বাংলাদেশে আবারও উদ্বেগজনকভাবে ফিরে এসেছে একসময় প্রায় নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়া একটি সংক্রামক রোগ—হাম। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি মৃত্যুর ঘটনাও বাড়ছে, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে আরও পাঁচ শিশুর মৃত্যু সেই আশঙ্কাকেই আরও জোরালো করেছে। এর মধ্যে একটি শিশুর শরীরে পরীক্ষার মাধ্যমে হাম নিশ্চিত করা হয়েছে, আর বাকি চারজনের ক্ষেত্রে উপসর্গের ভিত্তিতে ধারণা করা হয়েছে যে তারা হামেই আক্রান্ত ছিল। এই সংখ্যাগুলো নিছক পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন, এবং এক অনাকাঙ্ক্ষিত শোকের গল্প।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে সারা দেশে আরও ১ হাজার ৩৫৮ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা গেছে। এই সংখ্যা ইঙ্গিত দেয় যে সংক্রমণটি এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং একটি বিস্তৃত জনস্বাস্থ্য সমস্যায় রূপ নিচ্ছে। সিলেটে এক শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হওয়ার পর তার মৃত্যু হয়েছে, আর ঢাকাসহ খুলনা, রাজশাহী ও সিলেট অঞ্চলে উপসর্গের ভিত্তিতে আরও চার শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এতে বোঝা যাচ্ছে যে রোগটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে এবং এর বিস্তার রোধ করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি।
গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গে দেশে মোট ২২০ শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ৪৪ জনের ক্ষেত্রে পরীক্ষার মাধ্যমে হাম নিশ্চিত করা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে ৩৩ হাজার ৩৮৬ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে এবং ২২ হাজার ৪৪২ শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। যদিও আশার কথা হলো, এর মধ্যে ১৯ হাজার ১৮ শিশু চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে, তবুও বাকি সংখ্যাগুলো আমাদের সামনে এক কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরে। প্রায় ৪ হাজার ৬৯৩ শিশুর শরীরে ইতোমধ্যে হাম শনাক্ত হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে সংক্রমণটি দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ছে।
হাম মূলত একটি ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ, যা খুব সহজেই এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তিতে ছড়াতে পারে। বিশেষ করে যেসব শিশু এখনো টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আসেনি বা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তারা এই রোগে বেশি আক্রান্ত হয়। জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে লালচে ফুসকুড়ি—এই উপসর্গগুলো সাধারণত হামের লক্ষণ হিসেবে দেখা যায়। কিন্তু সমস্যা হলো, অনেক ক্ষেত্রে এই উপসর্গগুলোকে প্রথম দিকে সাধারণ ঠান্ডা বা ভাইরাল জ্বর ভেবে অবহেলা করা হয়, ফলে রোগটি দ্রুত জটিল আকার ধারণ করে।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে হাম নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করা হয়েছে এবং একসময় তা অনেকাংশে সফলও হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নানা কারণে সেই অগ্রগতি কিছুটা ব্যাহত হয়েছে। করোনাভাইরাস মহামারির সময় স্বাস্থ্যসেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ, নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে বিঘ্ন, এবং অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকদের সচেতনতার অভাব—এই সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি আবারও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অনেক শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকা না পাওয়ায় তারা সংক্রমণের ঝুঁকিতে থেকে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের মতো রোগের ক্ষেত্রে প্রতিরোধই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। টিকা গ্রহণের মাধ্যমে এই রোগকে প্রায় সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব। কিন্তু যখন টিকাদানের হার কমে যায়, তখনই এই ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। তাই এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো টিকাদান কর্মসূচিকে আরও জোরদার করা এবং যেসব শিশু এখনো টিকা পায়নি, তাদের দ্রুত টিকার আওতায় আনা।
এছাড়া অভিভাবকদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় গ্রামাঞ্চল বা নিম্নআয়ের পরিবারগুলোতে রোগের লক্ষণ সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকায় চিকিৎসা নিতে দেরি হয়। ফলে রোগটি মারাত্মক হয়ে ওঠে এবং মৃত্যুঝুঁকি বাড়ে। তাই গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে অভিভাবকরা দ্রুত লক্ষণ চিনতে পারেন এবং সময়মতো চিকিৎসা নিতে পারেন।
স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতাও এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এত সংখ্যক শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করানো এবং তাদের চিকিৎসা দেওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাব থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। তাই স্বাস্থ্যখাতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ বাড়ানো এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
এদিকে পুষ্টির বিষয়টিও হামের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অপুষ্টিতে ভোগা শিশুরা এই রোগে বেশি আক্রান্ত হয় এবং তাদের ক্ষেত্রে জটিলতা বেশি দেখা যায়। তাই শিশুদের সঠিক পুষ্টি নিশ্চিত করা, বিশেষ করে ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ খাবার দেওয়া, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা হামের সময় ভিটামিন ‘এ’ সাপ্লিমেন্ট দেওয়ার পরামর্শ দেন, যা রোগের জটিলতা কমাতে সাহায্য করে।
বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের সামনে একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়—হামকে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। এটি শুধু একটি সাধারণ রোগ নয়; সঠিক সময়ে ব্যবস্থা না নিলে এটি প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। তাই এখনই প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, যেখানে সরকার, স্বাস্থ্যকর্মী, অভিভাবক এবং পুরো সমাজ একসঙ্গে কাজ করবে। টিকাদান নিশ্চিত করা, দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ, এবং সচেতনতা বৃদ্ধি—এই তিনটি বিষয় যদি ঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে এই সংকট অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
সবশেষে বলা যায়, প্রতিটি শিশুর জীবন অমূল্য। একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগে একটি শিশুর মৃত্যু মানে শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতার প্রতিফলন। তাই এই পরিস্থিতিকে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে নিয়ে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবারকে এমন করুণ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।
আপনার মতামত জানানঃ