ঢাকা শহর একসময় শুধু ইট-পাথরের নগরী ছিল না, ছিল শব্দের শহর, মানুষের শহর, পরিচিত মুখের শহর। ভোরবেলা ঘুম ভাঙত হকারের ডাকে, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামত ফেরিওয়ালাদের হাঁকে, আর রাত নামার আগেই অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়ত ছোট ছোট জীবিকার ব্যস্ততা। সেই ঢাকা আজও আছে, কিন্তু কোথাও যেন তার প্রাণের অনেকটা হারিয়ে গেছে। আধুনিকতার দৌড়ে আমরা হয়তো অনেক কিছু পেয়েছি, কিন্তু হারিয়েছি এমন কিছু পেশা, কিছু মানুষ আর কিছু স্মৃতি, যেগুলো একসময় এই শহরের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল।
একটা সময় ছিল, যখন সকালে দূর থেকে ভেসে আসত “চাই লইবোওও চাই…” কিংবা “লেস-ফিতা হরেক মাল…”—এই টানটান সুরের ডাক। ছোটবেলায় এসব ডাক শুনলেই মানুষ জানালা খুলে তাকাত, মায়েরা দরজার সামনে এসে দাঁড়াত, শিশুরা কৌতূহল নিয়ে ছুটে যেত রাস্তায়। সেই ফেরিওয়ালারা শুধু পণ্য বিক্রি করতেন না, তারা যেন ছিলেন পাড়ার পরিচিত মানুষ। তাদের সঙ্গে গড়ে উঠত এক ধরনের সম্পর্ক, যেটা ছিল বিশ্বাস, পরিচয় আর আন্তরিকতার।
ঢাকার অলিগলিতে একসময় নিয়মিত দেখা যেত লেস-ফিতাওয়ালিদের। মাথায় বা হাতে নানা রঙের ফিতা, চুড়ি, চুলের ক্লিপ, ছোটখাটো প্রসাধনী নিয়ে তারা ঘুরে বেড়াতেন। পাড়ার নারীরা তাদের ঘিরে ধরতেন, দরদাম করতেন, গল্প করতেন। অনেকের কাছে তারা ছিলেন এক ধরনের আপন মানুষ। এখন সুপারশপ আর অনলাইন শপিংয়ের যুগে সেই দৃশ্য আর চোখে পড়ে না। সম্পর্কের জায়গাটা দখল করে নিয়েছে ডিজিটাল স্ক্রিন।
একসময় সকাল মানেই ছিল “মুরগি এ মুরগি” ডাকে ভরে ওঠা রাস্তা। ভ্যানে করে জীবন্ত মুরগি নিয়ে বিক্রেতারা পাড়া ঘুরতেন। মানুষ দরজার সামনে এসে পছন্দ করে মুরগি কিনতেন। আজ শহরের অধিকাংশ মানুষ সুপারশপের প্যাকেটজাত মাংসে অভ্যস্ত। সময় বেঁচেছে, সুবিধা বেড়েছে, কিন্তু হারিয়ে গেছে সেই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে গল্প করতে করতে বাজার করার অনুভূতি।
দুধওয়ালার কথাও এখন প্রায় গল্পের মতো শোনায়। বড় বড় অ্যালুমিনিয়ামের ক্যান কাঁধে বা সাইকেলে ঝুলিয়ে তারা আসতেন ভোরবেলা। বাসার মানুষ বাটি বা জগ নিয়ে অপেক্ষা করতেন। টাটকা দুধ ঢালার শব্দ, সেই গরম গন্ধ—সবকিছু মিলিয়ে একটা আলাদা আবহ ছিল। এখন প্যাকেটজাত দুধ ফ্রিজে সাজানো থাকে, কিন্তু সেই মানুষটার মুখ আর দেখা যায় না, যে প্রতিদিন দরজায় দাঁড়িয়ে ডাক দিত।
