
মানুষের বিবর্তনের ওপর যে চাপগুলো কাজ করে, সেগুলোর মধ্যে একটি বড় পরিবর্তন হয়তো এখন ঘটছে—যা আমাদের বিবর্তনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হতে পারে।
বিভিন্ন বিজ্ঞানী দলের মতে, এখন মানুষের বিবর্তনকে প্রভাবিত করছে মূলত আমাদের সংস্কৃতি—যেমন প্রযুক্তি, চিকিৎসা এবং একসাথে সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা। আগে যেখানে পরিবেশ এবং শারীরিক সীমাবদ্ধতা বিবর্তনকে চালিত করত, এখন সেই জায়গা দখল করছে মানুষের তৈরি সমাধান।
কারণ আমরা যেসব প্রযুক্তি তৈরি করি—যেমন সেন্ট্রাল হিটিং বা কনট্যাক্ট লেন্স—এসব জীবনের সমস্যাগুলোকে অনেক দ্রুত সমাধান করে দেয়। ফলে শরীরকে সেই সমস্যা মোকাবিলার জন্য ধীরে ধীরে জেনেটিকভাবে পরিবর্তিত হতে হয় না।
ইউনিভার্সিটি অব মেইনের গবেষক টিম ওয়ারিং বলেন, “মানব বিবর্তন যেন এখন গতি বদলাচ্ছে। আমরা যখন একে অপরের কাছ থেকে দক্ষতা, প্রযুক্তি বা সামাজিক ব্যবস্থা শিখি, তখন আমরা সাংস্কৃতিকভাবে অভিযোজিত হচ্ছি। সংস্কৃতি জিনগত বিবর্তনের চেয়ে অনেক দ্রুত সমস্যার সমাধান করে।”
বিবর্তন সাধারণত ধীর একটি প্রক্রিয়া, যা বহু প্রজন্ম ধরে ঘটে। পরিবেশের চাপের কারণে কিছু জিন টিকে থাকে এবং পরবর্তী প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে।
এর একটি পরিচিত উদাহরণ হলো ম্যালেরিয়া। যেসব অঞ্চলে ম্যালেরিয়া বেশি, সেখানে সিকল সেল জিনও বেশি দেখা যায়। কারণ এই জিন বহনকারীরা ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে কিছুটা সুরক্ষা পায়, ফলে তারা বেঁচে থাকার বেশি সুযোগ পায়।
মানব ইতিহাসে সংস্কৃতিও বিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে। যেমন, প্রাপ্তবয়স্ক বয়সেও দুধ হজম করার ক্ষমতা গড়ে উঠেছে পশুপালনভিত্তিক সমাজে। আবার কানাডার একটি জনগোষ্ঠীতে দেখা গেছে, গত ১৪০ বছরে নারীদের প্রথম সন্তান নেওয়ার বয়স কমে গেছে—যা জেনেটিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
মানুষ এখনও বিবর্তিত হচ্ছে, এবং পরিবেশ এখনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে গবেষকদের মতে, এখন সংস্কৃতি প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে।
ওয়ারিংয়ের সহকর্মী জাকারি উড বলেন, “সংস্কৃতি জেনেটিক বিবর্তনকে খুব সহজেই ছাড়িয়ে গেছে।”
তবে এর মানে এই নয় যে সংস্কৃতি নতুন জিন তৈরি করছে। বরং এটি অনেক ক্ষেত্রে সেই চাপ কমিয়ে দিচ্ছে, যা আগে মানুষের জীবনকে ছোট করে দিত।
উদাহরণস্বরূপ, আগে বড় শিশুর জন্ম দিতে গিয়ে অনেক মা মারা যেতেন। এখন সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে মা ও শিশু দুজনই বেঁচে যেতে পারেন। ফলে আগের মতো প্রাকৃতিক নির্বাচনের চাপ আর নেই।
আবার একসময় প্লেগের মতো রোগ লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছিল, যা মানুষের জিনেও প্রভাব ফেলেছিল। কিন্তু এখন চিকিৎসার কারণে সেই ধরনের প্রাকৃতিক নির্বাচন অনেকটাই কমে গেছে।
ওয়ারিং ও উড একটি তত্ত্ব তৈরি করেছেন, যেখানে বলা হয়েছে—সংস্কৃতি যেহেতু জিনের তুলনায় দ্রুত পরিবর্তিত হয়, তাই এটি ধীরে ধীরে মানুষের বৈশিষ্ট্য নির্ধারণের পদ্ধতিই বদলে দিচ্ছে। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, এই পরিবর্তন ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে এবং হয়তো দ্রুত বাড়ছে।
ওয়ারিং একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলেন: “আপনার জীবনের সাফল্য নির্ধারণে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কী—আপনার জন্মগত জিন, নাকি আপনি কোন দেশে বাস করছেন?”
তার মতে, এখন মানুষের জীবনের মান নির্ভর করছে তার চারপাশের সামাজিক কাঠামো, প্রযুক্তি এবং সমাজের ওপর—জিনের চেয়ে অনেক বেশি।
কিছু গবেষক মনে করেন, এই পরিবর্তনের আরও গভীর প্রভাব থাকতে পারে। যদি প্রযুক্তি মানুষের ওপর প্রাকৃতিক নির্বাচনের চাপ কমিয়ে দেয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে বিবর্তনের ধরণই বদলে যেতে পারে।
২০২৫ সালের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, মানুষ এতটাই সফলভাবে প্রাকৃতিক চাপ কমিয়ে ফেলেছে যে, এতে আমাদের বিবর্তন প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
তারা মনে করেন, ভবিষ্যতে মানুষকে টিকে থাকতে হলে হয়তো আরও বেশি প্রযুক্তি এবং চিকিৎসার ওপর নির্ভর করতে হবে—কারণ প্রাকৃতিক নির্বাচন কমে গেলে কিছু ক্ষতিকর বৈশিষ্ট্যও টিকে থাকতে পারে।
অর্থাৎ, আমরা প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিজেদের জীবন সহজ করেছি, কিন্তু এর ফলে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে যেখানে বেঁচে থাকার জন্য আমাদের আরও বেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করতে হবে।
তবে এই ধারণা বিতর্কিত। এটি এমন কিছু প্রশ্ন তোলে, যা অতীতে ইউজেনিক্সের মতো বিতর্কিত ধারণার সাথে মিল রাখে—যেখানে মানুষের জিন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছিল।
ওয়ারিং মনে করেন, সমাধান শুধুমাত্র প্রযুক্তিতে নয়। বরং মানুষের সামাজিক সংগঠন, সহযোগিতা এবং সংস্কৃতিই ভবিষ্যতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তিনি বলেন, “সংস্কৃতি মানুষকে আরও সহযোগিতামূলক এবং কার্যকর করে তোলে। যদি সংস্কৃতি প্রধান ভূমিকা পালন করতে থাকে, তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে আমাদের সমাজ কতটা শক্তিশালী এবং অভিযোজিত তার ওপর।”
আপনার মতামত জানানঃ