২০১৮ সাল থেকে রাসেলের পরিবার ন্যায়বিচারের আশায় একের পর এক দরজায় কড়া নাড়তে শুরু করে। সীমান্তের একটি ঘটনার শিকার হয়ে গুরুতর আহত হওয়ার পর তাদের জীবন যেন হঠাৎ করেই থেমে যায়। সেই সময় থেকেই পরিবারের সদস্যরা বাংলাদেশে ভারতীয় হাই কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন। তারা একাধিকবার কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করেন, ঘটনার বিবরণ তুলে ধরেন, এবং অনুরোধ করেন যেন বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হয়। তাদের প্রত্যাশা ছিল—একটি নিরপেক্ষ তদন্ত হবে, দোষীদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে, এবং একজন নিরীহ মানুষের জীবনে যে ভয়াবহ ক্ষতি হয়েছে তার যথাযথ প্রতিকার মিলবে।
রাসেলের ভাই রুবেল মিয়া স্মৃতিচারণ করে বলেন, তারা স্পষ্টভাবেই জানিয়েছিলেন—এই ঘটনার জন্য অবশ্যই বিচার হতে হবে। তাদের অভিযোগ, শুরুতে কিছুটা আশ্বাস মিললেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই আশ্বাস ফিকে হয়ে যায়। তিনি বলেন, ২০২০ সালে তাদের জানানো হয়েছিল যে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। সেই সময় পরিবারটি কিছুটা আশাবাদী হয়ে উঠেছিল। তারা ভেবেছিল, হয়তো দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে কোনো সমাধান আসতে চলেছে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। ২০২০ সালের পরপরই শুরু হয় বৈশ্বিক মহামারি কোভিড ১৯, আর সেই সঙ্গে যেন থেমে যায় সব ধরনের যোগাযোগ।
রুবেল মিয়ার ভাষায়, মহামারির অজুহাতে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। তারা বহুবার চেষ্টা করেছেন আবার যোগাযোগ স্থাপন করতে, কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছেন। এমনকি হাই কমিশনের কার্যালয়ে প্রবেশ করতেও তাদের অনুমতি দেওয়া হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন। একসময় যে জায়গা থেকে তারা ন্যায়বিচারের আশ্বাস পেয়েছিলেন, সেই জায়গাটিই তাদের কাছে অপ্রবেশযোগ্য হয়ে ওঠে। সময় গড়াতে থাকে, কিন্তু কোনো তদন্ত শুরু হয় না, কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায় না। এভাবে কেটে গেছে আটটি দীর্ঘ বছর—একটি পরিবারের জন্য যা এক অনন্ত অপেক্ষার মতো।
ঘটনার মানবিক দিকটি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে রাসেলের মা আঞ্জুয়ারা বেগমের কথায়। চলতি বছরের ৩ এপ্রিল তিনি যখন সেই দিনের কথা স্মরণ করেন, তার কণ্ঠে ছিল অসহায়তা, ক্ষোভ এবং গভীর বেদনার মিশ্রণ। তিনি বলেন, তার ছেলের চোখ-মুখ এতটাই ফুলে গিয়েছিল এবং রক্তে ভরে ছিল যে তাকে চেনার উপায় ছিল না। একজন মায়ের কাছে এর চেয়ে ভয়াবহ দৃশ্য আর কী হতে পারে—নিজের সন্তানের মুখই চিনতে না পারা। তিনি জানান, সাত দিন পর তার সন্তান চোখ খুলতে সক্ষম হয়। সেই সাত দিন ছিল এক অন্তহীন দুঃস্বপ্নের মতো—যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত ছিল অনিশ্চয়তা আর আতঙ্কে ভরা।
আঞ্জুয়ারা বেগম এখনও সেই ঘটনার প্রমাণ নিজের কাছে সংরক্ষণ করে রেখেছেন। বিএসএফের ছোড়া বার্ডশটের গুলি, যেগুলো তার ছেলেকে আহত করেছিল, তিনি সেগুলো পলিথিনে মুড়িয়ে রেখে দিয়েছেন। এই ছোট ছোট ধাতব টুকরোগুলো শুধু একটি ঘটনার সাক্ষ্য নয়, বরং একটি পরিবারের ভেঙে পড়া জীবনের প্রতীক। তিনি বলেন, এই গুলিই তার নিরীহ ছেলেকে পঙ্গু করে দিয়েছে। তার কণ্ঠে স্পষ্ট ছিল একটাই দাবি—বিচার।
