
১৯৯০ সালের ২ আগস্ট। ভোর হওয়ার আগেই ইরাকের রিপাবলিকান গার্ডের ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান সীমান্ত পেরিয়ে কুয়েতের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে। আকাশ থেকে নামানো হয় বিশেষ বাহিনী; সমুদ্রপথেও পরিচালিত হয় অভিযান। প্রায় এক লাখ ইরাকি সেনার সামনে ছোট দেশ কুয়েতের প্রতিরক্ষা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভেঙে পড়ে। রাজধানী কুয়েত সিটি দখল করে নেয় ইরাকি বাহিনী। আমির শেখ জাবের আল-আহমদ আল-সাবাহ ও রাজপরিবারের সদস্যরা সৌদি আরবে আশ্রয় নেন।
মাত্র কয়েক ঘণ্টার সামরিক অভিযানে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র কার্যত মানচিত্র থেকে মুছে যায়। সাদ্দাম হোসেন প্রথমে কুয়েতে একটি অনুগত সরকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। পরে দেশটিকে সরাসরি ইরাকের অংশ ঘোষণা করা হয়। কুয়েতকে অভিহিত করা হয় ইরাকের ‘উনিশতম প্রদেশ’ হিসেবে।
কিন্তু সাদ্দামের এই বিজয় স্থায়ী হয়েছিল মাত্র সাত মাস। কুয়েত দখল করতে যতটা সহজ হয়েছিল, তার পরিণতি সামলানো হয়েছিল তার চেয়ে অনেক কঠিন। এই আক্রমণ প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের জন্ম দেয়, মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী মার্কিন সামরিক উপস্থিতির পথ খুলে দেয় এবং এমন একটি ঘটনাপ্রবাহ শুরু করে, যার শেষপ্রান্তে ছিল ইরাকের ওপর দীর্ঘ অবরোধ, ২০০৩ সালের মার্কিন অভিযান, সাদ্দাম সরকারের পতন এবং পরবর্তী আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা।
২ আগস্টের আক্রমণ তাই শুধু কুয়েত দখলের ইতিহাস নয়; এটি আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামো বদলে দেওয়া এক মোড়।
যুদ্ধশেষে ঋণগ্রস্ত এক রাষ্ট্র
কুয়েত আক্রমণের পেছনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল মূলত ইরান-ইরাক যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত চলা সেই যুদ্ধে লাখো মানুষ নিহত হয়। যুদ্ধ শেষ হলেও কোনো পক্ষ স্পষ্ট জয় অর্জন করতে পারেনি। বিপুল সামরিক শক্তি গড়ে তোলা ইরাক শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
সাদ্দাম হোসেন নিজেকে আরব বিশ্বের রক্ষাকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন। তাঁর দাবি ছিল, ইরানের ইসলামি বিপ্লবের বিস্তার ঠেকিয়ে ইরাক শুধু নিজের নয়, কুয়েত ও সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর নিরাপত্তাও রক্ষা করেছে। যুদ্ধের সময় কুয়েত ও সৌদি আরব ইরাককে বিপুল অর্থ দিয়েছিল। বাগদাদ এসব অর্থকে আরব নিরাপত্তার জন্য সহযোগিতা বা অনুদান হিসেবে দেখতে চেয়েছিল। কিন্তু উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে অর্থের বড় অংশই ছিল ঋণ।
যুদ্ধ শেষে ইরাকের প্রয়োজন ছিল পুনর্গঠনের অর্থ। অথচ দেশটির ওপর কয়েক হাজার কোটি ডলারের বিদেশি ঋণের বোঝা ছিল। কুয়েতের কাছেই ইরাকের দেনা ছিল আনুমানিক ১৪ বিলিয়ন ডলার; উপসাগরীয় ঋণদাতাদের কাছে মোট দেনার পরিমাণ নিয়ে বিভিন্ন হিসাবে পার্থক্য থাকলেও তা কয়েক হাজার কোটি ডলার ছিল।
সাদ্দাম চাইছিলেন কুয়েত ঋণ মওকুফ করুক। কুয়েত এতে রাজি হয়নি।

