
বিদ্যুতের দাম সাধারণ মানুষের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বিদ্যুৎ শুধু একটি সেবা নয়, বরং জীবনমান উন্নয়নের অন্যতম প্রধান উপকরণ। তাই বিদ্যুতের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বশীলতা, স্বচ্ছতা এবং যথাযথ যাচাই-বাছাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি এবং পরে তা দ্রুত প্রত্যাহারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবারও প্রশ্ন উঠেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)-এর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে। এই ঘটনা শুধু একটি প্রশাসনিক ভুলের উদাহরণ নয়; বরং এটি দেখিয়ে দিয়েছে কীভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত লাখো মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে এবং যথাযথ পর্যালোচনার অভাবে জনমনে বিভ্রান্তি ও অসন্তোষ সৃষ্টি হতে পারে।
গত ৩ জুন বিইআরসি নতুন বিদ্যুতের দর ঘোষণা করে। ওই ঘোষণায় লাইফলাইন গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৪ টাকা ৬৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৫ টাকা ৩২ পয়সা করা হয়। একই সঙ্গে ০ থেকে ৭৫ ইউনিট ব্যবহারকারী গ্রাহকদের জন্য প্রতি ইউনিটের মূল্য ৫ টাকা ২৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৬ টাকা ১৮ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু মাত্র এক দিনের ব্যবধানে এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে বাধ্য হয় কমিশন। সমালোচনার মুখে আগের দাম বহাল রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। ফলে লাইফলাইন গ্রাহকদের জন্য প্রতি ইউনিট ৪ টাকা ৬৩ পয়সা এবং ০-৭৫ ইউনিট ব্যবহারকারীদের জন্য ৫ টাকা ২৬ পয়সা হারই কার্যকর থাকে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, কেন প্রথমে এমন একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, যা পরদিনই সংশোধন করতে হলো? সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর বক্তব্য থেকে জানা যায়, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) গণশুনানির সময়ই একটি সম্পূরক প্রস্তাব জমা দিয়েছিল। সেই প্রস্তাবে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, শূন্য থেকে ৫০ ইউনিট এবং শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট ব্যবহারকারী গ্রাহকদের জন্য বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি না করাই উচিত। অর্থাৎ যারা সবচেয়ে কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন এবং সাধারণত নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত, তাদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি না করার সুপারিশ করেছিল পিডিবি। কিন্তু কমিশন সেই প্রস্তাব বিবেচনায় নেয়নি এবং সব আবাসিক গ্রাহকের জন্য মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে।
বাংলাদেশে লাইফলাইন গ্রাহক ধারণাটি মূলত দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে স্বল্পমূল্যে বিদ্যুৎ সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে চালু করা হয়েছে। সাধারণভাবে তিনটি বাতি এবং দুটি পাখা ব্যবহারকারী একটি পরিবার মাসে প্রায় ৫০ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ করে। গ্রামীণ এলাকায় কৃষক, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং নিম্ন আয়ের অসংখ্য পরিবার এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। তাদের জন্য বিদ্যুৎ শুধু আলোর উৎস নয়; এটি শিক্ষার সুযোগ, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
একটি বাড়িতে বিদ্যুৎ থাকলে শিশুরা রাতের বেলায় পড়াশোনা করতে পারে। গৃহিণীরা গৃহস্থালির কাজ সহজে সম্পন্ন করতে পারেন। মোবাইল ফোন চার্জ করা থেকে শুরু করে তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণ পর্যন্ত সবকিছুই বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। তাই এই শ্রেণির মানুষের জন্য সামান্য মূল্যবৃদ্ধিও বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে। সরকারের পক্ষ থেকেও অতীতে বারবার বলা হয়েছে যে, কেরোসিনের তুলনায় কম খরচে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে মানুষ বিদ্যুৎ ব্যবহারে উৎসাহিত হবে এবং গ্রামীণ জীবনমানের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে প্রায় ১ কোটি ৭৮ লাখ ৮২ হাজার লাইফলাইন ও স্বল্প ব্যবহারকারী গ্রাহক রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৬১ লাখের বেশি সংযোগ গ্রামীণ এলাকায় অবস্থিত। অর্থাৎ বিদ্যুতের এই দুই ধাপের গ্রাহকেরা মূলত সমাজের অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল অংশের প্রতিনিধিত্ব করেন। তাদের জন্য মূল্যবৃদ্ধি মানে সরাসরি জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি।
এ কারণেই পিডিবি শুরু থেকেই এই দুটি ধাপে মূল্যবৃদ্ধির বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু সেই প্রস্তাব উপেক্ষা করে কমিশন যখন দাম বৃদ্ধি করল, তখন প্রশ্ন ওঠে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে। পরে আবার একই প্রস্তাবের ভিত্তিতেই মূল্যবৃদ্ধি প্রত্যাহার করা হয়। এতে স্পষ্ট হয় যে বিষয়টি নিয়ে পর্যাপ্ত যাচাই-বাছাই হয়নি অথবা সংশ্লিষ্ট প্রস্তাব যথাযথ গুরুত্ব পায়নি।
