বাংলাদেশের ব্যাংক খাতকে দেশের অর্থনীতির রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থা বলা হয়। শিল্প, ব্যবসা, কৃষি, অবকাঠামো কিংবা ব্যক্তিগত বিনিয়োগ—সব ক্ষেত্রেই ব্যাংকের ঋণ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু যখন সেই ঋণ সময়মতো ফেরত আসে না, তখন তা শুধু একটি ব্যাংকের সমস্যা হয়ে থাকে না; ধীরে ধীরে সেটি পুরো অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য সেই উদ্বেগকেই আরও বড় করে তুলেছে। মাত্র তিন মাসে দেশের খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। ফলে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায়, যা দেশের মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ।
সংখ্যাটি শুধু বড় নয়, এটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি ঐতিহাসিক সতর্কবার্তাও বটে। কারণ একটি দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা তখনই সুস্থ বলে বিবেচিত হয়, যখন ঋণ আদায়ের হার ভালো থাকে এবং খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে। অথচ বাংলাদেশে এখন প্রতি তিন টাকার ঋণের মধ্যে প্রায় এক টাকা কার্যত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এটি শুধু আর্থিক ব্যবস্থার দুর্বলতাই নয়, বরং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যার প্রতিফলন।
খেলাপি ঋণ বলতে সাধারণভাবে সেই ঋণকে বোঝায়, যা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গ্রাহক পরিশোধ করতে ব্যর্থ হন। কিছু ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক ক্ষতি, বাজার পরিস্থিতি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ঋণ খেলাপি হতে পারে। কিন্তু যখন দীর্ঘ সময় ধরে বিপুল পরিমাণ ঋণ অনাদায়ী থাকে, তখন প্রশ্ন ওঠে ঋণ প্রদানের পদ্ধতি, তদারকি ব্যবস্থা এবং আর্থিক শৃঙ্খলা নিয়ে।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের ইতিহাস নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়েই এই সমস্যা দেখা গেছে। তবে গত এক দশকে এটি যে মাত্রা পেয়েছে, তা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। অর্থনীতিবিদদের মতে, খেলাপি ঋণের পেছনে কয়েকটি কারণ দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল ঋণ মূল্যায়ন, অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, দুর্বল তদারকি এবং অনেক ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি হওয়ার প্রবণতা।
একসময় ব্যাংকগুলো মূলত ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য ঋণ বিতরণ করত। কিন্তু ধীরে ধীরে কিছু ক্ষেত্রে ঋণ বিতরণ লাভজনক প্রকল্পের পরিবর্তে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীভিত্তিক প্রভাবের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। ফলে অনেক ঋণ এমন খাতে গেছে, যেখানে ফেরত আসার সম্ভাবনা শুরু থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। পরবর্তীতে এসব ঋণের বড় অংশই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।
খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় সাধারণ আমানতকারীদের ওপর। কারণ ব্যাংকের অর্থ মূলত আসে জনগণের জমা রাখা টাকা থেকে। মানুষ তাদের কষ্টার্জিত সঞ্চয় ব্যাংকে রাখে নিরাপত্তা এবং নির্ভরতার আশায়। কিন্তু সেই অর্থ যদি সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা না হয় কিংবা ফেরত না আসে, তাহলে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতা কমে যাওয়া। একটি ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ অর্থ যখন খেলাপি ঋণে আটকে থাকে, তখন নতুন উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ীদের ঋণ দেওয়ার সুযোগ সংকুচিত হয়। ফলে উৎপাদন, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অর্থনীতির চাকা ধীরগতির হয়ে যায়।
বাংলাদেশ বর্তমানে এমন এক সময় অতিক্রম করছে, যখন অর্থনীতির সামনে একাধিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, শিল্প খাতে ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা ব্যবসায়ীদের জন্য কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধি অর্থনীতির ওপর আরও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাও দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। তাদের মতে, ব্যাংকিং খাত শক্তিশালী না হলে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করা কঠিন। কারণ একটি দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা অর্থনীতির সব খাতকে প্রভাবিত করে।