ঋণের পাশাপাশি তেলের দাম নিয়েও বিরোধ তীব্র হয়। ইরাকের রাজস্বের প্রধান উৎস ছিল তেল। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠনের জন্য বাগদাদের প্রয়োজন ছিল তুলনামূলকভাবে উচ্চ আন্তর্জাতিক তেলের দাম। কিন্তু কুয়েত ওপেকের নির্ধারিত সীমার বেশি তেল উৎপাদন করছে—এমন অভিযোগ করে ইরাক। অতিরিক্ত সরবরাহে ১৯৯০ সালের জুলাইয়ে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১৮ ডলার থেকে ১২ ডলারে নেমে আসে। ইরাকের দৃষ্টিতে এটি শুধু বাজারনীতি ছিল না; তাদের অর্থনীতি ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত একধরনের ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ ছিল। জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঐতিহাসিক বিবরণ
ইরাক আরও অভিযোগ করেছিল, কুয়েত সীমান্তবর্তী রুমাইলা তেলক্ষেত্রে বাঁকা বা আড়াআড়ি খননপ্রযুক্তি ব্যবহার করে ইরাকি ভূখণ্ডের তেল তুলে নিচ্ছে। কুয়েত অভিযোগ অস্বীকার করে। অভিযোগটি পুরোপুরি প্রমাণিত না হলেও সাদ্দাম এটিকে সামরিক হুমকির রাজনৈতিক যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করেন।
কুয়েত কি সত্যিই ইরাকের অংশ ছিল?
সাদ্দাম হোসেনের আরেকটি যুক্তি ছিল ইতিহাস ও মানচিত্র নিয়ে। ইরাক দাবি করত, কুয়েত মূলত উসমানীয় সাম্রাজ্যের বসরা প্রদেশের অংশ এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি ইরাককে দুর্বল ও সমুদ্র থেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে কৃত্রিমভাবে কুয়েতকে আলাদা করেছে।
এই দাবি ছিল বিতর্কিত এবং অনেকাংশে সরলীকৃত। কুয়েতের আল-সাবাহ পরিবার আঠারো শতক থেকেই ওই অঞ্চলে শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিল। ১৮৯৯ সালে কুয়েত ব্রিটেনের সঙ্গে একটি সুরক্ষা চুক্তি করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইরাক ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের অধীনে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে গঠিত হয়। ১৯৬১ সালে কুয়েত স্বাধীনতা লাভ করলে ইরাক প্রথমে আপত্তি জানালেও ১৯৬৩ সালে দেশটির সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে।
তারপরও সীমান্ত, দ্বীপ ও সমুদ্রপথ নিয়ে বিরোধ থেকে যায়। পারস্য উপসাগরে ইরাকের উপকূলরেখা খুবই সংকীর্ণ। কুয়েতের বুবিয়ান ও ওয়ারবাহ দ্বীপের অবস্থান ইরাকের সামুদ্রিক প্রবেশপথের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কুয়েত দখল করতে পারলে ইরাক শুধু বিপুল তেলের মালিক হতো না; উপসাগরে তার কৌশলগত প্রবেশাধিকারও অনেক বেড়ে যেত।
সুতরাং আক্রমণের পেছনে একটিমাত্র কারণ ছিল না। ঋণ, তেলের দাম, সীমান্তবিরোধ, আঞ্চলিক নেতৃত্বের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং কুয়েতের বিপুল তেলসম্পদ—সবকিছু মিলেছিল সাদ্দামের সিদ্ধান্তে।
সাম্প্রতিক গবেষণায় আরও একটি দিক গুরুত্ব পেয়েছে। সাদ্দাম মনে করেছিলেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পথে এগিয়ে যাওয়ার সময় যুক্তরাষ্ট্র হয়তো মধ্যপ্রাচ্যের একটি আরব-আরব বিরোধে বড় ধরনের যুদ্ধে জড়াবে না। অর্থাৎ তিনি শুধু কুয়েতের সামরিক দুর্বলতাই দেখেননি; স্নায়ুযুদ্ধের সমাপ্তির সময় আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে নিজের পক্ষে ভুলভাবে মূল্যায়ন করেছিলেন। Texas National Security Review
