হাম একসময় সাধারণ একটি শৈশবকালীন রোগ হিসেবে বিবেচিত হলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি আবারও প্রাণঘাতী রূপ নিয়ে ফিরে এসেছে। দেশে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি উদ্বেগজনক, যেখানে অল্প সময়ের মধ্যেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশুর মৃত্যু জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে ৬ মাসের নিচের শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ ও মৃত্যুহার বেড়ে যাওয়ায় বিষয়টি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। প্রশ্ন উঠছে—কেন একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ আবার এত মারাত্মক হয়ে উঠল?
হাম মূলত একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা হাঁচি-কাশির মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি সহজেই আশপাশের বহু মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে। সাধারণত প্রথমে জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দেয়, এরপর কয়েকদিনের মধ্যে শরীরে লালচে ফুসকুড়ি ওঠে। কিন্তু এই সাধারণ উপসর্গের আড়ালেই লুকিয়ে থাকে মারাত্মক জটিলতার ঝুঁকি, যা অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের বর্তমান ভয়াবহতার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো টিকাদানের ঘাটতি। একটি সমাজে যদি প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষ টিকা গ্রহণ করে, তাহলে সংক্রমণ কার্যত ছড়াতে পারে না। কিন্তু দেশে এই হার অনেক নিচে নেমে এসেছে। গত কয়েক বছরে বিভিন্ন কারণে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে, ফলে বহু শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে গেছে। অনেক শিশু প্রথম ডোজ নিলেও দ্বিতীয় ডোজ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, ফলে পূর্ণ সুরক্ষা পাচ্ছে না। এই সুরক্ষাহীন শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এবং জটিলতা বাড়ছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো মায়েদের শরীরে অ্যান্টিবডির ঘাটতি। আগে ধারণা করা হতো, মায়ের শরীর থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডি শিশুকে জন্মের পর কয়েক মাস পর্যন্ত সুরক্ষা দেয়। কিন্তু বর্তমানে অনেক মা নিজেরাই টিকাবঞ্চিত বা পর্যাপ্ত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করেননি, ফলে নবজাতক শিশুরাও জন্মের সময় সেই সুরক্ষা পায় না। এর ফলে ৬ মাসের আগেই শিশুরা হামের ঝুঁকিতে পড়ে যাচ্ছে, যা আগে তুলনামূলক কম ছিল।
হাম সরাসরি মৃত্যুর কারণ না হলেও এর জটিলতাগুলো অত্যন্ত প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। বিশেষ করে নিউমোনিয়া বা শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা হামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে শিশুর জীবনকে বিপন্ন করে তোলে। হামে আক্রান্ত হলে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক কমে যায়, ফলে সুযোগসন্ধানী ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস সহজেই আক্রমণ করে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, শিশুরা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে, যা মূলত হামের পরবর্তী জটিলতা। এছাড়া চোখের প্রদাহ, মারাত্মক অপুষ্টি, এমনকি মস্তিষ্কের সংক্রমণও হতে পারে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
অপুষ্টি ও অন্যান্য শারীরিক দুর্বলতাও এই মৃত্যুহারের বড় কারণ। দেশের অনেক শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে, আবার অনেকের ডায়রিয়ার মতো সমস্যা রয়েছে, যা তাদের শরীরকে আরও দুর্বল করে দেয়। এই অবস্থায় হাম হলে শরীর তা মোকাবিলা করতে পারে না। ফলে খুব দ্রুত অবস্থার অবনতি ঘটে এবং মৃত্যু ঝুঁকি বেড়ে যায়। অপুষ্ট শিশুদের ক্ষেত্রে হামের জটিলতা কয়েকগুণ বেশি দেখা যায়।
চিকিৎসা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও এই সংকটকে বাড়িয়ে তুলছে। সংক্রামক রোগের জন্য পর্যাপ্ত হাসপাতাল বা বিশেষায়িত সেবা না থাকায় অনেক শিশু সময়মতো চিকিৎসা পাচ্ছে না। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে উন্নত চিকিৎসা সুবিধার অভাব, দেরিতে হাসপাতালে নেওয়া, অথবা ভুল চিকিৎসার কারণে অনেক ক্ষেত্রে রোগ জটিল হয়ে যায়। অনেক অভিভাবক শুরুতে সাধারণ জ্বর বা ঠান্ডা ভেবে বিষয়টি গুরুত্ব দেন না, ফলে যখন হাসপাতালে নেওয়া হয়, তখন অবস্থা অনেকটাই খারাপ হয়ে যায়।
ভুল ও অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসাও একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রে হামের প্রাথমিক পর্যায়ে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়, যা এই ভাইরাসজনিত রোগের ক্ষেত্রে কার্যকর নয়। বরং এতে রোগ নির্ণয়ে দেরি হয় এবং জটিলতা বাড়তে পারে। আবার কিছু ক্ষেত্রে লোকজ চিকিৎসা বা অজ্ঞতার কারণে সঠিক চিকিৎসা গ্রহণে বিলম্ব ঘটে, যা শিশুর জীবনের জন্য মারাত্মক হয়ে ওঠে।
তথ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। মৃত্যুর সঠিক সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি, জেলা পর্যায় থেকে ভুল তথ্য আসা, এবং কেন্দ্রীয়ভাবে সঠিকভাবে তথ্য সংরক্ষণ না হওয়া—এসব কারণে বাস্তব পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণেও সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
সামাজিক সচেতনতার অভাবও একটি বড় কারণ। অনেক অভিভাবক এখনো টিকার গুরুত্ব সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন নন, আবার কেউ কেউ ভ্রান্ত ধারণা বা গুজবে প্রভাবিত হয়ে টিকা দিতে অনীহা প্রকাশ করেন। ফলে শিশুরা অরক্ষিত থেকে যাচ্ছে। একই সঙ্গে রোগের লক্ষণ দেখা দিলেও অনেকেই দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান না, যা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তোলে।
এই সংকট মোকাবিলায় সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকাদান নিশ্চিত করা। হামের কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ নেই, তাই প্রতিরোধই একমাত্র উপায়। সরকার ইতিমধ্যে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, যেখানে ৬ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের টিকার আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ, যা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
একই সঙ্গে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। শিশুর নির্ধারিত সময় অনুযায়ী টিকা নিশ্চিত করা, হামের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া এবং শিশুর পুষ্টির দিকে নজর দেওয়া—এসব বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে, যাতে সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
সবশেষে বলা যায়, হাম হঠাৎ করে প্রাণঘাতী হয়ে ওঠেনি; বরং আমাদের অবহেলা, টিকাদানে ঘাটতি, সচেতনতার অভাব এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা একে এই অবস্থায় নিয়ে এসেছে। এটি একটি সতর্কবার্তা—যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হতে পারে। শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা শুধু পরিবার নয়, পুরো সমাজের দায়িত্ব। টিকাদান, সচেতনতা এবং সময়মতো চিকিৎসাই পারে এই প্রাণঘাতী পরিস্থিতি থেকে আমাদের বের করে আনতে।
আপনার মতামত জানানঃ