এই গল্পটি কেবল একটি পরিবারের দুর্ভাগ্যের কাহিনি নয়; এটি সীমান্ত বাস্তবতার একটি কঠিন চিত্র। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন সীমান্ত অঞ্চলে প্রায়ই এমন ঘটনা ঘটে, যেখানে সাধারণ মানুষ নানা কারণে সহিংসতার শিকার হন। অনেক সময় এসব ঘটনা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিলতার আড়ালে চাপা পড়ে যায়, আর ভুক্তভোগীরা থেকে যান উপেক্ষিত। রাসেলের ঘটনাও যেন সেই একই চক্রের একটি অংশ—যেখানে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সত্য, বিচার এবং মানবিকতা সবই ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যায়।
আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকেও এই ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী, যেকোনো ধরনের সীমান্ত সহিংসতার ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিবেচনায় অনেক সময় এই দায় এড়িয়ে যাওয়া হয়। ফলে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন, এবং একই ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতেও ঘটার ঝুঁকি থেকে যায়।
রাসেলের পরিবারের জন্য এই আট বছর কেবল সময়ের হিসাব নয়; এটি এক দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। প্রতিদিন তারা নতুন করে আশা করেন, আবার হতাশ হন। প্রতিবার তারা ভাবেন—হয়তো এবার কিছু হবে, হয়তো এবার কেউ তাদের কথা শুনবে। কিন্তু প্রতিবারই সেই আশা ভেঙে যায়। তবুও তারা থেমে থাকেননি। তারা এখনো কথা বলে যাচ্ছেন, এখনো বিচার দাবি করে যাচ্ছেন।
এই ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনেক সময় রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যে বিষয়গুলো উপেক্ষিত থাকে, গণমাধ্যম সেটিকে সামনে নিয়ে আসে। রাসেলের ঘটনাটিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে মূলত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলোর মাধ্যমে। এতে অন্তত একটি বিষয় নিশ্চিত হয়েছে—এই গল্পটি হারিয়ে যায়নি, এবং এর ভুক্তভোগীরা এখনো দৃশ্যমান।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এর পর কী? একটি পরিবারের এই দীর্ঘ অপেক্ষার শেষ কোথায়? তারা কি কখনো ন্যায়বিচার পাবে, নাকি এই ঘটনাও ধীরে ধীরে ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো অজানা। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—এই গল্পটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সীমান্ত শুধু ভৌগোলিক বিভাজন নয়; এটি কখনো কখনো মানবিক ট্র্যাজেডিরও একটি রেখা।
আঞ্জুয়ারা বেগমের হাতে রাখা সেই পলিথিন মোড়ানো গুলিগুলো যেন এক নীরব সাক্ষী—একটি ঘটনার, একটি ব্যর্থ ব্যবস্থার, এবং একটি পরিবারের অবিরাম সংগ্রামের। তার চোখে আজও সেই দিনের ভয়াবহতা ভাসে, আর তার কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হয় একটাই কথা—“আমার ছেলের জন্য আমি বিচার চাই।” এই দাবি শুধু একজন মায়ের নয়; এটি প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকারের দাবি, যা কোনো সীমান্ত, কোনো রাজনীতি, কোনো অজুহাত দিয়ে অস্বীকার করা যায় না।
আপনার মতামত জানানঃ