আলোচনার টেবিল থেকে যুদ্ধক্ষেত্রে
১৯৯০ সালের জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে ইরাক কুয়েত সীমান্তে সেনা জড়ো করতে শুরু করে। তখনও অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেছিলেন, এটি হয়তো কুয়েতকে ঋণ ও তেলনীতি নিয়ে ছাড় দিতে বাধ্য করার কৌশল। আরব নেতারাও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিশ্বাস করেছিলেন যে যুদ্ধ এড়ানো যাবে।
৩১ জুলাই সৌদি আরবের জেদ্দায় ইরাক ও কুয়েতের প্রতিনিধিদের আলোচনা হয়। কিন্তু আলোচনা ব্যর্থ হয়। পরদিন রাতেই ইরাকি বাহিনী আক্রমণের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে।
২ আগস্ট ভোরে রিপাবলিকান গার্ডের যান্ত্রিক ও সাঁজোয়া ইউনিট কুয়েতে প্রবেশ করে। কুয়েতি বাহিনী কিছু স্থানে প্রতিরোধ গড়লেও সংখ্যায় ও অস্ত্রে তারা অনেক পিছিয়ে ছিল। আমিরের ছোট ভাই শেখ ফাহাদ আল-আহমদ আল-সাবাহ দাসমান প্রাসাদ রক্ষার লড়াইয়ে নিহত হন। কুয়েতের বিমানবাহিনীর একটি অংশ সৌদি আরবে সরে যেতে সক্ষম হয়।

কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রাজধানীর প্রধান সরকারি স্থাপনা, বিমানবন্দর ও সামরিক ঘাঁটি ইরাকের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। দুই দিনের মধ্যে প্রায় পুরো দেশ দখল সম্পন্ন হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ঐতিহাসিক নথিতেও প্রায় এক লাখ ইরাকি সেনার হাতে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কুয়েত দখলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর
সাদ্দাম সম্ভবত আশা করেছিলেন, আন্তর্জাতিক প্রতিবাদ ও সীমিত নিষেধাজ্ঞার পর বিশ্ব শেষ পর্যন্ত নতুন বাস্তবতা মেনে নেবে। কিন্তু এই হিসাবও ভুল প্রমাণিত হয়।
বিরল আন্তর্জাতিক ঐক্য
আক্রমণের দিনই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ৬৬০ নম্বর প্রস্তাব গ্রহণ করে। এতে ইরাকের আক্রমণের নিন্দা এবং সব সেনাকে অবিলম্বে ও নিঃশর্তভাবে ১ আগস্টের অবস্থানে ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি জানানো হয়। প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দেয় ১৪টি দেশ; কোনো দেশ বিপক্ষে ভোট দেয়নি। জাতিসংঘের ৬৬০ নম্বর প্রস্তাব
এটি ছিল স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী নতুন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রথম বড় পরীক্ষা। অতীতে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের দ্বন্দ্বে নিরাপত্তা পরিষদ প্রায়ই অচল হয়ে পড়ত। কিন্তু এবার মস্কো তার পুরোনো মিত্র ইরাকের আক্রমণের নিন্দায় ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগ দেয়। আন্তর্জাতিক শক্তির এই ঐক্যের গভীরতা সাদ্দাম আগে অনুমান করতে পারেননি।
৬ আগস্ট ইরাকের ওপর ব্যাপক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এর মধ্যে ছিল আমদানি-রপ্তানি ও আর্থিক লেনদেনের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ। ইরাক কুয়েত থেকে সরে না এসে ৮ আগস্ট দেশটিকে নিজের অংশ ঘোষণা করে।
