সারা দেশ থেকে স্বাধীনভাবে সংগ্রহ করা প্রায় এক হাজার ভোটকেন্দ্রের ট্যালি শিট পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত ফলাফলের সঙ্গে মাত্র চারটি সামান্য অমিল রয়েছে। এই ফলাফলটি সাম্প্রতিক ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনে পরাজিত কয়েকজন প্রার্থীর উত্থাপিত “ইঞ্জিনিয়ারিং” অভিযোগকে দুর্বল করে দেয়।
নেত্র নিউজের সংগৃহীত তথ্যের সঙ্গে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন–এর প্রকাশিত ফলাফল তুলনা করে দেখা গেছে, প্রায় কোনো পার্থক্যই নেই। অথচ জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি দল দাবি করেছিল, তাদের পরাজয় হয়েছে “অসাধারণ ইঞ্জিনিয়ারিং”-এর মাধ্যমে। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পারওয়ার স্বীকার করেন যে ভোটগ্রহণ ছিল শান্তিপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য—যা অতীতের তুলনায় একটি পরিবর্তন। তবে তার দাবি, কারচুপি হয়ে থাকলে তা ঘটেছে ভোট গণনা ও ফলাফল ঘোষণার মাঝামাঝি কোথাও।
একই ধরনের অভিযোগ তুলেছেন বিএনপির কয়েকজন প্রার্থীও। ঢাকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা মোহাম্মদ কাইয়ুম ফল ঘোষণার পরপরই “ইঞ্জিনিয়ারিং”-এর কথা বলেন। অন্যদিকে নাহিদ ইসলাম। নিজের আসনের ক্ষেত্রে অভিযোগ না তুললেও তার জোটের সামগ্রিক পরাজয়ের জন্য একই বিষয়কে দায়ী করেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরাজিত দলগুলোর ফলাফল মেনে না নেওয়া নতুন কিছু নয়। আগে অভিযোগ থাকত প্রকাশ্য জালিয়াতি—ভোটকেন্দ্র দখল, ভয়ভীতি, ব্যালট ভরাট ইত্যাদি নিয়ে। কিন্তু এবার ভিন্ন চিত্র: ভোটগ্রহণ নিয়ে তেমন অভিযোগ নেই, বরং অভিযোগ উঠেছে ফলাফল ঘোষণার আগের কোনো অদৃশ্য প্রক্রিয়া নিয়ে, যাকে বলা হচ্ছে “ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং”।
এই অভিযোগ যাচাই করতে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়েছিল Netra News। নির্বাচন চলাকালীন এবং পরবর্তী সময়ে তারা সারা দেশে শত শত প্রতিনিধির মাধ্যমে Form-16 সংগ্রহ করে—যেখানে প্রতিটি কেন্দ্রে প্রার্থীদের প্রাপ্ত ভোটের হিসাব থাকে। প্রতিটি কেন্দ্রে তিন কপি করে এই ফর্ম তৈরি হয়: একটি প্রার্থীদের এজেন্টদের জন্য, একটি জনসাধারণের জন্য টানানো হয়, এবং একটি পাঠানো হয় রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে।
নির্বাচনের পরদিন সকালেই তাদের হাতে ছিল প্রায় ৮ হাজার Form-16। পরে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ হাজারের বেশি, যা ৪৮টি জেলার ২০৫টি আসনকে কভার করে। এই বিশাল ডেটা থেকে এলোমেলোভাবে ১,০০০টি ফর্ম বেছে নিয়ে সেগুলো নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত ফলাফলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। আসিফ শাহান এই পদ্ধতিকে “বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য” বলে মন্তব্য করেন।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৯৫৭টি কার্যকর ফর্মের মধ্যে মাত্র ৪টিতে কোনো অমিল ছিল—এবং সেগুলোও খুবই সামান্য। যেমন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে একজন প্রার্থীর ভোট সংখ্যা ১৯-এর বদলে ১ দেখা গেছে। ফেনী-২ আসনে ১ ভোটের পার্থক্য পাওয়া গেছে। চাঁদপুর-৪-এ পার্থক্য ছিল মাত্র ২ ভোট। সবচেয়ে বড় অমিল পাওয়া যায় ভোলা-৩ আসনে, যেখানে একজন প্রার্থীকে ১০০ ভোট কম দেখানো হয়েছে। তবে এই পার্থক্যগুলো সামগ্রিক ফলাফলে বড় কোনো পরিবর্তন আনেনি।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সব ফর্মেই দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার স্বাক্ষর ও সিল ছিল। কিছু ক্ষেত্রে প্রার্থীদের এজেন্টদের স্বাক্ষর না থাকলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটিকে অনিয়মের প্রমাণ হিসেবে ধরা যায় না। Md Abdul Alim বলেন, মূল বিষয় হলো কেন্দ্রের ফলাফল ও কমিশনের ফলাফল মেলে কিনা—এবং এই গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মিলে গেছে।
তবে এই বিশ্লেষণের সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। এটি শুধু ভোট গণনার পরের ধাপ—অর্থাৎ কেন্দ্র থেকে কমিশনে ফলাফল যাওয়ার পথে কোনো পরিবর্তন হয়েছে কিনা—তা নির্ণয় করতে পারে। কিন্তু ভোটদানে বাধা, ব্যালট কারচুপি বা গণনার সময় অনিয়ম—এসব বিষয় এটি ধরতে পারে না।
তারপরও এই বিশ্লেষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। এত বড় নমুনায় যদি মাত্র চারটি ছোটখাটো অমিল পাওয়া যায়, তাহলে অন্তত ফলাফল পরিবহনের পর্যায়ে বড় ধরনের কারচুপির প্রমাণ মেলে না। অর্থাৎ “ইঞ্জিনিয়ারিং” যদি কোথাও হয়ে থাকে, তা ব্যাপক বা পদ্ধতিগত নয়—অন্তত এই তথ্য সেট তাই বলছে।
সবশেষে বলা যায়, নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বিতর্ক বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন নয়। তবে এই গবেষণা দেখাচ্ছে, অভিযোগের পেছনে বাস্তবতা যাচাই করা জরুরি। আবেগ বা রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে এসে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করাই একটি গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথ।
আপনার মতামত জানানঃ