
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি কখনোই শুধু বর্তমানের ঘটনা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এখানে প্রতিটি সংঘাতের শিকড় বহু দশক, কখনো কখনো শতাব্দীজুড়ে বিস্তৃত। একটি দেশের সীমান্তের ভেতরে ঘটে যাওয়া ঘটনা খুব দ্রুতই অন্য দেশের কূটনীতি, নিরাপত্তা ও অর্থনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, ইসরায়েল ও লেবাননকে ঘিরে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, সেটি আবারও সেই বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত থেকে কূটনৈতিক উপায়ে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছেন। কিন্তু তাঁর সেই প্রচেষ্টার পথে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তার নাম হয়ে উঠেছে লেবানন।
প্রথম দেখায় বিষয়টি অনেকের কাছে বিস্ময়কর মনে হতে পারে। কারণ ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা। সেখানে ছোট একটি দেশ লেবানন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? উত্তর খুঁজতে গেলে মধ্যপ্রাচ্যের জটিল ভূরাজনীতির গভীরে যেতে হয়।
লেবানন এমন একটি দেশ, যা দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান একে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। ইসরায়েলের উত্তরে অবস্থিত এই দেশ বহু বছর ধরে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ফলে লেবাননের মাটিতে সংঘটিত যেকোনো সামরিক বা রাজনৈতিক ঘটনা সরাসরি ইরান ও ইসরায়েলের সম্পর্ককে প্রভাবিত করে।
বর্তমান সংকটের পেছনেও রয়েছে সেই পুরোনো সমীকরণ। ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে হিজবুল্লাহকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে। অন্যদিকে ইরান হিজবুল্লাহকে কেবল একটি মিত্র গোষ্ঠী নয়, বরং আঞ্চলিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখে। ফলে হিজবুল্লাহর ওপর হামলা মানে অনেক সময় ইরানের স্বার্থের ওপর আঘাত হিসেবেও বিবেচিত হয়।
এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে চাইছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ বেড়েছে। তেলের বাজার অস্থির হয়েছে, বৈশ্বিক বাণিজ্য ঝুঁকির মুখে পড়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ট্রাম্পের লক্ষ্য হলো একটি রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে আনা। কিন্তু লেবাননে নতুন উত্তেজনা সেই প্রচেষ্টাকে বারবার প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাবলি তারই প্রমাণ। বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে সম্ভাব্য ইসরায়েলি হামলার হুমকি এবং পরবর্তী সামরিক উত্তেজনা ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা স্থগিত করার কথা ভাবতে বাধ্য করে। যদিও পরবর্তীতে কূটনৈতিক তৎপরতায় পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে, তবুও এটি দেখিয়ে দিয়েছে যে লেবাননের মাটিতে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা কত দ্রুত আন্তর্জাতিক কূটনীতিকে নাড়িয়ে দিতে পারে।
ট্রাম্পের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, তিনি একদিকে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে আলোচনারও পক্ষপাতী। এই দুই অবস্থান সবসময় একসঙ্গে বজায় রাখা সহজ নয়। কারণ ইসরায়েল নিরাপত্তার প্রশ্নে আপস করতে রাজি নয়, আর ইরান মনে করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কার্যত একই কৌশলগত লক্ষ্য অনুসরণ করছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র যখন মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তখন তেহরানের সন্দেহ পুরোপুরি দূর করা কঠিন হয়ে পড়ে।
লেবানন সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো হিজবুল্লাহর বাস্তব অবস্থান। গত কয়েক বছরে ইসরায়েলি হামলায় সংগঠনটি দুর্বল হয়েছে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন। কিন্তু বাস্তবে হিজবুল্লাহ এখনো লেবাননের রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর গভীরে প্রোথিত। তারা শুধু একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী নয়; শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সহায়তা এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমেও তাদের প্রভাব বিস্তৃত। ফলে তাদের সম্পূর্ণভাবে নিষ্ক্রিয় করা বা নিরস্ত্র করা সহজ কোনো কাজ নয়।
