দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নির্মিত, দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত পড়ে থাকা কয়েকটি এয়ারস্ট্রিপ আবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতির প্রেক্ষাপটে। ভারতের কেন্দ্র সরকার পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরায় অবস্থিত এসব পুরোনো এয়ারস্ট্রিপ পুনরায় চালু করার উদ্যোগ নেওয়ার খবর সামনে আসার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রতিবেশী বাংলাদেশসহ আঞ্চলিক পর্যায়ে নানা প্রশ্ন ও বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের তিন পাশ ঘেঁষে অবস্থিত পাঁচটি এয়ারস্ট্রিপ পুনরুজ্জীবনের পরিকল্পনাকে অনেকেই কেবল যোগাযোগ উন্নয়নের উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন না; বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে দেখছেন নিরাপত্তা, কৌশলগত ভারসাম্য এবং ক্রমবদলমান ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের বাস্তবতাকে।
ভারতের দাবি অনুযায়ী, এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোর সঙ্গে আঞ্চলিক যোগাযোগ জোরদার করা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত আকাশপথ ব্যবহারযোগ্য রাখা। কিন্তু ভারতীয় গণমাধ্যম ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশ মনে করছেন, এর পেছনে আরও গভীর কৌশলগত হিসাব রয়েছে। বিশেষ করে শিলিগুড়ি করিডর বা ‘চিকেন নেক’ নামে পরিচিত সরু ভূখণ্ডটির নিরাপত্তা নিয়ে ভারতের দীর্ঘদিনের উদ্বেগ নতুন করে সামনে এসেছে। উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্যের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের একমাত্র স্থলসংযোগ এই করিডরের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এই অঞ্চলে সামান্য অস্থিরতাও ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হয়।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে লালমনিরহাট বিমানঘাঁটি পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ ভারতের কৌশলগত মহলে বাড়তি সতর্কতা তৈরি করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। লালমনিরহাটের অবস্থান শিলিগুড়ি করিডরের খুব কাছাকাছি হওয়ায় বিষয়টি দিল্লির দৃষ্টিতে সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। যদিও বাংলাদেশ সরকার স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, এই বিমানঘাঁটি শুধুমাত্র নিজস্ব জাতীয় প্রয়োজনে ব্যবহৃত হবে এবং অন্য কোনো দেশের সামরিক বাহিনীকে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হবে না, তবুও ভারতীয় সূত্রগুলো বলছে—নয়াদিল্লি কোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে রাজি নয়। এরই মধ্যে উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও সীমান্তবর্তী এলাকায় ভারতের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর নানা পদক্ষেপ দৃশ্যমান হচ্ছে।
যেসব এয়ারস্ট্রিপ পুনরুজ্জীবনের কথা বলা হচ্ছে, সেগুলোর বেশির ভাগই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রবাহিনীর প্রয়োজনে নির্মিত হয়েছিল। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর দীর্ঘদিন ধরে সেগুলো কার্যত অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকে। কোথাও রানওয়ে ভেঙে গেছে, কোথাও ঘন জঙ্গল দখল করেছে পুরো এলাকা, আবার কোথাও জনবসতি গড়ে উঠেছে রানওয়ের একেবারে কাছেই। ফলে এগুলোকে পূর্ণাঙ্গ বিমানবন্দর হিসেবে গড়ে তোলা সহজ কাজ নয়। প্রতিরক্ষা সূত্রগুলোও স্বীকার করছে, বড় আকারের সামরিক বা বাণিজ্যিক অপারেশনের জন্য এসব এয়ারস্ট্রিপ আদর্শ নয়। তবে জরুরি পরিস্থিতিতে হেলিকপ্টার বা ছোট বিমান ওঠানামার উপযোগী করে রাখাই এখন মূল লক্ষ্য।
