অযোধ্যার রামমন্দির শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, এটি গত এক দশকে ভারতের রাজনীতির অন্যতম শক্তিশালী প্রতীক। বহু বছরের আইনি ও রাজনৈতিক লড়াইয়ের পর নির্মিত এই মন্দিরকে কেন্দ্র করে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) তাদের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছে। কিন্তু সেই মন্দিরই এখন এক ভিন্ন কারণে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। কোটি কোটি রুপির দান ও মূল্যবান অলংকার আত্মসাতের অভিযোগ শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রশ্নই তুলছে না, বরং বিজেপির কেন্দ্র ও উত্তর প্রদেশ সরকারের মধ্যে দায় চাপানোর রাজনীতিও সামনে নিয়ে এসেছে। ফলে ধর্মীয় আবেগ, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং দুর্নীতির অভিযোগ—এই তিনটি বিষয় এখন একসূত্রে গাঁথা হয়ে ভারতের রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত রামমন্দিরে জমা পড়া দানসামগ্রী ও অর্থের হিসাব নিয়ে। অভিযোগ ওঠে, দীর্ঘদিন ধরে মন্দিরে ভক্তদের দেওয়া নগদ অর্থ, সোনার গয়না, রুপার অলংকার এবং অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রীর যথাযথ হিসাব রাখা হয়নি। বিষয়টি প্রথমে রাজনৈতিক অভিযোগ হিসেবেই সামনে এলেও পরে একটি নিরীক্ষা প্রতিবেদনে অনিয়মের বিষয়টি উঠে আসে। এরপর উত্তর প্রদেশ সরকার বিশেষ তদন্তকারী দল (এসআইটি) গঠন করে। তদন্তের পর আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাঁদের কাছ থেকে প্রায় ৮০ লাখ রুপি উদ্ধার করার দাবি করে পুলিশ। তবে এই গ্রেপ্তারের পরই নতুন প্রশ্ন সামনে আসে—যাঁরা প্রকৃত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী, তাঁদের বিরুদ্ধে কেন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না?
তদন্তের সঙ্গে সঙ্গেই মন্দির ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রাই এবং সদস্য অনিল মিশ্র পদত্যাগ করেন। কিন্তু তাঁদের বিরুদ্ধে এখনো কোনো এফআইআর হয়নি কিংবা গ্রেপ্তার করা হয়নি। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর অভিযোগ, যাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাঁরা মূলত নিম্নপর্যায়ের কর্মচারী বা দান গণনার কাজে যুক্ত ব্যক্তি। প্রকৃত দায়ীদের আড়াল করতেই এই গ্রেপ্তার অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, আম আদমি পার্টি, তৃণমূল কংগ্রেস ও বামপন্থী দলগুলো একযোগে দাবি তুলেছে, এই ঘটনার তদন্ত সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে হওয়া উচিত। তাঁদের যুক্তি, রাজ্য সরকারের তদন্তে বড় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিজেপির অভ্যন্তরেও মতপার্থক্য প্রকাশ্যে চলে এসেছে। উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের সমর্থকদের বক্তব্য, রামমন্দির ট্রাস্ট গঠন থেকে শুরু করে অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে দিল্লির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের উদ্যোগে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উদ্যোগেই গঠিত হয়েছিল ‘শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্ট’। ট্রাস্টের ১৫ সদস্যের মধ্যে ১২ জনই ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর মনোনীত। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সাবেক মুখ্যসচিব নৃপেন্দ্র মিশ্র মন্দির নির্মাণ কমিটির প্রধান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ফলে যদি আর্থিক অনিয়ম হয়ে থাকে, তবে তার দায় শুধু উত্তর প্রদেশ সরকারের ওপর চাপানো যায় না—এমনটাই দাবি যোগী ঘনিষ্ঠদের।
অন্যদিকে বিরোধীরা বিষয়টিকে আরও বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করার চেষ্টা করছে। তাঁদের অভিযোগ, ধর্মের নামে মানুষের আবেগকে ব্যবহার করে বিপুল অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে, অথচ সেই অর্থের সঠিক হিসাব রাখা হয়নি। মন্দিরে প্রতিদিন লাখ লাখ রুপি দান হলেও কীভাবে সেই অর্থ কয়েক হাজারে নেমে আসে—এই প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। তদন্ত প্রতিবেদনে এমনও দাবি করা হয়েছে, দান গণনার সময় কখনো সিসিটিভি ক্যামেরা বন্ধ রাখা হতো, আবার কখনো ক্যামেরার দৃশ্য আড়াল করা হতো যাতে চুরির ঘটনা ধরা না পড়ে। এমন অভিযোগ যদি সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে এটি বিচ্ছিন্ন কোনো চুরির ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে চলা একটি সংগঠিত দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, মন্দির পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন ব্যক্তি উত্তরাখণ্ডে রিসোর্ট নির্মাণ, শপিং মল স্থাপনসহ বিভিন্ন ব্যবসায় বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। বিরোধীদের অভিযোগ, এই সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখলেই প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে। তাঁদের মতে, সাধারণ কর্মচারীরা এত বড় আর্থিক লেনদেন একা পরিচালনা করতে পারে না; এর পেছনে অবশ্যই প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মদদ রয়েছে।
