দেশজুড়ে শিশুদের ওপর সহিংসতা, নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা সমাজে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘটে যাওয়া কয়েকটি মর্মান্তিক ঘটনা মানুষের মনে আতঙ্ক বাড়িয়ে তুলেছে। বিশেষ করে শিশু ধর্ষণ, নির্যাতন এবং হত্যার মতো ঘটনাগুলো শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়, বরং সমাজের মানবিক ও নৈতিক অবস্থান নিয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি করছে। সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রেই অভিযুক্তরা শিশুদের পরিচিত মানুষ—প্রতিবেশী, আত্মীয় কিংবা পরিবারের ঘনিষ্ঠ কেউ। ফলে অভিভাবকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা দিন দিন বাড়ছে।
আইন ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম কয়েক মাসেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু সহিংসতার শিকার হয়েছে। বিভিন্ন ঘটনার বিবরণে উঠে এসেছে ধর্ষণ, শারীরিক নির্যাতন, মানসিক নিপীড়ন এবং হত্যার মতো ভয়াবহ বিষয়। শিশুদের ওপর এ ধরনের অপরাধ সমাজকে নাড়িয়ে দিলেও অনেক ক্ষেত্রে কিছুদিন পরই বিষয়গুলো ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যায়। কিন্তু ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জীবনে সেই ক্ষত দীর্ঘস্থায়ী হয়ে থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা অন্যতম। অনেক ঘটনায় দ্রুত বিচার না হওয়ায় অপরাধীদের মধ্যে শাস্তির ভয় কমে যায়। ফলে কেউ কেউ মনে করে, অপরাধ করেও পার পাওয়া সম্ভব। এজন্য দ্রুত তদন্ত, কার্যকর বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ছাড়া সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, মাদকাসক্তি, সহিংস কনটেন্টের প্রভাব এবং পারিবারিক সম্পর্কের দুর্বলতাকেও বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সমাজে সহনশীলতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি মানুষের মধ্যে এক ধরনের অসংবেদনশীলতাও তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। অনেক সময় মানুষ অপরাধ প্রত্যক্ষ করলেও ভয়ে বা অনাগ্রহে প্রতিবাদ করে না। এই নীরবতা অপরাধীদের আরও সাহসী করে তোলে।
শিশুরা শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল হওয়ায় সহজেই বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হতে পারে। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, শিশুদের সঙ্গে পরিবারের খোলামেলা সম্পর্ক না থাকলে তারা অনেক সময় ভয় বা অস্বস্তির কথা বলতে পারে না। ফলে নির্যাতনের শিকার হলেও বিষয়টি দীর্ঘদিন গোপন থেকে যায়। তাই পরিবারকে শিশুদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা নির্ভয়ে সব কথা বলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন করাও জরুরি। বয়স উপযোগী উপায়ে তাদের নিরাপদ আচরণ, ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি এবং সহায়তা চাওয়ার বিষয়গুলো শেখানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও শিশু সুরক্ষায় আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। স্কুল, মাদ্রাসা বা অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও প্রযুক্তির অপব্যবহারও শিশুদের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। অনলাইনে প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইল বা মানসিক হয়রানির মতো ঘটনাও বাড়ছে। ফলে শিশুদের ডিজিটাল নিরাপত্তা সম্পর্কেও সচেতনতা তৈরি করা জরুরি হয়ে পড়েছে। পরিবারকে এ বিষয়ে আরও সতর্ক থাকতে হবে এবং শিশুদের অনলাইন কার্যক্রম সম্পর্কে দায়িত্বশীল নজরদারি রাখতে হবে।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, অনেক সময় সমাজে ভুক্তভোগীকেই দায়ী করার প্রবণতা দেখা যায়, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এ ধরনের মানসিকতা ভুক্তভোগী পরিবারকে আরও ভেঙে দেয় এবং অনেকে বিচার চাইতেও ভয় পায়। তাই শিশু নির্যাতনের ঘটনায় সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি। অপরাধীর দায় অপরাধীরই—এই বোধ সমাজে আরও শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধের ঘটনায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তদন্ত জোরদার করা, অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনা এবং বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে বাস্তবতা হলো, শুধু আইন প্রয়োগ করলেই সমস্যার পুরো সমাধান হবে না। সামাজিক সচেতনতা এবং মানবিক মূল্যবোধ শক্তিশালী না হলে দীর্ঘমেয়াদে পরিবর্তন আনা কঠিন।
সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, একটি শিশুর নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করতে হলে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সমাজ, গণমাধ্যম এবং রাষ্ট্র—সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা কেবল একটি প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, এটি একটি সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্বও। প্রতিটি মানুষকে এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে এবং শিশুদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করতে হবে।
শিশুরা একটি দেশের ভবিষ্যৎ। তাদের মানসিক সুস্থতা, নিরাপত্তা এবং স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করতে না পারলে ভবিষ্যৎ সমাজও নিরাপদ ও সুস্থ হবে না। তাই শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। দ্রুত বিচার, সামাজিক সচেতনতা, পারিবারিক শিক্ষা, মানবিক মূল্যবোধ এবং দায়িত্বশীল সামাজিক আচরণের সমন্বয়েই কেবল শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ ও সহিংসতামুক্ত সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
একটি সভ্য সমাজের পরিচয় নির্ভর করে সেই সমাজ তার শিশুদের কতটা নিরাপদ রাখতে পারছে তার ওপর। যে সমাজে শিশুরা ভয় নিয়ে বড় হয়, সেখানে মানবিকতার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা শুধু একটি দায়িত্ব নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের নৈতিক অঙ্গীকার।
আপনার মতামত জানানঃ