
জেফরি এপস্টিনের নাম বিশ্বজুড়ে আলোচিত হয়ে আছে এক ভয়ংকর যৌন শোষণ ও প্রভাবের জালের কারণে। তাঁর মৃত্যুর বহু বছর পরও নতুন নতুন নথি, সাক্ষ্য এবং তদন্ত প্রকাশিত হচ্ছে, যা তাঁর চারপাশে গড়ে ওঠা বিস্তৃত নেটওয়ার্ক সম্পর্কে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। সম্প্রতি প্রকাশিত নথিপত্র ও দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন একজন মডেলিং এজেন্টের নাম, যিনি দীর্ঘদিন ধরে তরুণী মডেলদের এপস্টিনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতেন। তিনি হলেন রামসে এল্কহোলি।
একসময় নিউইয়র্কের মডেলিং জগতে পরিচিত মুখ ছিলেন এল্কহোলি। তিনি নিজেকে একজন সফল মডেল এজেন্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তাঁর পরিচালিত সংস্থা বিভিন্ন দেশ থেকে নতুন মডেল খুঁজে এনে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্যাশন বাজারে সুযোগ করে দেওয়ার কাজ করত। কিন্তু সাম্প্রতিক নথিপত্র প্রকাশের পর তাঁর ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে এপস্টিনের সঙ্গে তাঁর বহু বছরের ই-মেইল যোগাযোগ অনেকের কাছে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
প্রকাশিত নথিগুলোতে দেখা যায়, ২০০৯ সালে কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পরও এপস্টিনের সঙ্গে এল্কহোলির নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। সেই যোগাযোগের বড় অংশজুড়ে ছিল তরুণী মডেলদের প্রসঙ্গ। বিভিন্ন ই-মেইলে তিনি মডেলদের সৌন্দর্য, বয়স, সম্ভাবনা এবং তাঁদের সঙ্গে এপস্টিনের সম্ভাব্য সাক্ষাৎ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে তিনি ছবি পাঠানোর কথাও উল্লেখ করেছেন।
এই নথিগুলো সামনে আসার পর এল্কহোলি দাবি করেছেন, বাস্তবে অনেক কিছুই ঘটেনি এবং অনেক কথাই তিনি অতিরঞ্জিত করে লিখতেন। তাঁর ভাষায়, মডেলিং জগতের মানুষ প্রায়ই বড় বড় দাবি করে এবং সব কথা আক্ষরিক অর্থে সত্য নয়। তবে সমালোচকেরা বলছেন, শুধু কথার ফুলঝুরি বলে এসব ব্যাখ্যা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। কারণ, ই-মেইলগুলোর ভাষা এবং ধারাবাহিকতা থেকে বোঝা যায় যে এপস্টিনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য তিনি সচেষ্ট ছিলেন।
এল্কহোলির বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ব্যবসায়িক। তিনি বিশ্বাস করতেন, এপস্টিনের প্রভাব ও পরিচিতি ব্যবহার করে তাঁর মডেলদের জন্য বড় বড় ব্র্যান্ডে কাজের সুযোগ পাওয়া সম্ভব। বিশেষ করে ভিক্টোরিয়াস সিক্রেট এবং ফ্যাশন জগতের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে এপস্টিনের যোগাযোগ তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল। তিনি মনে করতেন, যদি কোনো মডেল এসব প্রতিষ্ঠানে সুযোগ পান, তাহলে মডেলের ক্যারিয়ারের পাশাপাশি তাঁর নিজের ব্যবসাও লাভবান হবে।
নথিতে দেখা যায়, এল্কহোলি বারবার এপস্টিনকে অনুরোধ করেছেন যেন তিনি কিছু মডেলের জন্য কাজের ব্যবস্থা করেন। কখনো ভেরা ওয়াংয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কথা বলেছেন, কখনো আবার ভিক্টোরিয়াস সিক্রেটে সুযোগ পাওয়ার প্রসঙ্গ তুলেছেন। বিনিময়ে তিনি নিজেও নানা ধরনের সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছেন। এই সম্পর্ককে তিনি নিজেই এক পর্যায়ে “উপকারের বিনিময়ে উপকার” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
সমস্যা হলো, এপস্টিনের অতীত তখন আর গোপন ছিল না। ২০০৮ সালে তিনি অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীদের যৌন শোষণের মামলায় দোষ স্বীকার করেছিলেন। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, এমন একজন ব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখার পেছনে কী কারণ ছিল। এল্কহোলি অবশ্য দাবি করেন, তিনি এপস্টিনের প্রকৃত কর্মকাণ্ড সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত ছিলেন না। তাঁর মতে, এপস্টিন নিজেকে ভুল বোঝাবুঝির শিকার হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন এবং তিনি সেই ব্যাখ্যাই বিশ্বাস করেছিলেন।
তবে সমালোচকেরা বলছেন, একজন প্রভাবশালী ও বিতর্কিত ব্যক্তির চারপাশে ঘুরতে গিয়ে অনেকেই ইচ্ছাকৃতভাবে নৈতিক প্রশ্নগুলো উপেক্ষা করেছিলেন। এপস্টিনের অর্থ, ক্ষমতা এবং যোগাযোগের সুযোগ তাঁদের কাছে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে তাঁরা সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলোকে গুরুত্ব দেননি।