ঢাকার শিশুদের শৈশবের বড় একটা অংশ জুড়ে ছিল বাতাসা, চিনির মিঠাই আর কুলফি-মালাইওয়ালারা। কাঁচের বাক্সে গোলাপি রঙের চিনির মিঠাই দেখে কত শিশুর চোখ জ্বলজ্বল করত! পুরোনো প্লাস্টিক বোতল বা ভাঙা জিনিস জমিয়ে রেখে সেগুলোর বিনিময়ে মিঠাই কেনার আনন্দ ছিল অন্যরকম। কাজিনদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলত, কে বেশি বোতল জমাতে পারে। এখনকার শিশুরা হয়তো ফুড ডেলিভারি অ্যাপ চেনে, কিন্তু রাস্তায় হেঁটে যাওয়া কুলফিওয়ালার ঘণ্টার শব্দে ছুটে যাওয়ার অনুভূতি তাদের অচেনা।
চানাচুরওয়ালাদের কথা মনে পড়লে অনেকের চোখে আজও ভেসে ওঠে রঙিন পোশাক পরা কিছু মানুষ, যাদের কণ্ঠস্বর ছিল আলাদা এক আকর্ষণ। মাইকে টেনে টেনে “চানাচুররর…” ডাক দিত তারা। শিশুদের কাছে তারা যেন ছোটখাটো উৎসব নিয়ে আসতেন। এখনকার ব্যস্ত শহরে সেই সুর হারিয়ে গেছে গাড়ির হর্ন আর কংক্রিটের শব্দে।
একসময় পাড়ায় পাড়ায় দেখা যেত ছুরি, বটি আর শিলপাটা ধার দেওয়ার কারিগরদের। সাইকেলের মতো দেখতে ছোট মেশিন নিয়ে তারা ঘুরতেন। মেশিন চালানোর শব্দ শুনেই মানুষ বুঝে যেত ধারওয়ালা এসেছে। রান্নাঘরের প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো নতুনের মতো ধারালো করে দিতেন তারা। তাদের কাজ ছিল দক্ষতার, ধৈর্যের এবং পরিশ্রমের। এখন মানুষ নতুন ছুরি কিনে নেয় সহজেই, কিন্তু সেই পেশাগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে।
ঢাকার সাংস্কৃতিক জীবনের বড় অংশ জুড়ে ছিল সিডি দোকানগুলোও। ছোট ছোট দোকানে সাজানো থাকত সিনেমা, নাটক আর গানের অ্যালবাম। মানুষ সেখানে গিয়ে পছন্দের সিনেমা ভাড়া নিত, বন্ধুরা মিলে দেখত। কোনো নতুন সিনেমা এলে সেটি পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করত তরুণরা। এখন নেটফ্লিক্স, ইউটিউব, স্পটিফাইয়ের যুগে সেই দোকানগুলো প্রায় বিলীন। প্রযুক্তি বিনোদনকে সহজ করেছে ঠিকই, কিন্তু একসঙ্গে বসে সিডি বেছে নেওয়ার আনন্দ কেড়ে নিয়েছে।
পুরোনো ঢাকার রাস্তায় একসময় আরও অনেক ছোট ছোট পেশার মানুষ দেখা যেত। কেউ পুরোনো লোহা কিনতেন, কেউ বোতল, কেউ পুরোনো কাপড়। আবার কেউ ভাঙারি সংগ্রহ করে জীবিকা চালাতেন। শহরের অর্থনীতির অদৃশ্য চাকা ঘুরত এই মানুষগুলোর হাতেই। কিন্তু নগরায়ণ, সুপারশপ সংস্কৃতি আর প্রযুক্তিনির্ভর জীবনের কারণে তাদের প্রয়োজন কমতে কমতে একসময় প্রায় হারিয়েই গেছে।
