বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেই ঢাকায় এসেছেন ভারতের বহিঃগোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং—‘র’-এর প্রধান পরাগ জৈন। দুই দেশের সম্পর্ককে স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে আনার নানা প্রচেষ্টার মধ্যে তার এই সফরকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে এই সফর যখন আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পক্ষ থেকেই ঘোষণা করা হয়নি, তখন পর্দার আড়ালে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে আলোচনা হতে পারে—এমন ধারণাই জোরালো হচ্ছে।
সরকারের একটি সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আমন্ত্রণেই পরাগ জৈন চার সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়ে ঢাকায় এসেছেন। রোববার দুপুরে এয়ার ইন্ডিয়ার একটি ফ্লাইটে তারা ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। প্রতিনিধি দলের অন্য সদস্যরা হলেন অশ্বীন মুকুন্দ কোটনিস, রাহুল নেগি এবং শৈবাল রায় চৌধুরী। সফরকালে তারা ঢাকার একটি হোটেলে অবস্থান করবেন বলে সরকারি সূত্র জানিয়েছে।
গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানের কোনো দেশে সফর সাধারণ কূটনৈতিক সফরের মতো নয়। এ ধরনের সফরের বড় অংশই থাকে নীরব, আনুষ্ঠানিকতার বাইরে এবং সংবেদনশীল। প্রকাশ্যে হয়তো কোনো বৈঠকের ঘোষণা থাকে না, সংবাদ সম্মেলনও হয় না; কিন্তু নিরাপত্তা, সীমান্ত, সন্ত্রাসবাদ, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, আঞ্চলিক রাজনীতি এবং দুই দেশের পারস্পরিক আস্থার মতো বিষয় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হতে পারে। ফলে পরাগ জৈনের ঢাকা সফরকে শুধু একটি সরকারি সফর হিসেবে দেখলে এর কূটনৈতিক গুরুত্বের বড় অংশই আড়ালে থেকে যাবে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নানা মাত্রায় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। দীর্ঘদিন দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা থাকলেও বিভিন্ন সময় সীমান্ত পরিস্থিতি, পানি বণ্টন, বাণিজ্য, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনকে ঘিরে সম্পর্কে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিবর্তন আসার পর সেই সম্পর্কের সমীকরণ আরও জটিল হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা এখন তাই আগের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এই প্রেক্ষাপটে ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠানের প্রধানের ঢাকায় উপস্থিতি আলাদা করে নজর কাড়ছে। কারণ ‘র’ মূলত ভারতের বৈদেশিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের সঙ্গে যুক্ত। প্রতিবেশী দেশগুলোর রাজনৈতিক, সামরিক, নিরাপত্তা ও কৌশলগত পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ এবং ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করা সংস্থাটির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের অংশ। ফলে সংস্থাটির প্রধান যখন কোনো প্রতিবেশী দেশে সরাসরি সফর করেন, তখন সেটিকে সাধারণ প্রশাসনিক যোগাযোগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া স্বাভাবিক।
তবে এই সফর নিয়ে অতিরিক্ত জল্পনাও সতর্কতার সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। যেহেতু বাংলাদেশ বা ভারত—কোনো পক্ষই এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে সফরের বিস্তারিত প্রকাশ করেনি, তাই আলোচনার বিষয়বস্তু সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়। রাজনৈতিক মহল বা বিভিন্ন সূত্র নানা ধরনের সম্ভাবনার কথা বললেও সেগুলোকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
তারপরও বর্তমান আঞ্চলিক বাস্তবতায় কয়েকটি বিষয় স্বাভাবিকভাবেই আলোচনায় আসতে পারে। দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা, সীমান্ত পরিস্থিতি, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণ তার মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত। এখানে অবৈধ পাচার, মানবপাচার, মাদক, অস্ত্র এবং অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দুই দেশের আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে সীমান্তে প্রাণহানি বা উত্তেজনার মতো বিষয়ও দুই দেশের জনমনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে আঞ্চলিক নিরাপত্তা। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত, বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক একে অপরের সঙ্গে নানা দিক থেকে যুক্ত। অর্থনীতি, বন্দর, যোগাযোগ, প্রতিরক্ষা এবং ভূরাজনৈতিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশকে ঘিরে ভারত ও চীনের আগ্রহও দীর্ঘদিনের। পরাগ জৈন ঢাকায় আসার আগে চীন সফর করেছেন—এই তথ্যও তার বর্তমান সফরকে আরও কৌতূহলোদ্দীপক করে তুলেছে। একই সময়সীমায় দিল্লি ও ঢাকার পাশাপাশি বেইজিংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগের বিষয়টি আঞ্চলিক কৌশলগত হিসাবের অংশ হিসেবে পর্যবেক্ষণ করা হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্যও এই সফরের গুরুত্ব কম নয়। একটি প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক যখন পুনর্গঠনের পর্যায়ে থাকে, তখন শুধু রাজনৈতিক পর্যায়ে যোগাযোগ যথেষ্ট নয়। নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা পর্যায়ের যোগাযোগও অনেক সময় সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে দুই দেশের মধ্যে এমন কিছু বিষয় থাকে, যা প্রকাশ্য কূটনৈতিক বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা করা সম্ভব হয় না। সেগুলো নিয়ে নিরাপদ ও সরাসরি যোগাযোগের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।