নথিপত্রে উঠে এসেছে আরও কিছু উদ্বেগজনক তথ্য। বিভিন্ন ই-মেইলে এল্কহোলি তরুণীদের সম্পর্কে এমন ভাষা ব্যবহার করেছেন, যা অনেকের কাছে অস্বস্তিকর এবং নারীদের পণ্য হিসেবে দেখার মানসিকতার প্রতিফলন। তিনি নিজেও পরে স্বীকার করেছেন যে এসব ভাষা ব্যবহার করা ছিল লজ্জাজনক। তাঁর দাবি, তিনি এপস্টিনকে খুশি করার জন্য এমনভাবে কথা বলতেন। কিন্তু সেই ব্যাখ্যা অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি।
২০২৩ সালে এক পোলিশ মডেল অভিযোগ করেন যে এল্কহোলির মাধ্যমেই তাঁর এপস্টিনের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। পরে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে নির্যাতনের শিকার হন বলে দাবি করেন। যদিও অভিযোগটির স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট মডেলের পরিচয়ও প্রকাশ করা হয়নি, তবুও ঘটনাটি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। এল্কহোলি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তিনি কাউকে নির্যাতনের দিকে ঠেলে দেননি এবং তাঁর পরিচয় করিয়ে দেওয়া কোনো নারী কখনো তাঁর কাছে অভিযোগ করেননি।
মডেলিং জগতের অনেকেই মনে করেন, এই শিল্পে ক্ষমতার ভারসাম্য দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় সমস্যা। নতুন মডেলরা কাজের আশায় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বাধ্য হন। ফলে তাঁরা অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে পড়েন। মডেল অ্যালায়েন্সের মতো সংগঠনগুলো দাবি করছে, এপস্টিন কাণ্ড দেখিয়ে দিয়েছে কীভাবে ফ্যাশন ও মডেলিং শিল্পকে ব্যবহার করে তরুণীদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছিল।
এপস্টিনের বিরুদ্ধে বহু বছর ধরে যে অভিযোগগুলো জমা হয়েছে, তার মধ্যে একটি সাধারণ বিষয় হলো ক্ষমতার অপব্যবহার। তিনি নিজেকে সফল ব্যবসায়ী, দাতা এবং প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করতেন। তাঁর চারপাশে ঘুরতেন রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী, বিজ্ঞানী, সেলিব্রিটি এবং মডেলিং জগতের বিভিন্ন মানুষ। এই বিস্তৃত সামাজিক নেটওয়ার্ক তাঁকে একধরনের গ্রহণযোগ্যতা দিয়েছিল, যা অনেকের সন্দেহ দূর করে দিত।
এল্কহোলির গল্প সেই বৃহত্তর বাস্তবতারই একটি অংশ। তিনি হয়তো একমাত্র ব্যক্তি নন যিনি এপস্টিনের প্রভাব থেকে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। বরং তাঁর বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, অনেকেই এপস্টিনের কাছাকাছি থাকতে চাইতেন। কারণ, তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক থাকলে সুযোগ, পরিচিতি এবং আর্থিক লাভের সম্ভাবনা তৈরি হতো।
আজ যখন এপস্টিনের নথিপত্র ধীরে ধীরে প্রকাশিত হচ্ছে, তখন শুধু একজন অপরাধীর কর্মকাণ্ড নয়, বরং তাঁকে ঘিরে থাকা সামাজিক ও পেশাগত পরিবেশও আলোচনায় চলে এসেছে। কে কী জানত, কে কী দেখেও দেখেনি, কে ব্যক্তিগত লাভের জন্য নৈতিক অবস্থান বিসর্জন দিয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা চলছে।
এল্কহোলি এখন সংগীতজগতে কাজ করছেন। তিনি দাবি করেন, তাঁর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ বা সন্দেহ তৈরি হয়েছে, তার অনেকটাই ভুল ব্যাখ্যার ফল। তবে তিনি এটাও স্বীকার করেন যে অতীতের অনেক আচরণ ও ভাষা নিয়ে তাঁর অনুশোচনা রয়েছে। তাঁর কথায়, তিনি বোকামি করেছেন এবং এমন কিছু লিখেছেন, যা আজ তাঁকে বিব্রত করে।
কিন্তু জনমত সবসময় ব্যক্তিগত ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হয় না। কারণ, এপস্টিন কেলেঙ্কারির হাজারো ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে ক্ষমতাবানদের চারপাশে গড়ে ওঠা নেটওয়ার্ক প্রায়ই অপরাধকে আড়াল করতে সাহায্য করে। ফলে শুধু সরাসরি অপরাধী নয়, বরং তাঁকে সহায়তা করা, বৈধতা দেওয়া কিংবা সুযোগ তৈরি করে দেওয়া ব্যক্তিদের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় আসছে।
জেফরি এপস্টিন মারা গেছেন, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া প্রশ্নগুলো এখনো জীবিত। সাম্প্রতিক নথিপত্র এবং অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলো দেখিয়ে দিচ্ছে, এই কাহিনি শুধু একজন ব্যক্তির অপরাধের গল্প নয়। এটি এমন এক সমাজের গল্প, যেখানে ক্ষমতা, অর্থ, খ্যাতি এবং সুযোগের লোভ অনেক মানুষকে নৈতিক সীমারেখা অতিক্রম করতে প্ররোচিত করে। আর সেই কারণেই এপস্টিনের গল্প আজও শেষ হয়নি; বরং প্রতিটি নতুন নথি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে আরও নতুন প্রশ্ন সামনে চলে আসছে।
আপনার মতামত জানানঃ