উনিশ শতকে ঢাকায় তিনটি বড় মিছিল খুবই জনপ্রিয় ছিল—ঈদ, মহররম ও জন্মাষ্টমী। এসব মিছিল অনেক সময় ধর্মীয় সীমা ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হতো। এই প্রেক্ষাপটে ঢাকার ঈদ মিছিল শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছিল না; এটি ছিল সামাজিক সমাবেশ, সাংস্কৃতিক উৎসব এবং শহরের প্রাণস্পন্দন।
ঐতিহাসিকভাবে, শিল্পী আলম মুসাওয়ারের চিত্রকর্মে ঈদ মিছিলের উল্লেখ পাওয়া যায়। উনিশ শতকের প্রথমার্ধে তিনি ঢাকার ঈদ ও মহররমের মিছিল নিয়ে ৩৯টি ছবি আঁকেন, যা বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। এসব ছবিতে নবাবি আমলের মিছিলের জাঁকজমক দেখা যায়—হাতি, উট, পালকি, রঙিন ছাউনি, ব্যানার। নায়েব-নাজিমরা সামনের সারিতে থাকতেন, আর রাস্তা ও ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে মানুষ মিছিল দেখত। সেখানে স্থানীয় মানুষ, মুঘল, এমনকি ইংরেজরাও উপস্থিত থাকত। ফকির ও পথশিল্পীরাও অংশ নিত।
ঈদ মিছিল ঠিক কবে শুরু হয়েছিল, তা নির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। ধারণা করা হয়, ১৮শ শতকে নায়েব-নাজিমরা নিমতলি প্রাসাদে বসবাস শুরু করার পর এই মিছিল চালু করেন। নবাবরা সম্ভবত জন্মাষ্টমীর মিছিল দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেদের ক্ষমতা ও জাঁকজমক প্রদর্শনের জন্য এই আয়োজন শুরু করেন। তবে কবে এই মিছিল বন্ধ হয়ে যায়, সেটিও স্পষ্ট নয়। আলম মুসাওয়ারের চিত্র অনুযায়ী, নায়েব-নাজিমদের পতনের পর উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এটি বন্ধ হয়ে যায়, কারণ এমন বড় আয়োজন চালাতে ধনী পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন ছিল।
সৈয়দ আলী আহসান ঢাকার ঈদ মিছিলের প্রাণবন্ত বর্ণনা দিয়েছেন। তখনকার প্রধান স্থান ছিল বর্তমান স্টেডিয়াম এলাকা। সকাল থেকেই বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ নতুন পোশাক পরে ঢোল-বাদ্য নিয়ে মিছিলে আসত। চুড়িহাট্টা, বংশাল, নবাবপুর থেকে বড় বড় মিছিল আসত। সবচেয়ে সুন্দর ও শৃঙ্খলিত মিছিল আসত সলিমুল্লাহ মুসলিম হল থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ড. হাসানের নেতৃত্বে পতাকা নিয়ে মিছিল করতেন। তিনি সাদা পাজামা, সাদা শেরওয়ানি ও সাদা পাগড়ি পরে সামনে হাঁটতেন, আর সবাই একসাথে “আল্লাহু আকবার” ধ্বনি দিত।
ঈদের দিন হিন্দু ও খ্রিস্টানরাও রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে মিছিল উপভোগ করত, আর বিদেশিরা ছবি তুলতে ভিড় করত। ঈদের নামাজ হতো তিন জায়গায়—পুরানা পল্টন, লালবাগ শাহী মসজিদ এবং চকবাজার মসজিদে। ঈদের দিন ও পরের দিন শহরে মেলা বসত। লাঠিখেলা ছিল খুবই জনপ্রিয়, যেখানে দক্ষ খেলোয়াড়রা একাধিক আক্রমণ প্রতিহত করার কৌশল দেখাত। এছাড়া এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে সাজানো পাত্রে খাবার পাঠানোর একটি সামাজিক রীতি ছিল।
