
রাষ্ট্র যখন শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের জন্য পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে বলে, শিক্ষার্থীরা তখন পাল্টা জানতে চাইছে—পড়াশোনার পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব কে নেবে? ফ্রান্সের চলমান ছাত্রবিক্ষোভের কেন্দ্রে এই প্রশ্ন। শিক্ষক না থাকা, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত ভিড়, জরাজীর্ণ ভবন এবং উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের অনিশ্চয়তা নিয়ে ক্ষোভ এখন সরকারের অগ্রাধিকার ও নাগরিকের কথা শোনার সক্ষমতার পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
আন্দোলনটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন হিসেবে দেখলে তার চরিত্র ভুল বোঝা হবে। বর্তমান বিক্ষোভের প্রধান অংশগ্রহণকারী লিসের শিক্ষার্থীরা—ফ্রান্সের উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের তরুণেরা। রয়টার্সের ৮ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্দোলন তৃতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে। শিক্ষকসংকট, অতিরিক্ত ভিড় ও স্কুলভবনের দুরবস্থার অভিযোগে বিভিন্ন শহরে অবরোধ ও মিছিল হয়েছে।
প্রথম আলোর রয়টার্সভিত্তিক প্রতিবেদনে বেলজিয়ামের শিক্ষার্থীরা ফ্রান্সের আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ ও প্রভাবের কথা বলেছে। দুই দেশের আন্দোলনের যোগসূত্র গুরুত্বপূর্ণ হলেও তাদের নীতিগত পটভূমি এক নয়।
শিক্ষার সমান অধিকার, অসম অভিজ্ঞতা
ফ্রান্সের বিক্ষোভের তাৎপর্য বুঝতে শিক্ষাকে সামাজিক গতিশীলতার প্রতিশ্রুতি হিসেবে দেখতে হবে। সাধারণ পরিবারের একজন তরুণের কাছে বিদ্যালয় শুধু পাঠ্যক্রম নয়; নিজের ভবিষ্যৎ বদলানোর সুযোগও। সেই সুযোগের মান যদি বাসস্থান, পারিবারিক সামর্থ্য ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের অবস্থার ওপর নির্ভর করে, তবে সমান অধিকারের প্রতিশ্রুতি প্রশ্নের মুখে পড়ে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে প্যারিসের উত্তরের অপেক্ষাকৃত দরিদ্র এলাকার শিক্ষার্থীরা তাঁদের প্রতিষ্ঠানের পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ জানিয়েছে। এই বক্তব্য দেশজুড়ে বৈষম্যের পূর্ণ পরিসংখ্যান নয়। তবে এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে: শিক্ষক ও অবকাঠামোর ঘাটতি কি সব প্রতিষ্ঠানে সমানভাবে মোকাবিলা করা হচ্ছে?
পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য থাকলে অনুপস্থিত শিক্ষকের বিকল্প হিসেবে বাড়তি সহায়তা নেওয়া সম্ভব। সেই সামর্থ্য না থাকলে হারানো পাঠের ঘাটতি জমতে থাকে। বিদ্যালয়ের অভাব তখন শিক্ষার্থীদের ওপর একই মাত্রায় পড়ে না। এ কারণেই সমস্যা শুধু শিক্ষার মোট ব্যয় নয়; কোথায় অর্থ যাচ্ছে এবং সবচেয়ে দুর্বল প্রতিষ্ঠান কতটা অগ্রাধিকার পাচ্ছে, তাও দেখতে হবে।
শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের উদ্বেগও এর সঙ্গে যুক্ত। রয়টার্স জানিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদনের জাতীয় প্ল্যাটফর্ম পারকুরসুপের সম্ভাব্য উন্নয়ন নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী কাজ করছেন। একটি ভর্তি ব্যবস্থা স্বচ্ছ ও বোধগম্য না হলে তরুণেরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিয়ন্ত্রণহীনতা অনুভব করতে পারেন। ডিজিটাল আবেদনব্যবস্থা থাকাই যথেষ্ট নয়; সিদ্ধান্তের মানদণ্ড ও সহায়তা পাওয়ার সুযোগ বোঝা প্রয়োজন।
বাজেটের সংকট আসলে অগ্রাধিকারের প্রশ্ন
