সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যোগাযোগ, বিনোদন, শিক্ষা কিংবা ব্যবসা—সব ক্ষেত্রেই ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম কোটি কোটি মানুষের নির্ভরতার জায়গা হয়ে উঠেছে। কিন্তু প্রযুক্তির এই উজ্জ্বল দুনিয়ার আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ বাস্তবতা, যেখানে অপরাধী চক্র একই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করছে শিশুদের শোষণ, যৌন নির্যাতনের উপকরণ ছড়িয়ে দেওয়া এবং অবৈধ বাণিজ্যের জন্য। সম্প্রতি বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের এক অনুসন্ধান সেই অন্ধকার জগতেরই ভয়াবহ চিত্র সামনে এনেছে। তদন্তে উঠে এসেছে, ভারতে ইনস্টাগ্রামে এমন বিজ্ঞাপন অনুমোদিত হয়েছে, যেগুলো ব্যবহারকারীদের টেলিগ্রামের বিভিন্ন চ্যানেলে নিয়ে গিয়ে শিশু যৌন নির্যাতনের ভিডিও বিক্রির প্রস্তাব দিচ্ছিল। এই অনুসন্ধান শুধু একটি প্রযুক্তিগত ব্যর্থতার গল্প নয়; এটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহি, অ্যালগরিদমের সীমাবদ্ধতা এবং শিশু সুরক্ষার বৈশ্বিক সংকট নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
বিবিসির অনুসন্ধান অনুযায়ী, তদন্তকারীরা প্রথমে একটি নতুন ছদ্মনামের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট তৈরি করেন। অ্যাকাউন্টটি যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কনটেন্ট তৈরিকারী কিছু প্রোফাইল অনুসরণ করার পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই অ্যালগরিদম সেই ব্যবহারকারীর ফিডে আরও বেশি যৌনধর্মী বিজ্ঞাপন দেখাতে শুরু করে। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে শিশুদের যৌন নির্যাতনের ইঙ্গিতপূর্ণ কনটেন্ট এবং টেলিগ্রাম চ্যানেলের লিংকও দেখানো শুরু হয়। এসব লিংকে প্রবেশ করলে অর্থের বিনিময়ে শিশু নির্যাতনের ভিডিও কেনার প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছিল। তদন্তে প্রায় ৩০টি পৃথক বিজ্ঞাপন শনাক্ত করা হয়, যেগুলো শিশু যৌন নির্যাতনের উপাদান প্রচার করছিল। একই সঙ্গে আরও প্রায় ২০টি বিজ্ঞাপনে প্রাপ্তবয়স্কদের পর্নোগ্রাফিক কনটেন্টও পাওয়া যায়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব বিজ্ঞাপন ইনস্টাগ্রামের নিজস্ব বিজ্ঞাপন ব্যবস্থার মাধ্যমে অনুমোদিত হয়েছিল। অর্থাৎ প্ল্যাটফর্মের নীতিমালা অনুযায়ী বিজ্ঞাপনগুলো স্বয়ংক্রিয় বা মানবিক পর্যালোচনার ধাপ অতিক্রম করেই ব্যবহারকারীদের সামনে পৌঁছেছিল। বিবিসি যখন এমন একটি বিজ্ঞাপন ইনস্টাগ্রামের কাছে রিপোর্ট করে, তখন প্রথম প্রতিক্রিয়ায় জানানো হয় যে সেটি কমিউনিটি গাইডলাইন লঙ্ঘন করেনি। পরে বিবিসি সরাসরি মেটার কাছে মন্তব্য চাইলে প্রতিষ্ঠানটি স্বীকার করে যে তাদের সিস্টেম সবসময় নীতিমালা লঙ্ঘনকারী কনটেন্ট শনাক্ত করতে পারে না। এরপর তারা একাধিক বিজ্ঞাপন সরিয়ে দেয়, সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট স্থগিত করে এবং আরও কিছু ক্ষতিকর লিংক ব্লক করার পদক্ষেপ নেয়।
মেটা জানিয়েছে, শিশুদের যৌন শোষণ একটি জঘন্য অপরাধ এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে তারা নিয়মিত প্রযুক্তি উন্নত করছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো সিস্টেমই শতভাগ নিখুঁত নয়। বিজ্ঞাপন অনুমোদনের পরও সেগুলোর ওপর নজরদারি চালানো হয় এবং ব্যবহারকারীদের রিপোর্টের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি আরও জানায়, তারা শিশু নির্যাতনের তথ্য পেলে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ন্যাশনাল সেন্টার ফর মিসিং অ্যান্ড এক্সপ্লয়েটেড চিলড্রেন (NCMEC)-এর কাছে রিপোর্ট পাঠায়, যা পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।