একই সময় আশঙ্কা তৈরি হয়, কুয়েতের পর ইরাকি বাহিনী সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় তেলক্ষেত্রের দিকে এগোতে পারে। সৌদি রাজপরিবার যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদেশগুলোর সামরিক সহায়তা গ্রহণ করে। ৭ আগস্ট শুরু হয় ‘অপারেশন ডেজার্ট শিল্ড’। উদ্দেশ্য ছিল সৌদি আরবকে রক্ষা করা এবং ইরাকের বিরুদ্ধে একটি বড় আন্তর্জাতিক বাহিনী গড়ে তোলা।
যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে প্রায় ৩৫টি দেশের সামরিক জোট তৈরি হয়। ব্রিটেন, ফ্রান্স, কানাডা ও ইতালির মতো পশ্চিমা দেশের পাশাপাশি সৌদি আরব, মিসর, সিরিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও আরও কয়েকটি আরব দেশ এতে অংশ নেয়। সিরিয়ার হাফেজ আল-আসাদও যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেন—যা তৎকালীন ভূরাজনীতিতে ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
কিন্তু আরব বিশ্ব একমত ছিল না। জর্ডান ও ইয়েমেন সামরিক সমাধানের বিরোধিতা করে। ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাত সাদ্দামের প্রতি সহানুভূতিশীল অবস্থান নেন। অনেক আরবের কাছে সাদ্দাম ছিলেন পশ্চিমা প্রভাবের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এক নেতা; অন্যদের কাছে তিনি ছিলেন ছোট প্রতিবেশী রাষ্ট্র গ্রাসকারী আগ্রাসী শাসক।
শেষ সময়সীমা এবং ডেজার্ট স্টর্ম
১৯৯০ সালের ২৯ নভেম্বর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ৬৭৮ নম্বর প্রস্তাব গ্রহণ করে। এতে ইরাককে ১৯৯১ সালের ১৫ জানুয়ারির মধ্যে কুয়েত থেকে সরে যাওয়ার শেষ সুযোগ দেওয়া হয়। তা না হলে কুয়েতের সঙ্গে সহযোগিতাকারী দেশগুলোকে আগের প্রস্তাব বাস্তবায়নে ‘প্রয়োজনীয় সব উপায়’ ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়। এটিই সামরিক অভিযানের আন্তর্জাতিক আইনি ভিত্তি তৈরি করে। জাতিসংঘের ৬৭৮ নম্বর প্রস্তাব
সাদ্দাম সময়সীমা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি কুয়েত প্রশ্নকে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলি দখলদারত্বের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেন। তাঁর যুক্তি ছিল, ইরাককে কুয়েত থেকে সরে যেতে বলা হলে ইসরায়েলকেও অধিকৃত আরব ভূখণ্ড থেকে সরে যেতে হবে। রাজনৈতিকভাবে এই বক্তব্য আরব জনমতের একটি অংশে সাড়া ফেললেও কুয়েত দখলের বৈধতা তৈরি করতে পারেনি।
১৯৯১ সালের ১৭ জানুয়ারি শুরু হয় অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম। প্রথম পর্যায়ে ইরাক ও কুয়েতে ব্যাপক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। সামরিক ঘাঁটি, যোগাযোগব্যবস্থা, বিমান প্রতিরক্ষা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতু ও সরকারি স্থাপনা আক্রান্ত হয়। ইরাক পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েল ও সৌদি আরবে স্কাড ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। সাদ্দামের উদ্দেশ্য ছিল ইসরায়েলকে যুদ্ধে টেনে এনে আরব সদস্যদের জোট থেকে বিচ্ছিন্ন করা। যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধে ইসরায়েল পাল্টা আক্রমণ থেকে বিরত থাকে।