জেমস ওয়াইজ উল্লেখ করেন যে, যেমন হিন্দু জমিদাররা মহররমে অর্থ সাহায্য করতেন, তেমনি মুসলিম জমিদাররাও দুর্গাপূজায় সহায়তা করতেন। অর্থাৎ সে সময় ধর্মীয় পরিচয় মানুষকে আলাদা করে দেখার বিষয় ছিল না; বরং উৎসবগুলো ছিল সবার আনন্দের উপলক্ষ। কিন্তু ব্রিটিশ আমলে ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতির ফলে ধীরে ধীরে বিভাজন, সন্দেহ এবং সাম্প্রদায়িকতা তৈরি হয়।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের আগে নবাবপুরে একটি দুঃখজনক ঘটনা ঘটে। দুই দিন ধরে কিছু হিন্দু বাড়ি থেকে মুসলমানদের ওপর ইট, কাঠ, বেঞ্চসহ নানা জিনিস নিক্ষেপ করা হয়, যাতে অনেকেই আহত হয়। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে, যা সম্ভবত ঢাকায় প্রথমবার ব্যবহৃত হয়। তবুও কিছু হিন্দু নেতা ও ব্রিটিশ কর্মকর্তারা মিছিলে অংশ নেন।
১৯৫২ ও ১৯৫৩ সালের ঈদ মিছিল শুধু আনন্দের উৎসব ছিল না, বরং রাজনৈতিক ও সামাজিক সমালোচনার একটি মাধ্যম হয়ে ওঠে। বিভিন্ন আকড়া ও দল তাদের সাজসজ্জা ও ব্যঙ্গচিত্রের মাধ্যমে সরকারি দুর্নীতি, পৌরসভার অদক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক বিষয়, যেমন কাশ্মীর সংকট, তুলে ধরত। ১৯৫৩ সালের মিছিল প্রায় এক মাইল দীর্ঘ ছিল এবং প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা ধরে চলে।
১৯৫৪ সালে দাঙ্গা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নিরাপত্তাজনিত কারণে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ঈদ মিছিল বন্ধ করে দেন। এরপর দীর্ঘ ৪২ বছর এই মিছিল আর অনুষ্ঠিত হয়নি। ১৯৯১ সালে হাজারীবাগে ছোট আকারে এটি আবার শুরু হয়। ১৯৯৪ সালে ‘ঈদ আনন্দ মিছিল’ নামে এটি পুনরায় চালু করা হয়, যেখানে ৩০টি এলাকার তরুণরা অংশ নেয়। সেখানে ব্যানার, ব্যান্ড পার্টি, ঘোড়ার গাড়ি, লাঠিখেলা, গান এবং ঐতিহ্যবাহী পোশাকের সমন্বয় দেখা যায়।
২০০০ সালে নতুন সহস্রাব্দে ঢাকার অ্যাসোসিয়েশন বড় পরিসরে ঈদ আনন্দ মিছিল আয়োজন করে, যেখানে হাজারো মানুষ অংশ নেয়। সাম্প্রতিক সময়ে এই ঐতিহ্য ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে, মূলত পৃষ্ঠপোষকতার অভাব ও সময়ের পরিবর্তনের কারণে। তবে ২০২৫ সালে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন আবার ঈদ মিছিল, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও মেলার আয়োজন করে, যা এই ঐতিহ্যকে নতুন করে জীবিত করার চেষ্টা।
ঈদ মিছিল শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি শহরের মানুষের মিলন, আনন্দ এবং ঐক্যের প্রতীক। এখানে ধনী-গরিব, ছোট-বড়—সবাই একসাথে অংশ নেয়, এবং সাময়িকভাবে সামাজিক ভেদাভেদ ভুলে যায়। এই মিছিল ঢাকার সামাজিক সংহতি ও সম্প্রীতির এক অনন্য প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
আপনার মতামত জানানঃ