এই বিতর্কে কংগ্রেস সবচেয়ে আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছে। দলটির নেতারা অভিযোগ করেছেন, বড় বড় নেতাদের আশীর্বাদ ছাড়া কোটি কোটি রুপির অনিয়ম সম্ভব নয়। তাঁদের ভাষায়, “চুনোপুঁটি ধরা পড়েছে, কিন্তু রাঘববোয়ালরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।” কংগ্রেসের আরেক নেতা কে. সি. বেনুগোপাল বলেন, যারা নিজেদের হিন্দুত্বের রক্ষক বলে দাবি করেন, তাঁদের মুখোশ খুলে গেছে। ধর্মীয় বিশ্বাসকে ব্যবহার করে ভক্তদের দান আত্মসাৎ করা হয়েছে—এমন অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর।
আম আদমি পার্টির নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়ালও কঠোর ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তাঁর মতে, মন্দিরের দান আত্মসাৎকারীদের বিরুদ্ধে কঠোরতম শাস্তি হওয়া উচিত। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, যদি সাধারণ মানুষের অর্থ চুরির অভিযোগে দ্রুত গ্রেপ্তার সম্ভব হয়, তাহলে ট্রাস্টের শীর্ষ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কেন এত নীরবতা? একই ধরনের প্রশ্ন তুলেছেন উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনা নেতা সঞ্জয় রাউত। তিনি দাবি করেছেন, তাঁর দলের পক্ষ থেকে রামমন্দিরে এক কোটি রুপি এবং চার কেজি রুপার ইট দান করা হলেও আজ পর্যন্ত তার কোনো আনুষ্ঠানিক রসিদ দেওয়া হয়নি।
অবশ্য এই বিতর্ক একেবারে নতুন নয়। রামমন্দির নির্মাণের শুরু থেকেই নানা ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। ২০২১ সালে জমি কেনাবেচা নিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। অভিযোগ ছিল, কিছু জমি কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দুই কোটি রুপিতে কিনে ২০ কোটি রুপিতে ট্রাস্টের কাছে বিক্রি করা হয়। তখনও বিরোধীরা কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার মাধ্যমে তদন্তের দাবি তুলেছিল। কিন্তু অভিযোগ শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এবার সরাসরি দানকৃত অর্থ ও অলংকারের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, উত্তর প্রদেশে আগামী বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে এই ইস্যুর গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে। অযোধ্যা এবং রামমন্দির বিজেপির অন্যতম বড় রাজনৈতিক অর্জন হিসেবে বিবেচিত। সেই মন্দিরকে ঘিরেই যদি দুর্নীতির অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে বিরোধীরা নির্বাচনী প্রচারণায় এটি বড় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে। একই সঙ্গে বিজেপির অভ্যন্তরে যোগী আদিত্যনাথ ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সম্পর্ক নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এই ঘটনার মাধ্যমে দুই পক্ষ একে অন্যের ওপর দায় চাপিয়ে রাজনৈতিক ক্ষতি কমানোর চেষ্টা করছে।
তবে বিজেপির পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, অপরাধীদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ বলেছেন, তদন্তে যারাই দোষী প্রমাণিত হবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তিনি বিরোধীদের উদ্দেশে বলেন, রাজনৈতিক স্বার্থে রামভক্তদের আবেগ নিয়ে খেলা উচিত নয়। কিন্তু বিরোধীদের বক্তব্য, শুধু বক্তব্যে নয়, প্রকৃত দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিলেই সরকারের আন্তরিকতা প্রমাণিত হবে।
এই ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি আসলে স্বচ্ছতা নিয়ে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে বিপুল পরিমাণ অর্থ ও মূল্যবান সম্পদ জমা হলেও যদি তার সঠিক হিসাব, নিরীক্ষা ও জবাবদিহির ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে অনিয়মের সুযোগ থেকেই যায়। বিশ্বের বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে এখন ডিজিটাল হিসাব, নিয়মিত নিরীক্ষা এবং স্বাধীন পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। অযোধ্যার মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি মন্দিরে যদি সেই ধরনের আধুনিক ব্যবস্থাপনা কার্যকর না হয়ে থাকে, তবে সেটিও বড় ধরনের প্রশাসনিক ব্যর্থতা।
ভারতের রাজনীতিতে ধর্ম বহুদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু ধর্মীয় আবেগের সঙ্গে যখন আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ যুক্ত হয়, তখন বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক বিতর্কে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি মানুষের বিশ্বাসের সঙ্গেও সম্পর্কিত হয়ে পড়ে। লাখো ভক্ত তাঁদের ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে মন্দিরে দান করেন। সেই দানের অর্থ যদি সঠিকভাবে ব্যবহৃত না হয় কিংবা তার হিসাব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তাহলে আস্থা নষ্ট হওয়াই স্বাভাবিক।
এখন নজর তদন্তের পরবর্তী ধাপের দিকে। সত্যিই কি তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করা হবে, নাকি নিম্নপর্যায়ের কয়েকজনকে শাস্তি দিয়েই বিষয়টির সমাপ্তি ঘটবে—এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি। একই সঙ্গে এটি ভারতের বিচারব্যবস্থা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। কারণ, বিষয়টি কেবল কয়েক কোটি রুপির অনিয়মের অভিযোগ নয়; এটি এমন একটি প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন, যা কোটি কোটি মানুষের ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তাই এই ঘটনার নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত শুধু রাজনৈতিক প্রয়োজন নয়, জনআস্থা পুনরুদ্ধারের জন্যও অত্যন্ত জরুরি।
আপনার মতামত জানানঃ