বিইআরসির একজন কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, বিষয়টি কমিশনের নজরেই আসেনি। যদি সত্যিই তা হয়ে থাকে, তাহলে এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ কোনো সাধারণ প্রশাসনিক কাজ নয়। এর সঙ্গে জড়িত থাকে হাজার কোটি টাকার হিসাব, জাতীয় অর্থনীতি, শিল্পখাত, কৃষি এবং কোটি কোটি মানুষের জীবনযাত্রা। এমন একটি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব নজর এড়িয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা ও পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন সৃষ্টি করে।
আইন অনুযায়ী বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে গণশুনানির পর ৯০ দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এবার গণশুনানি শেষ হওয়ার মাত্র ১৩ দিনের মাথায় নতুন মূল্য ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে আবার ঈদের ছুটিও ছিল। ফলে কার্যত মাত্র কয়েকটি কর্মদিবসে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। এত অল্প সময়ে লাখ লাখ গ্রাহক, হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি, উৎপাদন ব্যয় এবং বিতরণ ব্যবস্থার নানা দিক বিশ্লেষণ করা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে সন্দেহ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় তাড়াহুড়া করলে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। একটি ভুল সিদ্ধান্ত শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই করে না, বরং প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থাও কমিয়ে দেয়। বিদ্যুতের মতো মৌলিক সেবার ক্ষেত্রে এই আস্থার গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।
সাম্প্রতিক এই ঘটনা আরও একটি বিষয় সামনে নিয়ে এসেছে। অতীতে বিইআরসির ধীরগতির কারণে সরকার নির্বাহী আদেশে বিদ্যুতের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা পেয়েছিল। পরে সেই ব্যবস্থা বাতিল করে পুনরায় বিইআরসির হাতে দায়িত্ব ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু অনেকের ধারণা, কমিশনের ওপর এখনো এক ধরনের চাপ বা অদৃশ্য প্রভাব কাজ করে। ফলে স্বাধীনভাবে সব প্রস্তাব যাচাই করার পরিবর্তে কখনো কখনো দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রবণতা দেখা যায়।
যদিও পিডিবির চেয়ারম্যান বিষয়টিকে মানবিক ভুল হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন এবং দ্রুত সংশোধনের জন্য কমিশনের প্রশংসা করেছেন, তবুও প্রশ্ন থেকে যায়—যদি গণমাধ্যমে সমালোচনা না হতো, তাহলে কি এই ভুল সংশোধিত হতো? জনগণের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভুল হওয়ার পর সংশোধন অবশ্যই ইতিবাচক পদক্ষেপ; তবে আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো ভবিষ্যতে যাতে এমন ভুল না হয়, সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অর্থনৈতিক প্রভাব। পুরোনো মূল্য বহাল রাখার ফলে বিতরণ কোম্পানিগুলোর বছরে প্রায় ৭৮১ কোটি টাকা আয় কমবে বলে জানা গেছে। কিন্তু একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, এই অর্থ সাধারণ মানুষের পকেট থেকেই আসত। অর্থাৎ একদিকে কোম্পানির সম্ভাব্য আয় কমলেও অন্যদিকে নিম্ন আয়ের লাখো পরিবার কিছুটা স্বস্তি পাবে। সামাজিক ন্যায়বিচারের দৃষ্টিকোণ থেকে এই ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ।
একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণ বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে সেই উন্নয়নের সুফল কতটা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায় তার ওপর। বিদ্যুতের মতো মৌলিক সেবার ক্ষেত্রে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুবিধা বজায় রাখা তাই সামাজিক দায়িত্বের অংশ।
সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি ও প্রত্যাহারের ঘটনাটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত কতটা প্রয়োজন। গণশুনানি শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং সেখানে উত্থাপিত প্রতিটি প্রস্তাব ও মতামত গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা উচিত। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে পর্যাপ্ত সময় নিয়ে বিশ্লেষণ করাও জরুরি।
ভবিষ্যতে বিদ্যুতের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে আরও শক্তিশালী মূল্যায়ন ব্যবস্থা, স্বাধীন পর্যালোচনা এবং জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। কারণ বিদ্যুতের প্রতিটি ইউনিট শুধু একটি অর্থনৈতিক হিসাব নয়; এটি একটি পরিবারের স্বপ্ন, একটি শিশুর শিক্ষা, একটি কৃষকের উৎপাদন এবং একটি জাতির উন্নয়নের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণের প্রতিটি সিদ্ধান্ত হতে হবে সতর্ক, দায়িত্বশীল এবং জনগণের কল্যাণমুখী। সাম্প্রতিক ঘটনাটি সেই প্রয়োজনীয়তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক হয়ে থাকবে।
আপনার মতামত জানানঃ