গোয়েন্দা পর্যায়ের যোগাযোগের একটি বড় সুবিধা হলো—এখানে অনেক সময় রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে সরাসরি আলোচনা করা যায়। দুই পক্ষের উদ্বেগ, সন্দেহ কিংবা ভুল বোঝাবুঝি কমানোর ক্ষেত্রেও এ ধরনের যোগাযোগ ভূমিকা রাখতে পারে। সম্পর্কের সংকট যখন গভীর হয়, তখন শুধু প্রকাশ্য বিবৃতি দিয়ে আস্থা ফিরিয়ে আনা কঠিন। পর্দার আড়ালের যোগাযোগ সেই প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
পরাগ জৈনের বর্তমান দায়িত্বও এই সফরকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি ‘র’-এর সেক্রেটারি হওয়ার পাশাপাশি স্পেশাল প্রোটেকশন গ্রুপ বা এসপিজির স্পেশাল সেক্রেটারি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। অর্থাৎ ভারতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ দুটি ক্ষেত্রের সঙ্গে তার সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে। ফলে তার নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের ঢাকায় আসা নিছক আনুষ্ঠানিক সফর নয়—এমন ধারণা তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
তবে এ সফরকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষের প্রতি ভারতের অবস্থান পরিবর্তনের সরাসরি প্রমাণ হিসেবেও দেখা ঠিক হবে না। গোয়েন্দা পর্যায়ের সফর সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত। সরকার পরিবর্তন বা রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন হলেও প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা সংক্রান্ত যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় না। বরং নতুন বাস্তবতার সঙ্গে যোগাযোগের কাঠামো পুনর্গঠন করা প্রয়োজন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। দেশের পররাষ্ট্রনীতিতে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা একটি বড় কৌশলগত প্রয়োজন। ভারতের সঙ্গে ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। আবার একই সঙ্গে চীনসহ অন্যান্য শক্তিশালী রাষ্ট্রের সঙ্গেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত যোগাযোগ রয়েছে। ফলে ঢাকার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিজের জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে সব পক্ষের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ বজায় রাখা।
পরাগ জৈনের সফর সেই বৃহত্তর কূটনৈতিক বাস্তবতার একটি অংশ হতে পারে। এর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা যোগাযোগ নতুন করে সক্রিয় হচ্ছে কি না, সেটিই এখন পর্যবেক্ষণের বিষয়। সফর শেষে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রকাশ্যে কিছু না বললেও পরবর্তী সময়ে দুই দেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর যোগাযোগ, সীমান্ত পরিস্থিতি কিংবা কূটনৈতিক তৎপরতায় পরিবর্তন দেখা গেলে এই সফরের প্রকৃত গুরুত্ব সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
এখানে আরেকটি বিষয়ও বিবেচনায় রাখা দরকার। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক শুধু সরকার বনাম সরকারের সম্পর্ক নয়; এটি দুই দেশের জনগণ, ব্যবসা-বাণিজ্য, সীমান্তবাসী, যোগাযোগ, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। ফলে রাজনৈতিক বা নিরাপত্তা পর্যায়ের সম্পর্কের উন্নতি শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে। সীমান্তে স্থিতিশীলতা, বাণিজ্যিক যোগাযোগ বৃদ্ধি, ভ্রমণ সহজ হওয়া এবং পারস্পরিক আস্থা বাড়ার মতো বিষয়গুলো দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক ফল দিতে পারে।
অন্যদিকে, যদি দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাস থেকেই যায়, তাহলে গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা পর্যায়ের যোগাযোগ আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ ভুল বোঝাবুঝি বা সন্দেহ কখনো কখনো রাজনৈতিক সম্পর্কের চেয়েও দ্রুত নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে দুই পক্ষের উদ্বেগ বোঝা এবং প্রয়োজনীয় সমন্বয় করা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো, পরাগ জৈনের সফরটি এমন এক সময়ে হচ্ছে যখন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নতুন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে—এমন প্রেক্ষাপটে ভারতের শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তার ঢাকায় উপস্থিতি সেই প্রচেষ্টার নিরাপত্তা ও কৌশলগত দিকটিকে সামনে নিয়ে এসেছে। যদিও সফরের আলোচ্যসূচি এখনো প্রকাশ্যে আসেনি, তবু এর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের একটি নতুন পর্বের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত এই সফরের সাফল্য নির্ভর করবে শুধু বৈঠক হয়েছে কি না তার ওপর নয়; বরং বৈঠকের পর দুই দেশের সম্পর্কের বাস্তব গতিপথে কোনো পরিবর্তন আসে কি না, তার ওপর। সীমান্ত নিরাপত্তা থেকে শুরু করে আঞ্চলিক ভূরাজনীতি—সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ ও ভারতের স্বার্থের পাশাপাশি মতপার্থক্যও রয়েছে। এসব পার্থক্যকে অস্বীকার না করে পারস্পরিক স্বার্থের জায়গাগুলো চিহ্নিত করা এবং নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখাই হতে পারে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে কার্যকর পথ।
পরাগ জৈনের ঢাকা সফর তাই আপাতদৃষ্টিতে নীরব হলেও এর তাৎপর্য নীরব নয়। কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই একটি উচ্চপর্যায়ের গোয়েন্দা প্রতিনিধি দলের ঢাকা সফর দেখিয়ে দিচ্ছে, দুই দেশের সম্পর্কের এমন কিছু স্তর রয়েছে যেখানে যোগাযোগ অব্যাহত থাকে, এমনকি প্রকাশ্য কূটনীতিতে যখন অনেক কিছুই স্পষ্ট নয়। এখন দেখার বিষয়, এই সফর কেবল তথ্য ও মতবিনিময়ের একটি পর্ব হয়ে থাকে, নাকি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে নতুন বাস্তবতায় পুনর্গঠনের বৃহত্তর প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ হিসেবে সামনে আসে।
আপনার মতামত জানানঃ