মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই স্বাভাবিক এক সন্ধ্যা রূপ নিল আতঙ্ক, ধ্বংসস্তূপ আর আর্তনাদের শহরে। দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলা এমন এক প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছে, যা দেশটির সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ ভূমিকম্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রথম ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ২ এবং মাত্র ৩৯ সেকেন্ড পর আঘাত হানে আরও শক্তিশালী ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দ্বিতীয় ভূমিকম্প। এত অল্প সময়ের ব্যবধানে দুটি শক্তিশালী কম্পন মানুষের স্বাভাবিকভাবে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সুযোগও অনেকাংশে কেড়ে নেয়। ফলে বহু ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কোথাও কোথাও সম্পূর্ণ ধসে পড়ে এবং মুহূর্তেই শত শত মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েন।
ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল ভেনেজুয়েলার ইয়ারাকুই অঙ্গরাজ্যের সান ফেলিপে অঞ্চলের কাছে। দ্বিতীয় ভূমিকম্পটির কেন্দ্র ছিল ইউমারে শহরের দক্ষিণ-পূর্বে। তবে এর প্রভাব শুধু কেন্দ্রস্থলেই সীমাবদ্ধ ছিল না। রাজধানী কারাকাসসহ ত্রুহিয়ো, কারাবোবো, আরাগুয়া, মিরান্দা, লা গুইরা এবং আরও কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে তীব্রভাবে কম্পন অনুভূত হয়। বহু মানুষ জানিয়েছেন, প্রথম কম্পনের ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই দ্বিতীয় কম্পন শুরু হয়। ভবনগুলো প্রচণ্ডভাবে দুলতে থাকে, জানালার কাঁচ ভেঙে পড়ে, দেয়ালে বড় বড় ফাটল দেখা দেয় এবং বহু স্থানে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
রাজধানী কারাকাসে পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ রূপ নেয়। বহুতল ভবনের বাসিন্দারা জীবন বাঁচাতে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে শুরু করেন। অনেকে আতঙ্কে খালি পায়ে রাস্তায় নেমে আসেন। কোথাও শিশুদের কোলে নিয়ে ছুটছেন অভিভাবক, কোথাও আবার বৃদ্ধদের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন স্বজনরা। রাস্তাজুড়ে ছিল মানুষের চিৎকার, সাইরেনের শব্দ এবং উদ্ধারকর্মীদের ব্যস্ততা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ঘরের আসবাবপত্র ছিটকে পড়ছে, আলমারি কেঁপে উঠছে এবং দোকানপাটের পণ্য মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ছে।
সরকার দ্রুত জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে। অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে জনগণকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান এবং উদ্ধারকাজে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশ দেন। সেনাবাহিনী, পুলিশ, দমকল বাহিনী এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার সদস্যদের একযোগে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় মোতায়েন করা হয়। বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়, যেখানে নিরাপদ আশ্রয়, খাবার, বিশুদ্ধ পানি এবং প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।
প্রথমদিকে কয়েক ডজন মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে উদ্ধার অভিযান এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে আরও অনেক মরদেহ উদ্ধার হয়। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৬৪ জনে পৌঁছেছে। আহত হয়েছেন শত শত মানুষ, যাদের অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। হাসপাতালগুলোতে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে এবং চিকিৎসকদের অতিরিক্ত শিফটে কাজ করতে হচ্ছে। রক্তের প্রয়োজন মেটাতে বিভিন্ন স্থানে স্বেচ্ছায় রক্তদানের আহ্বান জানানো হয়েছে।
উদ্ধারকাজে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ধসে পড়া ভবনের নিচে আটকে থাকা মানুষদের জীবিত উদ্ধার করা। ভারী যন্ত্রপাতির পাশাপাশি অনেক জায়গায় হাতে-কলমে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে, যাতে আটকে থাকা কেউ ক্ষতিগ্রস্ত না হন। প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী কুকুরও কাজে লাগানো হয়েছে। উদ্ধারকর্মীরা বলছেন, প্রতিটি ঘণ্টাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধ্বংসস্তূপের নিচে বাতাসের স্বল্পতা, পানির অভাব এবং আহত অবস্থায় দীর্ঘ সময় আটকে থাকার কারণে জীবিতদের উদ্ধার করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে এক বিভীষিকাময় সন্ধ্যার চিত্র। কেউ বলেছেন, তিনি জীবনে এত শক্তিশালী ভূমিকম্প কখনও অনুভব করেননি। কেউ আবার জানান, পুরো ভবনটি যেন একপাশে হেলে পড়ছিল বলে মনে হচ্ছিল। অনেকেই প্রথমে কী করবেন বুঝে উঠতে পারেননি। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ঘরের আলো নিভে যায়, দেয়াল কাঁপতে থাকে এবং চারপাশে ধুলোয় ঢেকে যায় পরিবেশ। পরে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে তারা বুঝতে পারেন, তাদের আশপাশের বহু ভবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কারাকাসের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিমান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। রেল ও মেট্রো পরিষেবাও বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বিভিন্ন সড়কে ফাটল এবং ধ্বংসাবশেষ পড়ে থাকায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো কয়েক দিনের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে, যাতে ভবনের নিরাপত্তা পরীক্ষা করা যায় এবং শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ঝুঁকিমুক্ত রাখা সম্ভব হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের জিওলজিক্যাল সার্ভে (USGS) শুরুতেই সতর্ক করেছিল যে, এই মাত্রার ভূমিকম্পে ব্যাপক প্রাণহানি ও আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। ভূমিকম্পের পরপরই সুনামির আশঙ্কায় কিছু উপকূলীয় এলাকার জন্য সতর্কতা জারি করা হলেও পরে তা প্রত্যাহার করা হয়। তবুও উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, বড় ভূমিকম্পের পর আফটারশক বা পরবর্তী কম্পন হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এসব আফটারশক অনেক সময় দুর্বল হয়ে পড়া ভবনকে সম্পূর্ণ ধসিয়ে দিতে পারে। তাই যেসব ভবনে ফাটল দেখা গেছে বা কাঠামোগত ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে, সেগুলোতে প্রবেশ না করার জন্য জনগণকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। প্রকৌশলীরা ভবনগুলোর নিরাপত্তা পরীক্ষা না করা পর্যন্ত সেগুলো ব্যবহার না করার পরামর্শ দিয়েছেন।
এই দুর্যোগ শুধু অবকাঠামোর ক্ষতিই করেনি, মানুষের মানসিক অবস্থার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলেছে। অনেক পরিবার রাত কাটিয়েছে খোলা আকাশের নিচে। শিশুদের মধ্যে আতঙ্ক স্পষ্ট, অনেকেই আবার ভবনের ভেতরে ফিরতে ভয় পাচ্ছে। স্বজন হারানোর শোক, নিখোঁজ মানুষের খোঁজ এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে এক কঠিন সময় পার করছে দেশটি।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনে মানবিক সহায়তা পাঠানোর প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর পক্ষ থেকেও সহায়তার আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা উদ্ধারকাজ, চিকিৎসা সহায়তা এবং জরুরি ত্রাণ কার্যক্রমে সহযোগিতা করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভেনেজুয়েলার ইতিহাসে ভূমিকম্প নতুন কোনো ঘটনা নয়। ১৯৬৭ সালে কারাকাসে একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে দুই শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছিল এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। সেই স্মৃতি এখনও দেশটির মানুষের মনে রয়েছে। এবারের ভূমিকম্প সেই পুরোনো দুঃসহ স্মৃতিকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। অনেক প্রবীণ বাসিন্দা বলছেন, কয়েক দশক আগের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সঙ্গে এবারের ঘটনার মিল খুঁজে পাচ্ছেন তারা।
তবে ধ্বংসস্তূপের মাঝেও আশা হারাননি উদ্ধারকর্মী ও সাধারণ মানুষ। কোথাও জীবিত একজনকে উদ্ধার করা গেলে উপস্থিত সবার মুখে স্বস্তির হাসি ফুটছে, করতালিতে ভরে উঠছে চারপাশ। চিকিৎসক, স্বেচ্ছাসেবক, পুলিশ, সেনাবাহিনী এবং সাধারণ মানুষ একসঙ্গে কাজ করছেন। কেউ খাবার বিতরণ করছেন, কেউ আহতদের হাসপাতালে পৌঁছে দিচ্ছেন, কেউ আবার নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন। দুর্যোগের এমন সময়ে মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতা ও মানবিকতার এই চিত্রই সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠেছে।
উদ্ধার অভিযান এখনও অব্যাহত রয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র প্রকাশে আরও সময় লাগবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তবে এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে, তা থেকেই স্পষ্ট—এই ভূমিকম্প ভেনেজুয়েলার মানুষের জীবন, অবকাঠামো এবং অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে। পুনর্গঠন, পুনর্বাসন এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে দীর্ঘ সময় ও ব্যাপক আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজন হতে পারে।
প্রকৃতির সামনে মানুষের অসহায়ত্বের আরেকটি নির্মম উদাহরণ হয়ে থাকবে ভেনেজুয়েলার এই ভূমিকম্প। কয়েক সেকেন্ডের কম্পন বদলে দিয়েছে হাজারো মানুষের জীবন। কেউ হারিয়েছেন আপনজন, কেউ হারিয়েছেন মাথা গোঁজার ঠাঁই, আবার কেউ নতুন করে জীবন শুরু করার কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন। ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে ভেসে আসা প্রতিটি উদ্ধার, প্রতিটি বেঁচে ফেরার গল্প আজ ভেনেজুয়েলার মানুষের জন্য নতুন আশার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
আপনার মতামত জানানঃ