ভারতের রাজনীতিতে প্রতিবাদ, আন্দোলন এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তির আবির্ভাব নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে আন্দোলনটি সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে, তার নাম শুনলে অনেকেই অবাক হন। নামটি হলো ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সংক্ষেপে সিজেপি। বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায় ‘তেলাপোকা জনতা পার্টি’। কয়েক সপ্তাহ আগেও এই নামের কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের অস্তিত্ব ছিল না। অথচ অল্প সময়ের মধ্যেই এটি ভারতের লাখো তরুণের ক্ষোভ, হতাশা এবং বঞ্চনার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এটি শুধু একটি অনলাইন প্রচারণা নয়; বরং ভারতের তরুণ সমাজের দীর্ঘদিনের জমে থাকা অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ।
ঘটনার সূত্রপাত হয় ভারতের একজন শীর্ষ বিচারকের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। একটি শুনানিতে তিনি কিছু বেকার তরুণকে ‘তেলাপোকা’ ও ‘পরজীবী’র সঙ্গে তুলনা করেন। যদিও পরে তিনি দাবি করেন, মন্তব্যটি মূলত ভুয়া ডিগ্রিধারীদের উদ্দেশে করা হয়েছিল, কিন্তু ততক্ষণে বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। হাজার হাজার তরুণ মনে করেন, এই মন্তব্য শুধু কয়েকজনকে নয়, বরং পুরো একটি প্রজন্মকে অপমান করেছে। বিশেষ করে যারা বছরের পর বছর পড়াশোনা করে চাকরির আশায় সংগ্রাম করছেন, তাদের কাছে এই মন্তব্য ছিল অত্যন্ত আঘাতের।
এই পরিস্থিতিতে সামনে আসেন ৩০ বছর বয়সী অভিজিৎ দীপকে। তিনি ব্যঙ্গাত্মকভাবে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ গঠন করেন। ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির নামের সঙ্গে মিল রেখে তিনি দলের নাম দেন সিজেপি। কিন্তু শুরুতে মজা বা প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ খুব দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাখো তরুণ এতে যুক্ত হতে শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যে ইনস্টাগ্রামে দলটির অনুসারীর সংখ্যা ২ কোটিরও বেশি ছাড়িয়ে যায়।
দীপকের বক্তব্য ছিল সহজ কিন্তু শক্তিশালী। তিনি বলেন, রাষ্ট্র যদি তরুণদের তেলাপোকার মতো দেখে, তাহলে তারা সেই পরিচয়ই গ্রহণ করবে। তবে সেই তেলাপোকা এমন এক প্রাণী, যাকে সহজে ধ্বংস করা যায় না। তেলাপোকা প্রতিকূল পরিবেশেও বেঁচে থাকতে পারে। এই প্রতীক ব্যবহার করে তিনি তরুণদের বোঝাতে চেয়েছেন যে তারা যতই অবহেলিত হোক না কেন, তাদের অস্তিত্ব মুছে ফেলা সম্ভব নয়।
ভারতের বর্তমান বাস্তবতায় এই বার্তাটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কারণ দেশটির তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। ভারত বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি হলেও সেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সব শ্রেণির মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব বড় একটি সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী বেকারত্বের হার কিছুটা কমেছে বলে দাবি করা হলেও বিভিন্ন স্বাধীন গবেষণা সংস্থা ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। অনেক তরুণ উচ্চশিক্ষা শেষ করার পরও উপযুক্ত চাকরি পাচ্ছেন না। আবার যারা চাকরি পাচ্ছেন, তাদের অনেকেই নিজেদের যোগ্যতার তুলনায় কম বেতনের বা অনিরাপদ কাজে যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে তরুণদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।
এই হতাশাকে আরও গভীর করেছে সরকারি চাকরির পরীক্ষাগুলোকে ঘিরে বিভিন্ন বিতর্ক। প্রশ্নপত্র ফাঁস, ফলাফল প্রকাশে বিলম্ব, নম্বর গণনায় ভুল এবং কারিগরি ত্রুটির মতো ঘটনা বারবার সামনে এসেছে। লাখ লাখ শিক্ষার্থী বছরের পর বছর প্রস্তুতি নেওয়ার পর যখন কোনো পরীক্ষা বাতিল হয়ে যায় বা বিতর্কের কারণে স্থগিত হয়, তখন তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
সিজেপির জনপ্রিয়তার পেছনে এই ক্ষোভই সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। অভিজিৎ দীপকে বারবার বলেছেন, তাঁর দল মূলত বেকার, হতাশ এবং অবহেলিত তরুণদের কণ্ঠস্বর। তাঁর ভাষায়, বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামো তরুণদের শুধু ভোটব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করে। নির্বাচনের সময় তাদের গুরুত্ব দেওয়া হলেও পরে তাদের সমস্যা নিয়ে কেউ কথা বলে না।