অন্যদিকে টেলিগ্রামও বিবিসিকে জানায়, তারা শিশু যৌন নির্যাতনের উপকরণ শনাক্ত ও অপসারণে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি এবং মানবিক পর্যালোচনা—দুই ধরনের ব্যবস্থাই ব্যবহার করে। তাদের দাবি, চলতি বছর তারা দুই লক্ষ ৭৪ হাজারের বেশি গ্রুপ ও চ্যানেল সরিয়ে দিয়েছে, যেগুলো শিশু নির্যাতনের কনটেন্টের সঙ্গে জড়িত ছিল। তবে বিবিসির তদন্তে দেখা গেছে, একটি চ্যানেল সরিয়ে দেওয়া হলেও অন্য একটি চ্যানেল একই ধরনের কনটেন্ট প্রচার অব্যাহত রেখেছিল। ফলে প্রযুক্তিগত পদক্ষেপের পাশাপাশি অপরাধীরা কত দ্রুত নতুন পথ খুঁজে নেয়, সেটিও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সমস্যা শুধু একটি প্ল্যাটফর্মের নয়; বরং এটি পুরো ডিজিটাল ইকোসিস্টেমের দুর্বলতার প্রতিফলন। এক প্ল্যাটফর্ম থেকে কনটেন্ট সরানো হলে অপরাধীরা দ্রুত অন্য প্ল্যাটফর্মে চলে যায়। ইনস্টাগ্রাম থেকে টেলিগ্রাম, টেলিগ্রাম থেকে অন্য কোনো এনক্রিপটেড অ্যাপে—এই স্থানান্তর এত দ্রুত ঘটে যে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জন্য তাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে শুধু কনটেন্ট মুছে ফেলা নয়, অপরাধী চক্রের আর্থিক লেনদেন, যোগাযোগব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়াও জরুরি হয়ে উঠেছে।
ভারতের সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মদন লোকুর এই অনুসন্ধানকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, যদি একটি প্ল্যাটফর্ম অপরাধমূলক বিজ্ঞাপন থেকে অর্থ উপার্জনের সুযোগ করে দেয়, তবে সেটি কেবল প্রযুক্তিগত ব্যর্থতা নয়; বরং সামাজিক দায়বদ্ধতারও প্রশ্ন। তিনি মনে করেন, এত গুরুতর বিষয় হলে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট স্বতঃপ্রণোদিতভাবে বিষয়টি বিবেচনায় নিতে পারে এবং সরকারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিতে পারে। তাঁর ভাষায়, ব্যবহারকারীদের আপলোড করা কনটেন্টের জন্য কিছু আইনি সুরক্ষা থাকলেও প্ল্যাটফর্মের নিজস্ব দায়িত্ব কোনোভাবেই এড়ানো যায় না।
সাবেক ফেসবুক ভাইস প্রেসিডেন্ট ব্রায়ান বোল্যান্ডও বিবিসির অনুসন্ধান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, ইনস্টাগ্রামের অ্যালগরিদম এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে ব্যবহারকারীদের আরও দীর্ঘ সময় প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখা যায়। এজন্য অ্যালগরিদম অনেক সময় ব্যবহারকারীর আগ্রহের ভিত্তিতে আরও চরম, আরও উত্তেজক এবং আরও আকর্ষণমূলক কনটেন্ট সামনে নিয়ে আসে। তাঁর মতে, অ্যালগরিদমের উদ্দেশ্য মানুষকে অপরাধী বানানো নয়, কিন্তু যদি নিরাপত্তা ও নৈতিকতার বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব না পায়, তাহলে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ফলাফল তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। তিনি আরও উল্লেখ করেন, একসময় কোম্পানিতে কাজ করার সময় ব্যবহারকারীর নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন সরাতে আয়ের একটি বড় অংশ ত্যাগ করার অনুমতি ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসায়িক আয় এবং ব্যবহারকারীর নিরাপত্তার ভারসাম্য বদলে গেছে বলে তাঁর মন্তব্য।