হজ ইসলামের পাঁচটি মূল স্তম্ভের অন্যতম। আর্থিক ও শারীরিকভাবে সক্ষম মুসলমানদের জন্য জীবনে অন্তত একবার হজ পালন করা ফরজ। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে লাখো মুসলমান প্রতিবছর সৌদি আরবে সমবেত হন এই মহান ইবাদত পালনের জন্য। বাংলাদেশ থেকেও প্রতিবছর হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মুসল্লি হজে অংশ নেন। অনেকেই সারা জীবনের সঞ্চয়, অবসরভাতা কিংবা জমিজমা বিক্রি করে এই পবিত্র সফরে যান। তাদের প্রত্যাশা থাকে, জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতটি যেন সঠিকভাবে সম্পন্ন হয় এবং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা যায়। কিন্তু চলতি বছর হজ শেষে দেশে ফেরা কিছু বাংলাদেশি হাজির অভিজ্ঞতা সেই প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক চিত্র তুলে ধরেছে।
এবারের হজ মৌসুমে বেশ কয়েকজন হাজি অভিযোগ করেছেন যে, তাদের কাছ থেকে কোরবানির জন্য অর্থ নেওয়া হলেও বাস্তবে কোরবানি সম্পন্ন হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তারা নিশ্চিত হতে পারেননি। অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন যে, কিছু হজ এজেন্সি কোরবানির টাকা আত্মসাৎ করেছে। ফলে হজের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তায় ভুগছেন তারা।
ঢাকার মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা নজরুল ইসলাম খান তাদেরই একজন। চাকরিজীবনের পেনশনের টাকা এবং দীর্ঘদিনের সঞ্চয় ব্যয় করে তিনি স্ত্রীকে নিয়ে হজে গিয়েছিলেন। কিন্তু হজ পালন শেষে দেশে ফিরে তার মনে স্বস্তির বদলে তৈরি হয়েছে গভীর সংশয়। তিনি জানান, তাদের হজ এজেন্সি জানিয়েছিল যে কোরবানি সম্পন্ন হয়েছে এবং সেই অনুযায়ী তারা পরবর্তী আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। পরে কিছু তরুণ সহযাত্রী সৌদি সরকারের ডিজিটাল সিস্টেমে তথ্য যাচাই করে দেখতে পান যে তাদের নামে কোরবানির কোনো তথ্য নেই। তখন থেকেই সন্দেহের সূত্রপাত।
চলতি বছর সৌদি সরকার নুসুক অ্যাপের মাধ্যমে কোরবানি কার্যক্রম পরিচালনা বাধ্যতামূলক করেছে। এর ফলে হাজিরা ডিজিটালভাবে কোরবানির তথ্য যাচাই করতে পারেন। বাংলাদেশ সরকারও হজের আগে এ বিষয়ে নির্দেশনা জারি করেছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, কোরবানি সম্পন্ন হওয়ার তথ্য নুসুক সিস্টেমে যুক্ত করতে হবে, যাতে হজযাত্রীরা সহজেই তা দেখতে পারেন। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, অনেক এজেন্সি এই নির্দেশনা অনুসরণ করেনি। ফলে হাজারো হাজির মধ্যে বিভ্রান্তি ও সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
হজের তিনটি প্রধান ধরন রয়েছে—তামাত্তু, কিরান ও ইফরাদ। তামাত্তু ও কিরান হজে কোরবানি দেওয়া আবশ্যক, তবে ইফরাদ হজে কোরবানি বাধ্যতামূলক নয়। সাধারণত বাংলাদেশের অধিকাংশ হজযাত্রী তামাত্তু হজ পালন করে থাকেন। কিন্তু কিছু হাজি অভিযোগ করেছেন যে, তাদের তামাত্তু হজের কথা বলে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে ইফরাদ হজ হিসেবে নিবন্ধন করা হয়েছে। এর ফলে কোরবানির প্রয়োজনীয়তা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বলে তারা মনে করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী চিকিৎসক সানজিদুল আলমও এমন অভিযোগ করেছেন। তিনি পরিবারসহ হজ পালনের জন্য দেশে এসে একটি বেসরকারি এজেন্সির মাধ্যমে সৌদি আরব যান। তার দাবি, কাফেলার প্রায় সবাই তামাত্তু হজ পালন করলেও সৌদি সরকারের নথিতে অনেককে ইফরাদ হাজি হিসেবে দেখানো হয়েছে। এতে কোরবানির অর্থ কোথায় গেল, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
অভিযোগ এখানেই শেষ নয়। অনেক হাজি জানিয়েছেন, মূল হজ প্যাকেজের বাইরে তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, কোরবানির টাকা ছাড়াও ‘ভুলের দম’ বা অতিরিক্ত কোরবানির অর্থ হজের আগেই তাদের কাছ থেকে আদায় করা হয়েছে। ইসলামী বিধান অনুযায়ী হজের কোনো ভুল বা ত্রুটি সংশোধনের জন্য প্রয়োজন হলে পরবর্তীতে ‘দম’ দিতে হয়। কিন্তু আগে থেকেই এই অর্থ আদায় করা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ঢাকার বনশ্রীর বাসিন্দা একেএম আহসানুজ্জামান জানান, তার পরিবার থেকে চারজন হজে গিয়েছিলেন। প্রত্যেকের কাছ থেকেই একাধিক কোরবানির সমপরিমাণ অর্থ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু পরে তারা কোনো প্রমাণ পাননি যে কোরবানি বাস্তবে সম্পন্ন হয়েছে। এজেন্সির পক্ষ থেকে শুধু মৌখিকভাবে আশ্বস্ত করা হয়েছে।