পাঁচ সপ্তাহের বিমান অভিযানের পর ২৪ ফেব্রুয়ারি স্থলযুদ্ধ শুরু হয়। প্রযুক্তি, বিমানশক্তি ও যোগাযোগব্যবস্থায় জোট বাহিনীর বিপুল শ্রেষ্ঠত্বের সামনে ইরাকি সেনাবাহিনী দ্রুত ভেঙে পড়ে। মাত্র একশ ঘণ্টার স্থল অভিযানে কুয়েত মুক্ত হয়।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়। যে কুয়েত সাদ্দাম কয়েক ঘণ্টায় দখল করেছিলেন, সেটিই শেষ পর্যন্ত তাঁর শাসনের দীর্ঘ পতনের সূচনা হয়ে দাঁড়ায়।
পুড়তে থাকা তেলক্ষেত্র ও মৃত্যুর মহাসড়ক
কুয়েত থেকে সরে যাওয়ার সময় ইরাকি বাহিনী শত শত তেলকূপে আগুন ধরিয়ে দেয়। কালো ধোঁয়ায় দিনের আকাশ অন্ধকার হয়ে যায়। বিপুল পরিমাণ তেল মরুভূমি ও পারস্য উপসাগরে ছড়িয়ে পড়ে। এটি ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ মানবসৃষ্ট পরিবেশগত বিপর্যয়ে পরিণত হয়।
কুয়েত সিটি থেকে বসরার দিকে পশ্চাদপসরণরত ইরাকি সামরিক যান ও তাদের সঙ্গে থাকা বেসামরিক গাড়ির দীর্ঘ বহরে জোট বাহিনী ব্যাপক হামলা চালায়। ধ্বংসপ্রাপ্ত যানবাহনে ভরা সড়কটি পরে ‘হাইওয়ে অব ডেথ’ নামে পরিচিত হয়। কতজন নিহত হয়েছিল, তার নির্ভুল সংখ্যা আজও বিতর্কিত। ঘটনাটি যুদ্ধের আনুপাতিকতা ও নৈতিকতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তোলে।
যুদ্ধে ইরাকি বাহিনীর পাশাপাশি বহু কুয়েতি ও ইরাকি বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। কুয়েতের নাগরিকদের হত্যা, আটক ও ইরাকে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও ছিল। বহু নিখোঁজ ব্যক্তির ভাগ্য কয়েক দশক পরও পুরোপুরি জানা যায়নি।
সাদ্দামকে তখনই অপসারণ করা হলো না কেন?
কুয়েত মুক্ত করার পর জোট বাহিনী বাগদাদের দিকে এগোয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ যুদ্ধ থামিয়ে দেন। কারণ জাতিসংঘের অনুমোদন ছিল কুয়েত মুক্ত করা, ইরাক দখল বা সাদ্দাম সরকার উৎখাত করা নয়। বাগদাদ পর্যন্ত অগ্রসর হলে আরব জোট ভেঙে পড়তে পারত এবং ইরাকের শাসনভার নেওয়ার দীর্ঘ দায় যুক্তরাষ্ট্রকে বহন করতে হতো।
তবে যুদ্ধের পর ইরাকের শিয়া ও কুর্দিদের একটি অংশ সাদ্দামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। তারা ধারণা করেছিল, যুক্তরাষ্ট্র তাদের সহায়তা করবে। কিন্তু প্রত্যাশিত সহায়তা না পাওয়ায় ইরাকি বাহিনী নিষ্ঠুরভাবে বিদ্রোহ দমন করে। পরে কুর্দি ও শিয়া জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে ইরাকের উত্তর ও দক্ষিণে নো-ফ্লাই জোন প্রতিষ্ঠা করা হয়।
এভাবেই যুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরাকের সামরিক সংঘাত পুরোপুরি থামেনি।
যে মানচিত্র আর আগের মতো থাকেনি
১৯৯১ সালে কুয়েতের স্বাধীন সীমান্ত পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সেই অর্থে সাদ্দাম স্থায়ীভাবে মানচিত্র বদলাতে পারেননি। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতা ও নিরাপত্তার মানচিত্র মৌলিকভাবে বদলে গিয়েছিল।
