রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই নিজেকে একটি বহুজাতিক, বহুধর্মীয় এবং বহু-সাংস্কৃতিক রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরেছে। দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রায়ই দাবি করে যে রাশিয়ায় মুসলিম, খ্রিস্টান, ইহুদি ও অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায় শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বসবাস করছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলিম ধর্মীয় নেতা, আলেম এবং মুসলিম কমিউনিটি প্রতিনিধিদের গ্রেফতারের ঘটনা নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, এসব গ্রেফতার কি সত্যিই নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার স্বার্থে পরিচালিত হচ্ছে, নাকি এর পেছনে রয়েছে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা?
২০২৬ সালের মে মাসে রাশিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী একাধিক মুসলিম আলেম ও ধর্মীয় নেতাকে আটক করে। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমে এসব ঘটনার সীমিত প্রচার হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং স্বাধীন সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন কারেলিয়ার সাবেক মুফতি উইসাম বার্দভিল, ধর্মীয় নেতা আখমাদ তাঙ্গিয়েভ, মর্দোভিয়ার মুফতি রয়াল আসেনভ এবং আরও কয়েকজন মুসলিম কমিউনিটি প্রতিনিধি।
সরকারি সূত্রে তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছে। কোথাও ‘পুলিশের সঙ্গে অবাধ্যতা’, কোথাও ‘ঘুষ চাওয়া’, আবার কোথাও ‘চরমপন্থী সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ’ থাকার অভিযোগ সামনে এসেছে। তবে সমালোচকদের মতে, এসব অভিযোগের প্রকৃতি এবং সময়কাল এমনভাবে সামনে এসেছে যে অনেকের কাছেই বিষয়টি কেবল আইনগত পদক্ষেপ বলে মনে হচ্ছে না।
রাশিয়ায় মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দুই কোটিরও বেশি। ইউরোপের মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড় মুসলিম জনসংখ্যা। দেশটির উত্তর ককেশাস, তাতারস্তান, বাশকোর্তোস্তান, চেচনিয়া এবং ভলগা অঞ্চলে মুসলমানদের শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে রাশিয়ার মুসলিম জনগোষ্ঠী দেশটির রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অংশ হলেও বিভিন্ন সময় তাদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের সম্পর্ক জটিল হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর চেচনিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন এবং সশস্ত্র সংঘাতের কারণে মুসলিম পরিচয়কে প্রায়ই নিরাপত্তা ইস্যুর সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়েছে। ভ্লাদিমির পুতিন ক্ষমতায় আসার পর কঠোর নিরাপত্তা নীতির পাশাপাশি মুসলিম সম্প্রদায়ের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্কও বজায় রাখার চেষ্টা করেন। বড় বড় মসজিদ নির্মাণ, মুসলিম নেতাদের সঙ্গে বৈঠক এবং ইসলামিক বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে রাশিয়া নিজেকে মুসলিমবান্ধব রাষ্ট্র হিসেবেও উপস্থাপন করেছে।
কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই চিত্রের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। গ্রেফতার হওয়া মুসলিম নেতাদের অনেকেই স্পিরিচুয়াল বোর্ড অব মুসলিমস বা ডিইউএমের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। ডিইউএম দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন হিসেবে পরিচিত। সংগঠনটি সাধারণত ক্রেমলিনের সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক বজায় রেখে এসেছে এবং রাষ্ট্রীয় নীতির প্রকাশ্য বিরোধিতা খুব কমই করেছে।
তবুও কেন হঠাৎ এতগুলো মুসলিম নেতাকে লক্ষ্যবস্তু করা হলো—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিশ্লেষকরা সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে নজর দিচ্ছেন। বিশেষ করে আবাসিক ভবনে ধর্মীয় সমাবেশ ও জামাতে নামাজ আদায়ের ওপর নতুন বিধিনিষেধ আরোপের উদ্যোগকে অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হিসেবে দেখছেন।
