বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সরকারি ঋণের পরিমাণ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। অর্থ বিভাগের সাম্প্রতিক প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, বর্তমান ঋণ গ্রহণের ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৮-২৯ অর্থবছর শেষে দেশের মোট সরকারি ঋণ প্রায় ৩৩ লাখ ৭৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় পৌঁছাবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি সব সময় নেতিবাচক নয়; তবে ঋণের ব্যবহার, পরিশোধ সক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক ফলাফল নিশ্চিত না হলে এটি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে।
বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের সময়, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে, দেশের মোট সরকারি ঋণের পরিমাণ ছিল ২৩ লাখ কোটি টাকার কিছু বেশি। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে, মার্চ শেষে এ ঋণ প্রায় ২৪ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছে যায়। অর্থ বিভাগের মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতির প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, আগামী কয়েক বছরে ঋণের পরিমাণ আরও দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। ২০২৬-২৭ অর্থবছর শেষে মোট ঋণ দাঁড়াবে ২৬ লাখ ৩৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা। ২০২৭-২৮ অর্থবছরে তা বৃদ্ধি পেয়ে হবে ২৯ লাখ ৫৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। আর ২০২৮-২৯ অর্থবছরে তা প্রায় ৩৪ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছাবে।
এই ঋণের মধ্যে একটি বড় অংশ আসবে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে। অর্থ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৮-২৯ অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ১৮ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ হবে প্রায় ১৪ লাখ ৯৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ দেশের ঋণ কাঠামোতে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উভয় উৎসের ওপর নির্ভরশীলতা অব্যাহত থাকবে।
সরকারি ঋণ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হলো রাজস্ব আদায়ের তুলনায় সরকারি ব্যয়ের দ্রুত বৃদ্ধি। গত কয়েক বছরে সরকারের পরিচালন ব্যয়, উন্নয়ন ব্যয়, ভর্তুকি, সুদ পরিশোধ এবং বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু একই সময়ে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি সেই তুলনায় অনেক কম ছিল। ফলে বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকারকে নিয়মিতভাবে ঋণ গ্রহণ করতে হচ্ছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত পাঁচ অর্থবছরে সরকারি রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৩৫ শতাংশ। কিন্তু একই সময়ে সরকারি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৪২ শতাংশ। এই বৈষম্য থেকেই বোঝা যায় যে ব্যয়ের তুলনায় রাজস্ব সংগ্রহ কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়ছে না। ফলে সরকারকে ঘাটতি পূরণে ব্যাংক ব্যবস্থা এবং বৈদেশিক উৎসের ওপর অধিক নির্ভর করতে হচ্ছে।
সরকারি ঋণ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সুদ পরিশোধের ব্যয়ও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে বাজেটের একটি বড় অংশ ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে। অর্থ বিভাগের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারকে সুদ বাবদ পরিশোধ করতে হবে প্রায় ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে এই ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ১ লাখ ৬২ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় পৌঁছাবে। অর্থাৎ প্রতি বছর বাজেটের একটি বিশাল অংশ উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যয় না হয়ে পূর্ববর্তী ঋণের সুদ পরিশোধে চলে যাবে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় যত বাড়বে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাতে সরকারের ব্যয় করার সক্ষমতা তত সীমিত হয়ে পড়বে। ফলে উন্নয়ন পরিকল্পনার বাস্তবায়নেও চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
সরকারি ঋণ বৃদ্ধির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হলো বেসরকারি খাতে ঋণপ্রাপ্তির সংকট। অর্থনীতির ভাষায় একে বলা হয় “Crowding Out Effect”। যখন সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ঋণ নেয়, তখন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তাদের তহবিলের বড় অংশ সরকারি ঋণে বিনিয়োগ করে। এর ফলে শিল্পপ্রতিষ্ঠান, উদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়ীরা প্রয়োজনীয় ঋণ পেতে সমস্যার সম্মুখীন হন।
বেসরকারি বিনিয়োগ কমে গেলে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উৎপাদন বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। দীর্ঘমেয়াদে এর ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়ে যেতে পারে। তাই সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এমন ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন যাতে বেসরকারি খাতের জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত থাকে।
বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। গত এক দশকে দেশের বিভিন্ন বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ করা হয়েছে। এসব প্রকল্পের অনেকগুলোর গ্রেস পিরিয়ড বা রেয়াতকাল শেষ হয়ে আসছে। ফলে এখন মূল অর্থ ও সুদ উভয়ই পরিশোধ করতে হচ্ছে।
অর্থ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে প্রায় ৩৭৭ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার ব্যয় হবে। ২০২৭-২৮ অর্থবছরে এই পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে ৪২৩ কোটি ৮০ লাখ ডলারে পৌঁছাবে। আর ২০২৮-২৯ অর্থবছরে তা ৪২৭ কোটি ৬০ লাখ ডলারে উন্নীত হবে।
ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নও বৈদেশিক ঋণ পরিশোধকে আরও ব্যয়বহুল করে তুলছে। কারণ অধিকাংশ বৈদেশিক ঋণ ডলার, ইউরো বা অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করতে হয়। ফলে ডলারের মূল্য বৃদ্ধি পেলে একই পরিমাণ ঋণ পরিশোধ করতে সরকারের বেশি টাকা ব্যয় করতে হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈদেশিক ঋণ নিজে কোনো সমস্যা নয়, যদি সেই ঋণের অর্থ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করা হয় এবং সেখান থেকে অর্থনৈতিক রিটার্ন পাওয়া যায়। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব, ব্যয় বৃদ্ধি, দুর্বল পরিকল্পনা বা দুর্নীতির কারণে প্রত্যাশিত ফলাফল না এলে ঋণের বোঝা বাড়তে থাকে।
অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের আগে প্রকল্পের অগ্রাধিকার নির্ধারণ, সম্ভাব্যতা যাচাই, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় ঋণের অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার না হলে ভবিষ্যতে অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বর্তমানে বাংলাদেশের ঋণ পরিস্থিতিকে মধ্যম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করছে। পাশাপাশি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ঋণমান সংস্থাও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছে। এসব মূল্যায়ন ইঙ্গিত করে যে ভবিষ্যতে ঋণ ব্যবস্থাপনায় আরও সতর্কতা প্রয়োজন।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তাও বাংলাদেশের ঋণ পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকি দেশের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি করতে পারে। জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পেলে পরিবহন, কৃষি ও শিল্প উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাবে এবং সরকারের ভর্তুকি ব্যয়ও বাড়তে পারে।
এ পরিস্থিতিতে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, সরকারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি করা। কর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ এবং ডিজিটাল পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা সম্ভব। একই সঙ্গে সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং অপচয় কমানো প্রয়োজন।
সরকার ইতোমধ্যে ঋণনির্ভরতা কমানোর প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছে। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী জানিয়েছেন যে দেশের পাবলিক ফাইন্যান্স কাঠামোতে পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার পরিকল্পনাও রয়েছে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এমন এক পর্যায়ে রয়েছে যেখানে ঋণ ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ঋণ নিয়ে উন্নয়ন করা সম্ভব, তবে সেই উন্নয়ন অবশ্যই টেকসই এবং ফলপ্রসূ হতে হবে। রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, ব্যয় দক্ষতা নিশ্চিতকরণ, প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা এবং বেসরকারি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা গেলে ঋণের চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে। অন্যথায় আগামী কয়েক বছরে সরকারি ঋণের ক্রমবর্ধমান বোঝা অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আপনার মতামত জানানঃ