প্রথম পরিবর্তন ছিল উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী সামরিক উপস্থিতি। যুদ্ধের আগে সৌদি আরবে অমুসলিম বিদেশি সেনার বড় উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। কুয়েত আক্রমণের পর সৌদি আরব, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার ও অন্যান্য দেশে মার্কিন ঘাঁটি ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক দ্রুত সম্প্রসারিত হয়।
এই উপস্থিতি পরে ওসামা বিন লাদেনের প্রধান রাজনৈতিক অভিযোগগুলোর একটি হয়ে ওঠে। তার প্রচারণায় ইসলামের পবিত্র ভূমিতে মার্কিন সেনা মোতায়েনকে আরব সরকার ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধের যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ ১৯৯০ সালের সংকটের একটি পরোক্ষ রেখা পরবর্তী জঙ্গিবাদ ও ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার ইতিহাসের সঙ্গেও যুক্ত।
দ্বিতীয় পরিবর্তন ছিল আরব জাতীয়তাবাদের পতন। সাদ্দাম নিজেকে আরব প্রতিরোধের নেতা হিসেবে উপস্থাপন করলেও একটি আরব দেশ আরেকটি আরব দেশকে দখল করায় যৌথ আরব রাজনীতির ধারণা গভীরভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো নিজেদের নিরাপত্তার জন্য পশ্চিমা সামরিক শক্তির ওপর আরও নির্ভরশীল হয়ে ওঠে।
তৃতীয় পরিবর্তন ঘটে ফিলিস্তিনি রাজনীতিতে। ইয়াসির আরাফাতের সাদ্দামঘনিষ্ঠ অবস্থানের কারণে কুয়েতসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যুদ্ধের পর কুয়েত থেকে কয়েক লাখ ফিলিস্তিনি চলে যেতে বাধ্য হন বা দেশত্যাগ করেন।
সবশেষে ইরাকের ওপর কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ১৯৯০-এর দশকজুড়ে দেশটির অর্থনীতি ও জনজীবন বিপর্যস্ত করে। অস্ত্র পরিদর্শন, নো-ফ্লাই জোন, মাঝেমধ্যে মার্কিন-ব্রিটিশ বিমান হামলা এবং নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বিরোধ চলতে থাকে। এই অমীমাংসিত সংঘাতই ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরাক আক্রমণের রাজনৈতিক পটভূমি তৈরি করে—যদিও ২০০৩ সালের যুদ্ধের ঘোষিত গণবিধ্বংসী অস্ত্রের অস্তিত্ব পরে পাওয়া যায়নি।
সাদ্দামের পতনের পর ইরাক রাষ্ট্রীয় ভাঙন, সাম্প্রদায়িক যুদ্ধ, আল-কায়েদার উত্থান এবং পরে ইসলামিক স্টেটের বিস্তারের মুখে পড়ে। ২ আগস্টের আক্রমণ একাই এসব ঘটনার কারণ নয়; কিন্তু এটি এমন একটি শৃঙ্খলের প্রথম বড় কড়ি, যা মধ্যপ্রাচ্যকে কয়েক দশকের সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয়।
কুয়েত দখল করে সাদ্দাম হোসেন ভেবেছিলেন, দ্রুত সামরিক বিজয় তাঁকে ঋণমুক্ত করবে, তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়াবে এবং আরব বিশ্বের প্রধান শক্তিতে পরিণত করবে। বাস্তবে তিনি নিজের দেশকে দীর্ঘ অবরোধ, যুদ্ধ ও ধ্বংসের পথে নিয়ে গিয়েছিলেন।
১৯৯০ সালের ২ আগস্ট তাই ইতিহাসের একটি সতর্কবার্তাও। সামরিকভাবে দুর্বল প্রতিবেশীকে দ্রুত দখল করা সম্ভব হতে পারে, কিন্তু সেই দখলের রাজনৈতিক পরিণতি নিয়ন্ত্রণ করা সব সময় সম্ভব নয়। কুয়েত কয়েক মাসের মধ্যেই স্বাধীনতা ফিরে পেয়েছিল; কিন্তু ওই ভোরে শুরু হওয়া যুদ্ধের ছায়া থেকে মধ্যপ্রাচ্য আজও পুরোপুরি বের হতে পারেনি।
আপনার মতামত জানানঃ