হাজিদের অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, অনেককে এজেন্সির কর্মী বা গাইড হিসেবে দেখানো হয়েছে। চট্টগ্রামের বাসিন্দা আরাফাত রহমান দাবি করেন, তাদের কাফেলার বেশ কয়েকজন হাজিকে এজেন্সির স্টাফ হিসেবে দেখানো হয়েছিল। বিষয়টি পরে প্রকাশ পেলেও এজেন্সির পক্ষ থেকে এটিকে ভুল বোঝাবুঝি বলে ব্যাখ্যা করা হয়।
এসব ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে একাধিক হাজি সৌদি আরবে অবস্থানকালে বাংলাদেশ হজ অফিসে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অভিযুক্ত এজেন্সিগুলোর প্রতিনিধিদের ডেকে শুনানি করেন। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সেই শুনানিতে এজেন্সির প্রতিনিধিরা সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
তবে অভিযুক্ত এজেন্সিগুলো অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, কোরবানির অর্থ যথাযথভাবে জমা দেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণও তাদের কাছে রয়েছে। কোনো কোনো এজেন্সি বলছে, হঠাৎ নতুন ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু হওয়ায় নুসুক অ্যাপে সব তথ্য আপলোড করা সম্ভব হয়নি। ভবিষ্যতে এ ধরনের সমস্যা দূর করতে তারা প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ে তুলবে।
একই সঙ্গে অভিযোগ উঠেছে যে, দেশে ফেরার পর কিছু এজেন্সি অভিযোগকারী হাজিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সমঝোতার চেষ্টা করছে। অতিরিক্ত নেওয়া অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলেও এর বিনিময়ে অভিযোগ প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও সংশ্লিষ্ট এজেন্সিগুলো এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে সমস্যার বড় কারণ হলো, সরকার এখনো সুনির্দিষ্টভাবে জানে না যে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া কতজন হাজি কোন ধরনের হজ পালন করেছেন এবং কতজনের কোরবানি সম্পন্ন হয়েছে। ফলে অভিযোগ না পাওয়া পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রে অনিয়ম শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশে বর্তমানে সাত শতাধিক অনুমোদিত হজ এজেন্সি রয়েছে। প্রতিবছর অধিকাংশ হজযাত্রী এসব বেসরকারি এজেন্সির মাধ্যমেই সৌদি আরবে যান। চলতি বছর প্রায় ৭৮ হাজার ৫০০ বাংলাদেশি হজ পালন করেছেন, যাদের মধ্যে প্রায় ৭৪ হাজারই গেছেন বেসরকারি এজেন্সির মাধ্যমে। এত বড় একটি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হজ কেবল একটি ভ্রমণ নয়; এটি একজন মুসলমানের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় দায়িত্ব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার হজ ব্যবস্থাপনাকে আরও স্বচ্ছ করতে পারে। নুসুক অ্যাপের মতো প্ল্যাটফর্মে যদি সব তথ্য বাধ্যতামূলকভাবে সংরক্ষণ ও যাচাই করা হয়, তাহলে অনিয়মের সুযোগ অনেক কমে যাবে। পাশাপাশি হাজিদেরও হজের বিভিন্ন বিধান, প্রক্রিয়া ও অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। কারণ অজ্ঞতা অনেক সময় প্রতারণার সুযোগ সৃষ্টি করে।
বর্তমান পরিস্থিতি শুধু কিছু হাজির ব্যক্তিগত অসন্তোষের বিষয় নয়; এটি হজ ব্যবস্থাপনার সামগ্রিক বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গেও সম্পর্কিত। যারা জীবনের সঞ্চয় ব্যয় করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে হজে যান, তারা প্রত্যাশা করেন যে প্রতিটি ধর্মীয় বিধান সঠিকভাবে সম্পন্ন হবে। সেখানে যদি কোরবানি হয়েছে কি না, সেই মৌলিক বিষয় নিয়েই সন্দেহ তৈরি হয়, তবে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
হজ মানুষের জীবনে আত্মিক পরিবর্তন, আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক অনন্য সুযোগ। কিন্তু এই পবিত্র যাত্রাকে ঘিরে যদি আর্থিক অনিয়ম, তথ্য গোপন কিংবা দায়িত্বহীনতা দেখা দেয়, তাহলে তা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং ধর্মীয় অনুভূতিতেও আঘাত হানে। তাই অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে হজযাত্রীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকার, হজ অফিস এবং সংশ্লিষ্ট এজেন্সিগুলোকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই হজের মতো একটি মহান ইবাদতকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই অনিশ্চয়তা ও বিতর্কের অবসান ঘটবে এবং ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা নিশ্চিন্ত মনে তাদের পবিত্র দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।
আপনার মতামত জানানঃ