এই হারিয়ে যাওয়া পেশাগুলোর সঙ্গে হারিয়ে গেছে ঢাকার সামাজিক বন্ধনও। আগে মানুষ একে অপরকে চিনত, কথা বলত, দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সময় কাটাত। এখন মানুষ ব্যস্ত, সম্পর্ক ভার্চুয়াল, আর যোগাযোগ সীমাবদ্ধ মোবাইল স্ক্রিনে। শহর বড় হয়েছে, কিন্তু মানুষ যেন একা হয়ে গেছে।
ঢাকার পুরোনো দিনের সৌন্দর্য ছিল তার সরলতায়। তখন হয়তো এত প্রযুক্তি ছিল না, কিন্তু ছিল মানুষের উপস্থিতি। বিক্রেতারা শুধু ব্যবসা করতেন না, তারা গল্প শোনাতেন, হাসতেন, খোঁজ নিতেন। কোনো পরিবারে নতুন বাচ্চা হলে তারা জানতেন, কার বাসায় বিয়ে হচ্ছে তাও জানতেন। এক ধরনের মানবিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল পেশার মধ্য দিয়েই।
আজকের প্রজন্মের কাছে এসব গল্প অনেকটা রূপকথার মতো শোনায়। তারা হয়তো জানেই না, একসময় একটা শহরের নিজস্ব শব্দ ছিল। প্রতিটি পেশার আলাদা ডাক ছিল, যা শুনে মানুষ চিনে ফেলত কে এসেছে। সেই শব্দগুলোই ছিল ঢাকার আত্মা। এখন সেই আত্মা অনেকটাই নিঃশব্দ।
তবুও স্মৃতি থেকে যায়। যারা নব্বইয়ের দশক কিংবা তার আগের ঢাকা দেখেছেন, তারা এখনও মাঝেমধ্যে থেমে যান কোনো পুরোনো শব্দ শুনলে। কোনো রাস্তায় হঠাৎ যদি পুরোনো ধাঁচের ফেরিওয়ালার ডাক ভেসে আসে, মনে হয় সময় যেন একটু পিছিয়ে গেল। মনে পড়ে যায় শৈশব, পরিবার, পাড়া আর এক অন্যরকম ঢাকা শহরের কথা।
আধুনিকতা থেমে থাকবে না, সময়ও পিছিয়ে যাবে না। নতুন প্রযুক্তি আসবে, নতুন পেশা তৈরি হবে, পুরোনো অনেক কিছু হারিয়ে যাবে। কিন্তু শহরের ইতিহাস শুধু বড় বড় স্থাপনা দিয়ে তৈরি হয় না। ইতিহাস তৈরি হয় সাধারণ মানুষের জীবন দিয়ে, তাদের পেশা দিয়ে, তাদের প্রতিদিনের ছোট ছোট গল্প দিয়ে। সেই গল্পগুলো হারিয়ে গেলে শহরের আত্মাও ফিকে হয়ে যায়।
ঢাকার হারিয়ে যাওয়া পেশাগুলো তাই শুধু জীবিকার গল্প নয়, এগুলো একেকটা সময়ের গল্প। একেকটা সম্পর্কের গল্প। একেকটা শৈশবের গল্প। এই শহরের পুরোনো রূপকে মনে রাখার গল্প। কারণ মানুষ যখন নিজের শহরের স্মৃতি হারিয়ে ফেলে, তখন শহরও ধীরে ধীরে নিজের পরিচয় হারাতে শুরু করে।
হয়তো কোনো এক ভোরে আবার দূর থেকে ভেসে আসবে কোনো পুরোনো ডাক। হয়তো কেউ থেমে যাবে, জানালা খুলে তাকাবে, আর হঠাৎ মনে হবে—ঢাকা এখনও পুরোপুরি বদলে যায়নি। কোথাও না কোথাও, পুরোনো শহরটা এখনও বেঁচে আছে স্মৃতির ভেতর।
আপনার মতামত জানানঃ