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর অর্থনৈতিক কাঠামোও এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। মেটার মোট আয়ের প্রায় সবটাই বিজ্ঞাপন থেকে আসে। ফলে যত বেশি বিজ্ঞাপন, তত বেশি আয়। এ কারণে বিজ্ঞাপন যাচাই প্রক্রিয়ায় সামান্য ত্রুটিও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। যদিও মেটা বলছে, প্রতিটি বিজ্ঞাপন প্রকাশের আগে ছবি, ভিডিও, লেখা, অডিও, লক্ষ্যবস্তু এবং সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট বিশ্লেষণ করা হয়, তবু বাস্তবতা দেখাচ্ছে যে অপরাধীরা ভাষা, ছবি এবং কোডওয়ার্ড ব্যবহার করে সেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা ফাঁকি দিতে সক্ষম হচ্ছে।
ভারতের সাইবার নিরাপত্তা কর্মকর্তারাও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাদের মতে, শিশু নির্যাতনের মেটেরিয়াল সংক্রান্ত বিপুলসংখ্যক রিপোর্ট মেটার প্ল্যাটফর্ম থেকেই আসে। তবে এর অর্থ এই নয় যে কেবল মেটাতেই সবচেয়ে বেশি অপরাধ ঘটে; বরং তাদের শনাক্তকরণ ব্যবস্থাও তুলনামূলকভাবে সক্রিয় হতে পারে। একই সঙ্গে শিশু সুরক্ষায় কাজ করা বিভিন্ন সংস্থা বলছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে ক্ষতিকর কনটেন্ট সরিয়ে ফেললেও অপরাধীরা দ্রুত নতুন অ্যাকাউন্ট খুলে বা অন্য প্ল্যাটফর্মে চলে গিয়ে একই কার্যক্রম চালিয়ে যায়। ফলে প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা একা যথেষ্ট নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু যৌন নির্যাতনের বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াইয়ের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত প্রয়োজন। কারণ এই অপরাধের সঙ্গে প্রায়ই মানবপাচার, সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র, সীমান্ত অতিক্রমকারী আর্থিক লেনদেন এবং এনক্রিপটেড যোগাযোগব্যবস্থা জড়িয়ে থাকে। একটি দেশে কনটেন্ট তৈরি, অন্য দেশে সংরক্ষণ এবং তৃতীয় দেশে বিক্রির মতো জটিল নেটওয়ার্কের কারণে কেবল জাতীয় আইন প্রয়োগ করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান ছাড়া এই অপরাধ দমন কঠিন।
এই অনুসন্ধান আমাদের সামনে একটি কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরে। প্রযুক্তি মানুষের জীবন সহজ করেছে, কিন্তু একই প্রযুক্তি অপরাধীদের হাতেও শক্তিশালী অস্ত্র হয়ে উঠেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অ্যালগরিদম এবং স্বয়ংক্রিয় বিজ্ঞাপন ব্যবস্থার সুবিধা যত বাড়ছে, ততই প্রয়োজন হচ্ছে আরও শক্তিশালী নিরাপত্তা কাঠামো, মানবিক তদারকি এবং কার্যকর জবাবদিহির। কারণ একটি ব্যর্থ অ্যালগরিদম শুধু ভুল কনটেন্ট দেখায় না; কখনও কখনও সেটি ভয়াবহ অপরাধের পথও সুগম করে দিতে পারে।
সবশেষে, এই ঘটনা কেবল ভারত বা একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সমস্যা নয়; এটি পুরো বিশ্বের জন্য সতর্কবার্তা। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর উচিত নিরাপত্তাকে ব্যবসার সমান গুরুত্ব দেওয়া, সরকারগুলোর উচিত আধুনিক আইন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা এবং ব্যবহারকারীদেরও সন্দেহজনক কনটেন্ট দেখলে দ্রুত রিপোর্ট করার সংস্কৃতি গড়ে তোলা। শিশুদের নিরাপত্তা কোনো ব্যবসায়িক অগ্রাধিকারের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না। ডিজিটাল বিশ্বের ভবিষ্যৎ নিরাপদ রাখতে প্রযুক্তি, আইন এবং সামাজিক সচেতনতার সমন্বিত উদ্যোগই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
আপনার মতামত জানানঃ