট নয়, নির্বাচনকেন্দ্রিক ঐক্য; সাংগঠনিক শক্তি ও মাঠের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই সমঝোতা হয়েছিল, আর নির্বাচনের পর ব্যক্তিগত ক্ষোভ থাকা অস্বাভাবিক নয়।
ক্যালেন্ডারটাই আসল চাপ
নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার গত ২২ জুলাই জানিয়েছেন, আগস্টের মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা এবং অক্টোবরে প্রথম ধাপের ভোট আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসি। স্থানীয় নির্বাচনের নতুন আচরণবিধির খসড়াও প্রায় চূড়ান্ত।
এখানেই জোট-রাজনীতির মৌলিক টানাপড়েন। জাতীয় নির্বাচনে জোট মানে আসন ভাগ — ৩০০ আসনে দর-কষাকষি। কিন্তু স্থানীয় নির্বাচন হয় হাজার হাজার ইউনিয়ন, উপজেলা, পৌরসভা ও সিটিতে; সেখানে প্রতিটি দলকে নিজের সাংগঠনিক অস্তিত্ব প্রমাণ করতে হয় ওয়ার্ড পর্যায়ে। ছোট দলের জন্য জোটে থাকা মানে প্রার্থিতা ছেড়ে দেওয়া, আর প্রার্থী না দেওয়া মানে তৃণমূলে দলীয় কাঠামো নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া। ফলে ভাঙনটি আদর্শিক নয় — সাংগঠনিক টিকে থাকার হিসাব।
ক্ষমতাসীন দিকেও একই চাপ, ভিন্ন চেহারায়। বিএনপির হাইকমান্ড থেকে নির্দেশনা গেছে স্থানীয় নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী ঠেকানোর; দলীয় চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জেলা পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার সরকারের জন্য স্থানীয় ভোটে সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রায়ই নিজের দলেরই বঞ্চিত প্রার্থী।
যা দেখার বাকি
এক, ইসলামি দলগুলোর “বৃহত্তর ঐক্য” আবার গড়ে উঠবে কি না। খেলাফত মজলিসের বিজ্ঞপ্তিতে ভবিষ্যতে বৃহত্তর ঐক্যের সম্ভাবনা খোলা রাখা হয়েছে — অর্থাৎ দরজা বন্ধ নয়, দর-কষাকষির অবস্থান বদলেছে মাত্র। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আগেই আলাদা পথ নিয়েছিল।
দুই, জামায়াত ও এনসিপির সম্পর্ক। ছোট শরিকদের অভিযোগ, জোটে এনসিপির নতুন নেতৃত্বই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। কিন্তু স্থানীয় নির্বাচনে দুই দল একই আসনে প্রার্থী দিলে এই ঘনিষ্ঠতাও পরীক্ষায় পড়বে। এনসিপি ইতিমধ্যে সারা দেশে বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে; হবিগঞ্জে দলটির নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে।
তিন, মেরুকরণের চেহারা। ২০২৪-পরবর্তী রাজনীতিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনই হবে প্রথম বড় মাঠপর্যায়ের শক্তি পরীক্ষা। জোট ছাড়া আলাদা লড়াই মানে ভোট বিভাজন — যার প্রথম সুবিধাভোগী সাধারণত সবচেয়ে বড় সংগঠিত দলটিই।
জাতীয় নির্বাচনের ৯০ আসনের জোট অক্টোবরের আগে কতটুকু টিকে থাকে, সেটিই এখন বিরোধী রাজনীতির মূল প্রশ্ন।
আপনার মতামত জানানঃ