খেলাপি ঋণ শুধু একটি আর্থিক সংখ্যা নয়; এর পেছনে লুকিয়ে থাকে অনেক সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব। যখন কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান ঋণের বোঝায় ডুবে যায়, তখন সেখানে কর্মরত শ্রমিকদের চাকরি ঝুঁকিতে পড়ে। উৎপাদন কমে যায়। সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়। কর আদায় কমে যায়। অর্থাৎ একটি খেলাপি ঋণের প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।
তবে সব খেলাপি ঋণকে একই দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ নেই। কিছু ঋণগ্রহীতা সত্যিকার অর্থেই ব্যবসায়িক ক্ষতির কারণে সমস্যায় পড়েন। অর্থনৈতিক মন্দা, বৈশ্বিক বাজারের পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি অনেক সময় ব্যবসাকে বিপর্যস্ত করে। কিন্তু সমস্যা হলো, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তা এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির মধ্যে পার্থক্য সবসময় স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা যায় না।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি বহুল আলোচিত শব্দ হলো ‘উইলফুল ডিফল্টার’ বা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি। এরা এমন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান, যাদের ঋণ পরিশোধ করার সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন উপায়ে তা এড়িয়ে যান। আইনি দুর্বলতা, দীর্ঘসূত্রতা কিংবা প্রভাবশালী অবস্থানের কারণে অনেক সময় তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না। এর ফলে অন্যদের মধ্যেও খারাপ বার্তা যায় এবং আর্থিক শৃঙ্খলা দুর্বল হয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, খেলাপি ঋণ কমানোর জন্য শুধু নতুন নীতিমালা প্রণয়ন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন কার্যকর বাস্তবায়ন। ঋণ অনুমোদনের আগে প্রকল্প যাচাই, ঝুঁকি মূল্যায়ন, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত তদারকি বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি যারা ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ এড়িয়ে যাচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণও প্রয়োজন।
অনেক দেশ খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ আদালত, দ্রুত নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া এবং শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থা চালু করেছে। বাংলাদেশেও আর্থিক খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার, তথ্য বিশ্লেষণ এবং ডিজিটাল নজরদারি বাড়ানোর মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো সম্ভব। কারণ আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় শুধু ঋণ বিতরণ নয়, ঋণের গুণগত মান পর্যবেক্ষণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা। একটি দেশের অর্থনীতি তখনই শক্তিশালী হয়, যখন জনগণ তাদের আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর বিশ্বাস রাখে। সেই বিশ্বাস নষ্ট হলে বিনিয়োগ কমে যায়, সঞ্চয়ের প্রবণতা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের অনেক ইতিবাচক গল্প তৈরি করেছে। দারিদ্র্য হ্রাস, রপ্তানি বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সামাজিক সূচকে অগ্রগতি আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু সেই অর্জন ধরে রাখতে হলে আর্থিক খাতকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। খেলাপি ঋণের ক্রমবর্ধমান পাহাড় সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে অন্যতম বড় বাধা হয়ে উঠতে পারে।
মাত্র তিন মাসে ৩১ হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি একটি সংখ্যাগত ঘটনা নয়; এটি একটি সতর্ক সংকেত। এই সংকেত উপেক্ষা করলে ভবিষ্যতে এর মূল্য আরও বেশি দিতে হতে পারে। কারণ ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা কখনো একা আসে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, প্রবৃদ্ধি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা।
অর্থনীতির ভাষায় খেলাপি ঋণ হলো এমন একটি ক্ষত, যা সময়মতো চিকিৎসা না করলে ধীরে ধীরে পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এখন সেই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। তাই প্রয়োজন সাহসী সংস্কার, কঠোর জবাবদিহি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। কারণ সুস্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থা ছাড়া কোনো অর্থনীতিই দীর্ঘ সময় ধরে শক্তিশালী থাকতে পারে না। আর খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে ধরতে না পারলে উন্নয়নের অর্জনও একসময় প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
আপনার মতামত জানানঃ