গুগল ম্যাপে বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তের দিকে তাকালে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে একটি বিস্তৃত গাঢ় সবুজ অঞ্চল চোখে পড়ে, যা আসলে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের খাসিয়া ও জৈন্তিয়া পাহাড়ের ঘন বনাঞ্চল। এই অঞ্চল শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই নয়, বরং এর ভৌগোলিক ও পরিবেশগত গুরুত্বের কারণেও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর অন্যতম আর্দ্র স্থান চেরাপুঞ্জি ও মৌসিনরাম এই অঞ্চলেরই অংশ, যেখানে বিপুল বৃষ্টিপাতের ফলে অসংখ্য নদ-নদীর জন্ম হয়। এই পাহাড়ি অঞ্চল থেকেই মিন্তদু ও কিনশি নদ উৎপন্ন হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশে প্রবেশের পর মিন্তদু নদ সারি-গোয়াইন নামে পরিচিত হয়, আর কিনশি নদ যাদুকাটা নামে প্রবাহিত হয়। এই নদীগুলো শেষ পর্যন্ত মেঘনা অববাহিকার অংশ হয়ে সুরমা নদীতে গিয়ে মিশেছে, যা আন্তসীমান্ত নদী হিসেবে দুই দেশের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে মোট ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে, যেগুলোর পানি বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা ধরনের টানাপোড়েন চলছে। এর মধ্যে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন সমস্যা দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম স্পর্শকাতর ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। একইভাবে মিন্তদু ও কিনশি নদ নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে মেঘালয়ে ধারাবাহিকভাবে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের পরিকল্পনার কারণে। ইতিমধ্যে মিন্তদু নদে ‘লেশকা স্টেজ এক’ নামে একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প চালু রয়েছে, যা ‘রান অব দ্য রিভার’ পদ্ধতিতে পরিচালিত বলে দাবি করা হয়। অর্থাৎ, এতে বড় জলাধার তৈরি না করে নদীর প্রবাহিত পানিকে টানেলের মাধ্যমে সরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে আবার নদীতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। প্রথমদিকে এই প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশ তেমন আপত্তি জানায়নি।
কিন্তু পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে যখন একই নদীতে পর্যায়ক্রমে আরও প্রকল্প নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। মিন্তদু লেশকা স্টেজ দুই প্রকল্প এবং তার উজানে সেলিম জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে। এসব প্রকল্পে দীর্ঘ টানেলের মাধ্যমে নদীর পানি একাধিকবার ঘুরিয়ে ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি নদীতে যদি অল্প দূরত্বের মধ্যে একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি হয়, তাহলে তা নদীর স্বাভাবিক গতি ও প্রবাহে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। এতে শুধু নদীর পরিবেশই নয়, বরং পুরো অববাহিকার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
মেঘালয়ে বর্তমানে ১০টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প চালু রয়েছে, যেগুলো থেকে প্রায় ৩৭৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। নতুন বিদ্যুৎ নীতির আওতায় আরও প্রকল্প গ্রহণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কিনশি নদেও একাধিক প্রকল্প পুনরুজ্জীবিত করা হচ্ছে, যার মধ্যে ২৭০ ও ২৭৮ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি বড় প্রকল্প রয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নদীর পানির প্রবাহে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে ‘রান অব দ্য রিভার’ প্রকল্পগুলো যখন একের পর এক সারিবদ্ধভাবে গড়ে ওঠে, তখন একটি প্রকল্প থেকে পানি ছাড়ার পরপরই তা অন্য প্রকল্পে ব্যবহার করা হয়। ফলে নদীর একটি বড় অংশে স্বাভাবিক প্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
এই পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে ভাটির দেশ বাংলাদেশে। সিলেট ও সুনামগঞ্জ অঞ্চলের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এই নদীগুলোর ওপর নির্ভরশীল। কৃষিকাজ, মাছ ধরা, বালু ও পাথর উত্তোলন—সবকিছুই এই নদীকেন্দ্রিক। যদি নদীর পানি কমে যায় বা প্রবাহ পরিবর্তিত হয়, তাহলে এসব এলাকার মানুষের জীবিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ইতিমধ্যেই স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, আগের প্রকল্পগুলোর কারণে নদীর পানি দূষিত হয়েছে এবং অনেক জায়গায় নদী শুকিয়ে গেছে। নির্মাণকাজের সময় তেল ও সিমেন্ট নদীতে পড়ে পানির গুণগত মান নষ্ট হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পরিবেশগত দিক থেকেও এই প্রকল্পগুলো বড় ধরনের হুমকি তৈরি করতে পারে। নদীর প্রবাহে পরিবর্তন এলে মাছসহ জলজ প্রাণীর জীবনচক্র ব্যাহত হয়। বিশেষ করে পরিযায়ী মাছের চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়, যা স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর। একই সঙ্গে নদীর তলদেশের গঠন পরিবর্তিত হলে নদীভাঙন, ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়। অতিবৃষ্টির সময় হঠাৎ করে বিপুল পরিমাণ পানি ছাড়া হলে নিচু এলাকাগুলোতে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিতে পারে, যা মানুষের জীবন ও সম্পদের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এই ঝুঁকি আরও বাড়ছে। মেঘালয় ও বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে আবহাওয়ার ধরনে ইতিমধ্যে পরিবর্তন এসেছে। শুষ্ক মৌসুম দীর্ঘ হচ্ছে, আবার বর্ষাকালে স্বল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বাড়ছে। ফলে হঠাৎ করে পাহাড়ি ঢল বা হড়কা বানের ঘটনা বাড়ছে। এই অবস্থায় যদি একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব প্রকল্পের সম্মিলিত প্রভাব সম্পর্কে এখনো পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। একটি প্রকল্প আলাদাভাবে কম ক্ষতিকর মনে হলেও, একাধিক প্রকল্প একসঙ্গে বাস্তবায়িত হলে তার প্রভাব অনেক বেশি হতে পারে। তাই পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA) সঠিকভাবে করা এবং তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে আন্তসীমান্ত নদীগুলোর ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে সমন্বিত পরিকল্পনা ও সহযোগিতা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের জন্য এটি শুধু পরিবেশগত নয়, বরং অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়ও। নদীভিত্তিক জীবনযাত্রার ওপর নির্ভরশীল লাখো মানুষের ভবিষ্যৎ এই প্রকল্পগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তাই এখনই সতর্ক না হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হতে পারে। উন্নয়নের নামে যদি নদী ও পরিবেশ ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে সেই উন্নয়ন টেকসই হবে না।
এই প্রেক্ষাপটে প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা, স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ এবং দুই দেশের মধ্যে কার্যকর সংলাপ। নদী শুধু একটি প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, এটি একটি জীবন্ত ব্যবস্থা, যার ওপর নির্ভর করে মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও অর্থনীতি। তাই যেকোনো উন্নয়ন পরিকল্পনার আগে এই বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। অন্যথায়, আজকের এই গাঢ় সবুজ অঞ্চল একদিন বিবর্ণ হয়ে যেতে পারে, যার ক্ষতি আর কোনোভাবেই পূরণ করা সম্ভব হবে না।
আপনার মতামত জানানঃ