
২০২৬ সালের জুন মাসে ইউরোপ মহাদেশে যে ভয়াবহ তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে, তা ইতিহাসের অন্যতম মারাত্মক ও ব্যাপক উষ্ণপ্রবাহ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ফ্রান্স, স্পেন, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডসসহ ইউরোপের অন্তত ১৭টি দেশ এই তাপপ্রবাহের কবলে পড়েছে। ১৫ কোটিরও বেশি মানুষ এই প্রচণ্ড তাপের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
তাপপ্রবাহের বৈজ্ঞানিক কারণ: ‘ওমেগা ব্লক’
এই অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহের মূল কারণ হলো ‘ওমেগা ব্লক’ নামক একটি আবহাওয়া পরিস্থিতি। গ্রিক বর্ণ Ω-এর মতো আকৃতির এই উচ্চচাপ বলয় ইউরোপের ওপর স্থির হয়ে যায় এবং উত্তপ্ত আফ্রিকান বায়ুকে আটকে রাখে। একজন আবহাওয়াবিদ এ ঘটনাকে ‘সসপ্যানের ঢাকনা’-এর সাথে তুলনা করেছেন যা উত্তপ্ত বাতাসকে নিচের দিকে চেপে ধরে রাখে। এর ফলে কুলিং আটলান্টিক বায়ুপ্রবাহ ইউরোপে প্রবেশ করতে পারেনি এবং তাপ ক্রমাগত বাড়তে থাকে।
রেকর্ড-ভাঙা তাপমাত্রা
ইউরোপের একাধিক দেশে জুন মাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙে গেছে:
-
জার্মানি: দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর সারব্রুকেনে ৪১.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়, যা দেশটির জুন মাসের নতুন সর্বোচ্চ রেকর্ড ।
-
যুক্তরাজ্য: সামারসেটে ৩৬.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়, যা যুক্তরাজ্যের জুন মাসের ইতিহাসে উষ্ণতম দিন।
-
স্পেন: আন্দুহার শহরে তাপমাত্রা ৪৫.১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়।
-
ফ্রান্স: প্যারিসে তাপমাত্রা ৪০.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়, যা দেশটির ইতিহাসে যেকোনো মাসের জন্য সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড।
-
সুইজারল্যান্ড: বাসেল শহরে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়, যা জুন মাসের নতুন রেকর্ড।
-
লুক্সেমবার্গ: ৩৮.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাসহ নতুন জুন রেকর্ড গড়ে।
অনেক অঞ্চলে তাপমাত্রা মৌসুমি গড় থেকে ৫ থেকে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল এবং কিছু স্থানে এই অস্বাভাবিকতা ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছেছিল।
মানবিক বিপর্যয় ও প্রাণহানি
এই তাপপ্রবাহে শত শত মানুষ প্রাণ হারিয়েছে :
-
স্পেন: মোমো মনিটরিং সিস্টেম অনুযায়ী, ৩২৭ জনের মৃত্যু তাপপ্রবাহের সাথে সম্পর্কিত।
-
ফ্রান্স: অন্তত ৫৫ জন ডুবে মারা গেছেন, যাদের বেশিরভাগই অপর্যবেক্ষিত এলাকায় সাঁতার কাটতে গিয়ে।প্যারিসে এক দিনে ২৫টি কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট ঘটেছে, যা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি।
-
ছোট শিশুদের মৃত্যু: ফ্রান্সে কয়েক দিনের মধ্যে বেশ কয়েকটি ঘটনায় ছোট শিশু গাড়ির ভেতরে আটকা পড়ে হাইপারথার্মিয়ায় মারা গেছে।
-
যুক্তরাজ্য: লন্ডন অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস সবচেয়ে বেশি সংখ্যক প্রাণঘাতী জরুরি কল পেয়েছে ।
-
জার্মানি: সাঁতার সম্পর্কিত দুর্ঘটনায় ২০ জনের বেশি মানুষ মারা গেছে ।
স্বাস্থ্য কর্মীরা পরিস্থিতিকে ‘অ্যাপোক্যালিপ্টিক’ বর্ণনা করেছেন, কারণ হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ ছিল অসহনীয়।
জীবনের ওপর প্রভাব
শিক্ষা: ফ্রান্সে ৮৪৫টি স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং আরও ১,৮০০টি স্কুলের সময়সূচি পরিবর্তন করা হয়; যুক্তরাজ্যেও ১,০০০-এর বেশি স্কুল বন্ধ বা আংশিক বন্ধ ছিল।
পরিবহন: উচ্চ তাপমাত্রায় জার্মানির এ২ মোটরওয়ের উপরিতল ফেটে যায়, যাতে ৩০টি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয় . যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল রেল যাত্রীদের প্রয়োজন ছাড়া ভ্রমণ না করতে বলে। ইউরোস্টার ট্রেনও আটকে যায়।
বিদ্যুৎ: ফ্রান্সে ৬৮,০০০ বাড়ি বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে এবং তিনটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যায়। সুইজারল্যান্ডের একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নদীর পানি অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়ায় উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়।
জনজীবন: প্যারিস প্রাইড ও সলিডেইস মিউজিক ফেস্টিভ্যালের মতো বড় বড় অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়; বার্লিন ওপেন টেনিস টুর্নামেন্ট স্থগিত করা হয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) বলছে, ইউরোপ গত ৩০ বছরে অন্য যেকোনো মহাদেশের চেয়ে দ্রুত উষ্ণ হয়েছে, গড় তাপমাত্রা প্রায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন গ্রুপের বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই তাপপ্রবাহ ‘প্রায় অসম্ভব’ ছিল যদি না মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন থাকতো। তাঁরা দেখিয়েছেন, ৫০ বছর আগে একই ধরনের তাপপ্রবাহ প্রায় ৩.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস শীতল হতো।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে রাতের তাপমাত্রা এখন ২০ বছর আগের তুলনায় ১০০ গুণ বেশি উষ্ণ হচ্ছে, যা শরীরকে দিনের তাপ থেকে পুনরুদ্ধার করতে দেয় না।
অর্থনৈতিক ক্ষতি
অ্যালিয়ানজ ট্রেডের সতর্কতা অনুযায়ী, তাপপ্রবাহ আরও অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে জার্মানির ১৩১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত ক্ষতি হতে পারে, যা অর্থনৈতিক আউটপুটের ৩ শতাংশের সমান। গ্রিসের অর্থনৈতিক আউটপুট ৪.১ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে।
আশার আলো
যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও স্পেনে তাপমাত্রা কিছুটা কমতে শুরু করলেও পূর্ব ইউরোপের দিকে তাপপ্রবাহ সরে যাচ্ছে। চেক প্রজাতন্ত্র, অস্ট্রিয়া ও বলকান অঞ্চলে তাপমাত্রা আরও বাড়তে পারে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন যে এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতার অংশ এবং ইউরোপকে বাড়তি তাপপ্রবাহের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হবে।
আপনার মতামত জানানঃ