ডিইউএম প্রধান রাভিল গাইনুতদিন সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট পুতিনের কাছে একটি খোলা চিঠি লিখে এই আইনের বিরোধিতা করেন। তিনি যুক্তি দেন যে নতুন আইন মুসলমানদের সাংবিধানিক ধর্মীয় অধিকার ক্ষুণ্ন করতে পারে। তার মতে, রাশিয়ায় পর্যাপ্ত মসজিদ ও উপাসনালয় না থাকায় অনেক মুসলমান বাধ্য হয়ে বাসাবাড়িতে ধর্মীয় সমাবেশ আয়োজন করেন। নতুন আইন কার্যকর হলে এসব কর্মকাণ্ডও অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এই অবস্থানের পরপরই একাধিক মুসলিম নেতার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও ফৌজদারি পদক্ষেপ শুরু হওয়ায় অনেকেই দুটি ঘটনার মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে পাচ্ছেন। যদিও সরকারিভাবে এমন কোনো সম্পর্কের কথা স্বীকার করা হয়নি।
এদিকে রাশিয়ার উগ্র জাতীয়তাবাদী ও কট্টর ডানপন্থি গোষ্ঠীগুলো এসব গ্রেফতারকে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে মুসলিম প্রতিষ্ঠানগুলোকে সন্দেহের চোখে দেখে আসছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা দাবি করছে যে রাষ্ট্র অবশেষে তথাকথিত ‘ইসলামিক প্রভাব’ মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবেশ আরও জাতীয়তাবাদী হয়ে উঠেছে। যুদ্ধের ফলে রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের যে নতুন বয়ান গড়ে উঠছে, সেখানে অর্থোডক্স খ্রিস্টান ঐতিহ্যকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই প্রবণতা দেশের অন্যান্য জাতিগত ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
মুসলিম নেতাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর মধ্যে মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। রাশিয়া ২০০৩ সালেই সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। ফলে এ ধরনের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এসব অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত জনসমক্ষে পর্যাপ্ত তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ধরন একরকম নয়। কেউ অভিযুক্ত হয়েছেন অবাধ্যতার জন্য, কেউ ঘুষের অভিযোগে, আবার কেউ চরমপন্থী সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগে। ফলে এটি কোনো একক মামলার অংশ নাকি বৃহত্তর একটি অভিযানের অংশ, সেটি এখনো পরিষ্কার নয়।
রাশিয়ার মুসলিম সম্প্রদায়ের ভেতরেও এ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। যদিও অনেক ধর্মীয় নেতা প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে সতর্কতা অবলম্বন করছেন, তবুও অনেকে মনে করছেন যে পরিস্থিতি ভবিষ্যতে আরও জটিল হতে পারে। কারণ গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজন ছিলেন স্থানীয় পর্যায়ে অত্যন্ত প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা।
রাশিয়ার ইতিহাসে ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের সম্পর্ক সবসময়ই সংবেদনশীল ছিল। সোভিয়েত যুগে ধর্মীয় কর্মকাণ্ড কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হতো। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর কিছুটা উন্মুক্ত পরিবেশ তৈরি হলেও নিরাপত্তা ইস্যুর কারণে মুসলিম প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়ই বিশেষ নজরদারির মধ্যে থেকেছে।
বর্তমান পরিস্থিতি তাই অনেক পুরোনো বিতর্ককে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। রাশিয়া কি সত্যিই তার মুসলিম নাগরিকদের সমান মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করতে পারছে? নাকি জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে ধর্মীয় পরিচয় ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে? এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—সাম্প্রতিক গ্রেফতারগুলো শুধু কয়েকজন ধর্মীয় নেতার ব্যক্তিগত সমস্যা নয়। এটি রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় নীতি, ধর্মীয় স্বাধীনতা, জাতীয় পরিচয় এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের ভবিষ্যৎ অবস্থান নিয়ে একটি বড় আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে। আগামী মাসগুলোতে তদন্তের অগ্রগতি, আদালতের সিদ্ধান্ত এবং সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন আইনগত ব্যবস্থা ছিল, নাকি রাশিয়ার মুসলিম সমাজের জন্য একটি নতুন বাস্তবতার সূচনা।
আপনার মতামত জানানঃ