এই উদ্যোগের সময়কালও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক নানা ইস্যুতে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পানি বণ্টন, সীমান্ত হত্যা, বাণিজ্য ভারসাম্য, ভিসানীতি এবং আঞ্চলিক রাজনীতির নানা প্রশ্নে পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি তৈরি হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন। এমন পরিস্থিতিতে সীমান্তঘেঁষা এলাকায় সামরিক ও কৌশলগত অবকাঠামো জোরদার করার যে কোনো উদ্যোগ স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহের চোখে দেখা হয়।
ভারতের পক্ষ থেকে অবশ্য বারবার বলা হচ্ছে, এই এয়ারস্ট্রিপগুলো চালু করার পেছনে আগ্রাসী কোনো উদ্দেশ্য নেই। বরং প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মানবিক সহায়তা, উদ্ধার অভিযান কিংবা যোগাযোগব্যবস্থা সচল রাখার মতো কাজে এগুলো ব্যবহার করা হতে পারে। উত্তর-পূর্ব ভারতের ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় আকাশপথ অনেক সময়ই সবচেয়ে কার্যকর যোগাযোগমাধ্যম হয়ে ওঠে। বর্ষাকালে ভূমিধস, বন্যা বা সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে ছোট এয়ারস্ট্রিপগুলো বড় ভূমিকা রাখতে পারে—এমন যুক্তিও তুলে ধরছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তবে সমালোচকেরা বলছেন, যদি বিষয়টি কেবল বেসামরিক বা মানবিক ব্যবহারের জন্য হতো, তাহলে এতটা সামরিক পরিকল্পনার ভাষায় আলোচনা হতো না। ‘রানওয়ে সর্বদা অপারেশনাল রাখার’ মতো বক্তব্য কিংবা সীমান্তের কাছাকাছি নতুন সেনাঘাঁটি স্থাপনের তথ্য এই উদ্যোগকে ভিন্ন মাত্রা দিচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও আসামে নতুন করে যে সেনাঘাঁটিগুলো স্থাপন করা হয়েছে, সেগুলোও একই কৌশলগত মানচিত্রের অংশ হিসেবে দেখছেন অনেক বিশ্লেষক।
বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি দেখলে উদ্বেগের পাশাপাশি কূটনৈতিক সতর্কতার প্রয়োজনীয়তাও সামনে আসে। দক্ষিণ এশিয়ায় শক্তির ভারসাম্য বরাবরই স্পর্শকাতর বিষয়। এক পক্ষের নিরাপত্তা উদ্যোগ অন্য পক্ষের কাছে হুমকি হিসেবে প্রতিভাত হতে পারে—এটাই বাস্তবতা। তাই এই ধরনের উদ্যোগ নিয়ে সরাসরি উত্তেজনা তৈরি না করে কূটনৈতিক চ্যানেলে স্বচ্ছতা ও আস্থা বাড়ানো জরুরি বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা।
একই সঙ্গে এই ঘটনাপ্রবাহ দক্ষিণ এশিয়ায় সামরিকীকরণের প্রবণতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, জলবায়ু সংকট, দারিদ্র্য ও মানবিক চ্যালেঞ্জ যেখানে অঞ্চলের প্রধান সমস্যা, সেখানে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা ও সামরিক ব্যয় কতটা যুক্তিসংগত—এই প্রশ্নও উঠছে। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার অবকাঠামোকে আবার সামরিক প্রয়োজনে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি অনেকের কাছে প্রতীকী অর্থ বহন করছে; যেন পুরোনো যুদ্ধের ছায়া নতুন বাস্তবতায় ফিরে আসছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার দীর্ঘ ইতিহাস যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে অবিশ্বাস ও অসমতার অভিজ্ঞতাও। সীমান্তঘেঁষা সামরিক অবকাঠামো বৃদ্ধি যদি পারস্পরিক আস্থাকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করে, তাহলে তার প্রভাব শুধু কূটনীতিতে নয়, বাণিজ্য, যোগাযোগ ও জনগণের সম্পর্কেও পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের তিন পাশে ভারতের পাঁচটি এয়ারস্ট্রিপ পুনরায় চালু করার উদ্যোগ কেবল একটি অবকাঠামোগত সিদ্ধান্ত নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতির জটিল বাস্তবতার একটি প্রতিফলন। এই উদ্যোগ কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, কীভাবে তা ব্যবহৃত হবে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে কীভাবে তা নিয়ে যোগাযোগ রাখা হবে—এসবের ওপরই নির্ভর করবে এটি আস্থার নতুন সংকট তৈরি করবে নাকি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার অংশ হয়ে উঠবে। সময়ই বলবে, এই পুরোনো রানওয়েগুলো ভবিষ্যতে কেবল বিমান নামানোর কাজে ব্যবহৃত হবে, নাকি এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকবে আরও গভীর কৌশলগত বার্তা।
আপনার মতামত জানানঃ