ইসরায়েল অবশ্য বারবার দাবি করছে যে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করতেই হবে। কিন্তু লেবাননের রাজনৈতিক বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। দেশটি ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। খ্রিষ্টান, সুন্নি মুসলিম, শিয়া মুসলিম এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রেখে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়। এই কাঠামোর মধ্যে হিজবুল্লাহকে ঘিরে যেকোনো পদক্ষেপ বড় ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
এ কারণেই লেবাননের নেতারা সাধারণত ধীরে এগোনোর পক্ষে। তারা মনে করেন, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর অংশগ্রহণে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া কোনো স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। কিন্তু ইসরায়েল নিরাপত্তার প্রশ্নে দ্রুত ফলাফল চায়। এই দুই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে লেবাননের ভূমিকা সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত দেশটি ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গেছে। এরপরও রাজনৈতিক সংকট, অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং বিদেশি হস্তক্ষেপের কারণে দেশটি পুরোপুরি স্থিতিশীল হতে পারেনি। ১৯৮২ সালে ইসরায়েলি আগ্রাসন, সিরিয়ার দীর্ঘ প্রভাব এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান লেবাননের রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে দুর্বল করে দিয়েছে। ফলে দেশটি আজও বহিরাগত শক্তির প্রতিযোগিতার এক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো বৈশ্বিক অর্থনীতি। ইরান-সংক্রান্ত উত্তেজনা বাড়লে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে পড়ে। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের জ্বালানি সরবরাহ এই নৌপথের ওপর নির্ভরশীল। যুদ্ধ বা অবরোধের আশঙ্কা দেখা দিলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যায় এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি হয়। ফলে লেবাননের মতো একটি দেশেও যদি সংঘাত বৃদ্ধি পায়, তার প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ট্রাম্প সম্প্রতি দাবি করেছেন যে তিনি দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন এবং আলোচনার পথ খোলা রেখেছেন। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস বলে, এই অঞ্চলে সাময়িক শান্তি এবং স্থায়ী সমাধান এক জিনিস নয়। বহুবার যুদ্ধবিরতি হয়েছে, বহুবার কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, কিন্তু গভীর রাজনৈতিক বিরোধের কারণে সেই প্রচেষ্টাগুলো টেকসই হয়নি।
ইরান ও ইসরায়েলের সম্পর্কও তেমনই। দুই দেশের মধ্যে আদর্শিক, কৌশলগত এবং নিরাপত্তাগত বিরোধ এতটাই গভীর যে একটি চুক্তি দিয়ে তা সহজে দূর করা সম্ভব নয়। লেবানন সেই বিরোধের অন্যতম প্রতিফলন। ফলে লেবাননের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল থাকলে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনাও সবসময় ঝুঁকির মধ্যে থাকবে।
বর্তমান বাস্তবতায় ট্রাম্প এমন একটি অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছেন, যেখানে তাঁকে একই সঙ্গে যুদ্ধ থামানো, মিত্রকে সন্তুষ্ট রাখা এবং প্রতিপক্ষকে আলোচনার টেবিলে ধরে রাখার চেষ্টা করতে হচ্ছে। এটি কূটনৈতিকভাবে অত্যন্ত কঠিন একটি ভারসাম্য। সামান্য ভুল পদক্ষেপও পুরো প্রক্রিয়াকে ভেঙে দিতে পারে।
সব মিলিয়ে লেবানন আজ শুধু একটি সংকটাপন্ন দেশ নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সংঘাতের প্রতীক। এখানে ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগ, ইরানের আঞ্চলিক কৌশল, যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক স্বার্থ এবং বহু দশকের ঐতিহাসিক বিরোধ এক জায়গায় এসে মিলিত হয়েছে। ফলে লেবাননে উত্তেজনা কমানো ছাড়া ইরানকে ঘিরে কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খুঁজে পাওয়া কঠিন।
ট্রাম্প হয়তো সাময়িকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছেন। কিন্তু ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে সংকটের আগুন কখনো পুরোপুরি নিভে যায় না; বরং সুযোগ পেলেই আবার জ্বলে ওঠে। আর সেই কারণেই লেবানন আজ ট্রাম্পের ইরান কূটনীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এবং সম্ভবত সবচেয়ে বড় বাধা।
আপনার মতামত জানানঃ