
জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর, ধোঁয়া-ওড়ানো বাসের শহরে হঠাৎ করেই বৈদ্যুতিক পরিবহনের স্বপ্ন দেখাচ্ছে সরকার। প্রায় ১ হাজার ৪০০টি বৈদ্যুতিক বাস নামানোর এই পরিকল্পনা যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তবে তা হবে দেশের গণপরিবহন খাতে সবচেয়ে বড় রূপান্তর। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা কি আদৌ সময়মতো বাস্তবায়িত হবে?
পরিকল্পনার কাঠামো
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হকের বরাত দিয়ে জানা যাচ্ছে, এই বহর গড়ে উঠবে কয়েকটি পৃথক প্রকল্পের সমন্বয়ে। ৫০০টি বৈদ্যুতিক বাস কেনার একটি প্রস্তাব অর্থায়নের প্রক্রিয়ায় রয়েছে, দক্ষিণ কোরিয়ার সহায়তায় চলমান ৩০০ বাসের কর্মসূচি সংশোধন করে সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে, আর বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় আরও ৪০০টি বাস কেনার প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ৪০০ কোটি টাকা করে দুটি পৃথক ক্রয় প্যাকেজ, যার আওতায় নারী যাত্রীদের জন্য একটি বিশেষ বহরও থাকবে, যেখানে বাসের সংখ্যা প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রার ১০০-র বেশি হতে পারে।
সরকারের প্রত্যাশা, চলতি বছরের ডিসেম্বর নাগাদ বা আগামী বছরের শুরুতে নির্বাচিত কিছু রুটে অন্তত ২০০টি বাস দিয়ে এর দৃশ্যমান প্রভাব বোঝা যাবে।
অবকাঠামো ও মানদণ্ড: দূরদর্শী পদক্ষেপ
শুধু বাস কেনাই নয়, সরকার একই সঙ্গে গড়ে তুলছে সার্বজনীন চার্জিং অবকাঠামো—যা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের জন্য সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বেসরকারি অপারেটররাও ব্যবহার করতে পারবেন। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশন (বিআরটিসি) ৬৪ জেলায় নিজস্ব জমিতে চার্জিং স্টেশন বসানোর পরিকল্পনা করেছে, যেখানে অতিরিক্ত সক্ষমতা থাকলে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে তা বেসরকারি খাতের জন্যও খুলে দেওয়া হবে।
বুয়েট ও এমআইএসটির বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত একটি কারিগরি কমিটি ব্যাটারি ব্যবস্থা, চার্জিং প্রযুক্তি ও যান্ত্রিক সহায়তার ক্ষেত্রে অভিন্ন মানদণ্ড তৈরি করছে, যাতে ভিন্ন ভিন্ন নির্মাতার যানবাহনের মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় থাকে। এই মানদণ্ড ভবিষ্যতে মিনিবাস ও ট্রাকের ক্ষেত্রেও সম্প্রসারিত হবে বলে জানানো হয়েছে। পরিকল্পনায় আছে মনোরেল ও বাস র্যাপিড ট্রানজিটের (বিআরটি) সম্ভাব্যতাও, যেখানে মেট্রোরেল উপযুক্ত বিকল্প নয়।
বাস্তবতার প্রশ্ন: বেসরকারি খাতের দ্বিধা
তবে পরিকল্পনার কাগুজে বিশালতার সঙ্গে বাস্তবায়নের ফারাক থেকে যাচ্ছে স্পষ্ট। প্রতিবেদনেই উঠে এসেছে, অনেক বেসরকারি পরিবহন অপারেটর নিজেরা বিনিয়োগে ঝাঁপ দেওয়ার আগে বিআরটিসির প্রাথমিক বৈদ্যুতিক বাস বহর কতটা কার্যকর হয়, তা দেখে নিতে চাইছেন। এটি এক ধরনের “wait and watch” মনোভাবের ইঙ্গিত দেয়—যা সরকারের কর ছাড় ও আর্থিক প্রণোদনার প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও বেসরকারি খাতের আস্থার ঘাটতি স্পষ্ট করে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একটি কাঠামোগত দ্বন্দ্ব—বৈদ্যুতিক বাসের তুলনামূলক বেশি প্রযুক্তিগত ব্যয় এবং যাত্রীদের জন্য সাশ্রয়ী ভাড়া, এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা। ভর্তুকি ব্যবস্থা ও ভাড়ার কাঠামো নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এখনো আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছেন সচিব নিজেই, যার অর্থ দাঁড়ায়—আর্থিক মডেলটি এখনো চূড়ান্ত রূপ পায়নি।
সচিবের নিজের স্বীকারোক্তিও লক্ষণীয়: বাংলাদেশ এখনো বৈদ্যুতিক যানবাহন প্রযুক্তি গ্রহণের প্রাথমিক পর্যায়ে আছে এবং এ খাতে পর্যাপ্ত দেশীয় দক্ষতা এখনো গড়ে ওঠেনি। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি—কারণ ব্যাটারি রক্ষণাবেক্ষণ, চার্জিং নেটওয়ার্কের স্থায়িত্ব ও কারিগরি জনবল তৈরি ছাড়া এত বড় বহর দীর্ঘমেয়াদে সচল রাখা কঠিন হতে পারে।
বিশ্লেষণ: উচ্চাকাঙ্ক্ষা বনাম বাস্তবায়ন-সক্ষমতা
সরকারের এই উদ্যোগ কাঠামোগতভাবে ইতিবাচক—জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভরতা কমানো, বায়ু দূষণ হ্রাস এবং নারীবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থার কথা যুক্ত হওয়া প্রশংসনীয় দিক। কিন্তু বাংলাদেশে অতীতে একাধিক মেগা-পরিবহন প্রকল্পে দেখা গেছে, ঘোষণা ও বাস্তবায়নের মধ্যে দীর্ঘ বিলম্ব ঘটে। এখানে তিনটি ভিন্ন অর্থায়ন উৎস (স্বতন্ত্র প্রস্তাব, দক্ষিণ কোরিয়ার সহায়তা, বিশ্বব্যাংকের ঋণ) সমন্বয়ের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় সমন্বয়হীনতার ঝুঁকিও থেকে যায়।
আগামী কয়েক মাসে মূল পরীক্ষা হবে দুটি জায়গায়—বিআরটিসির প্রাথমিক বহর বাস্তবে কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে চলে, এবং ভর্তুকি-ভাড়ার সমীকরণ কতটা বাস্তবসম্মতভাবে নির্ধারিত হয়। এই দুই প্রশ্নের উত্তরের ওপরই নির্ভর করবে বেসরকারি খাত আদৌ এই রূপান্তরে সঙ্গী হবে কি না।
আপনার মতামত জানানঃ