ভারতের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ। প্রায় অর্ধেক মানুষের বয়স ৩০ বছরের নিচে। ফলে এই তরুণ জনগোষ্ঠীর হতাশা যদি রাজনৈতিক রূপ নেয়, তাহলে তা দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণেই অনেক পর্যবেক্ষক সিজেপির উত্থানকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন।
তবে সিজেপির সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু তার বক্তব্য নয়, বরং তার যোগাযোগ কৌশল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন খুব দ্রুত তরুণদের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে। মিম, ব্যঙ্গচিত্র, ভিডিও এবং অনলাইন প্রচারণার মাধ্যমে তারা এমন এক ভাষা ব্যবহার করছে, যা নতুন প্রজন্ম সহজেই গ্রহণ করছে।
বিশ্বজুড়েই সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক আন্দোলন অনেক সময় প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ এসব আন্দোলন দ্রুত মানুষের আবেগের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারে। সিজেপির ক্ষেত্রেও একই বিষয় ঘটেছে। তরুণেরা এটিকে নিজেদের হতাশা প্রকাশের একটি মাধ্যম হিসেবে দেখছেন।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এই অনলাইন জনপ্রিয়তা কি বাস্তব রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নিতে পারবে? অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় হওয়া এবং বাস্তব রাজনীতিতে প্রভাব সৃষ্টি করা এক বিষয় নয়। ইতিহাসে এমন অনেক আন্দোলনের উদাহরণ রয়েছে, যেগুলো অনলাইনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করলেও বাস্তবে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারেনি।
নাগরিক সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব যোগেন্দ্র যাদবও এ বিষয়ে সতর্ক মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, সিজেপিকে এখনই একটি পূর্ণাঙ্গ আন্দোলন বলা যাবে না। বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, যা তরুণদের অসন্তোষকে দৃশ্যমান করেছে। তবে এটি ভবিষ্যতে বড় আন্দোলনে রূপ নেবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে।
এদিকে মোদি সরকারের জন্যও এই পরিস্থিতি কিছুটা অস্বস্তিকর। কারণ গত এক দশকের বেশি সময় ধরে বিজেপি ভারতের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। নরেন্দ্র মোদি এখনো দেশের অন্যতম জনপ্রিয় নেতা। বিভিন্ন জরিপেও তাঁর জনপ্রিয়তার প্রমাণ পাওয়া যায়। ফলে সিজেপি তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বড় নির্বাচনী হুমকি সৃষ্টি করছে, এমনটা বলা কঠিন।
তবে জনপ্রিয়তার আড়ালেও যে অসন্তোষ জমা হতে পারে, ইতিহাস তার বহু উদাহরণ দেখিয়েছে। বিশেষ করে যখন সেই অসন্তোষ তরুণ সমাজের মধ্যে বিস্তৃত হয়, তখন তা ভবিষ্যতের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে প্রভাবিত করতে পারে। ভারতের বর্তমান পরিস্থিতিতেও সেই সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
অভিজিৎ দীপকের ব্যক্তিগত জীবনও তাঁর জনপ্রিয়তার একটি কারণ। মহারাষ্ট্রের একটি দলিত পরিবারে বেড়ে ওঠা দীপকে নিজের জীবনের অভিজ্ঞতাকে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। জাতিগত বৈষম্য, সামাজিক বঞ্চনা এবং সুযোগের অসমতা সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য অনেক তরুণের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিল খুঁজে পায়। ফলে তাঁরা সহজেই তাঁর সঙ্গে নিজেদের সম্পর্কিত করতে পারেন।
সব মিলিয়ে ‘তেলাপোকা পার্টি’ শুধু একটি ব্যঙ্গাত্মক নাম নয়; এটি ভারতের তরুণদের হতাশা, ক্ষোভ এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে উঠেছে। এটি হয়তো এখনো পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দল নয়, কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা ইতিমধ্যেই পৌঁছে দিয়েছে—তরুণদের সমস্যা উপেক্ষা করে দীর্ঘদিন রাজনীতি করা সম্ভব নয়।
ভারতের ভবিষ্যৎ অনেকাংশেই নির্ভর করবে এই তরুণ প্রজন্মের ওপর। তাদের জন্য কর্মসংস্থান, মানসম্মত শিক্ষা এবং ন্যায্য সুযোগ নিশ্চিত করা না গেলে অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে। আর সেই অসন্তোষ কখন, কীভাবে এবং কোন রূপে প্রকাশ পাবে, তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না।
সিজেপির উত্থান সেই বাস্তবতারই একটি প্রতীকী প্রকাশ। একটি মন্তব্য থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন দেখিয়ে দিয়েছে যে বর্তমান ডিজিটাল যুগে অবহেলিত মানুষের কণ্ঠস্বর খুব দ্রুত সংগঠিত হতে পারে। আজ এটি একটি অনলাইন আন্দোলন, কিন্তু আগামী দিনে এটি ভারতের রাজনৈতিক আলোচনায় আরও বড় জায়গা করে নেবে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে গোটা দেশ।
আপনার মতামত জানানঃ