সরকারের সামনে বাস্তব আর্থিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। রয়টার্স বর্তমান আন্দোলনকে সরকারি সেবায় বিনিয়োগের দাবি এবং ঋণ-ঘাটতি কমানোর চাপের মধ্যকার টানাপোড়েন হিসেবে বর্ণনা করেছে। ফলে প্রতিটি দাবি অবিলম্বে পূরণ করার প্রতিশ্রুতি বাস্তবসম্মত নাও হতে পারে।
কিন্তু আর্থিক সীমাবদ্ধতা ব্যাখ্যা করলেই রাজনৈতিক দায়িত্ব শেষ হয় না। সরকারকে দেখাতে হবে, কোন সমস্যার সমাধান আগে হবে, কেন হবে এবং তার অর্থ কোথা থেকে আসবে। শিক্ষক অনুপস্থিত থাকলে বিকল্প নিয়োগ, নিরাপত্তাহীন ভবনের জরুরি মেরামত এবং দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো উন্নয়নের প্রয়োজন এক সময়সীমার বিষয় নয়। এগুলো আলাদা করে পরিকল্পনা করা সম্ভব।
শিক্ষায় বিনিয়োগ পিছিয়ে দেওয়ার খরচও আছে। হারানো পাঠ, দক্ষতার ঘাটতি ও বাড়তে থাকা বৈষম্য ভবিষ্যতে আরও ব্যয় তৈরি করতে পারে। আজকের ব্যয় নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে আগামী দিনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির তুলনা তাই নীতিনির্ধারণের অংশ হওয়া উচিত।
এই জায়গায় আন্দোলন রাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের পরীক্ষা। শিক্ষার্থীরা শুধু বেশি অর্থ চাইছে—এমন ব্যাখ্যার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, তারা রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতি ও দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার মধ্যে দূরত্ব অনুভব করছে। সেই দূরত্ব কমাতে বাজেটের ঘোষণা নয়, প্রতিষ্ঠানের বাস্তব পরিবর্তন দরকার।
পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ কীভাবে দাবি বদলে দেয়
বিক্ষোভে সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ বা অন্যের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে প্রশাসনের ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব রয়েছে। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড আলাদা করে দেখতে হবে। সব শিক্ষার্থীকে সহিংসতার দায় দেওয়া যেমন ভুল, তেমনি আন্দোলনের নাম ব্যবহার করে ক্ষতি করার দায়ও এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
অন্যদিকে পুলিশের আচরণ আন্দোলনের নতুন কারণ হয়ে উঠতে পারে। রয়টার্সের আজকের প্রতিবেদনে শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ এবং একজন কিশোর গুরুতর আহত হওয়ার পর স্টান গ্রেনেডের ব্যবহার স্থগিতের কথা এসেছে। শিক্ষার পরিবেশের দাবি তখন প্রতিবাদে অংশ নেওয়ার নিরাপত্তার প্রশ্নের সঙ্গেও যুক্ত হয়।
এই পরিস্থিতিতে বিশেষ করে অপ্রাপ্তবয়স্কদের সুরক্ষা জরুরি। বলপ্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা, মাত্রা এবং প্রতিটি গুরুতর আঘাতের পরিস্থিতি স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করা দরকার। একই সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের মধ্যেও নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ আচরণের দায়বদ্ধতা থাকতে হবে।
শুধু অবরোধ সরিয়ে বিদ্যালয় খোলা হলে দৃশ্যমান সংকট কমতে পারে। কিন্তু যে অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের রাস্তায় এনেছে, তা অপরিবর্তিত থাকলে ক্ষোভ থেকে যায়। ফলে আইনশৃঙ্খলার প্রতিক্রিয়া এবং শিক্ষানীতির প্রতিক্রিয়া একসঙ্গে প্রয়োজন।
রাজনৈতিক মেরুকরণের মধ্যে শিক্ষার্থীর কণ্ঠ
এ ধরনের আন্দোলনে রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন, বিরোধিতা ও নির্বাচনী হিসাব যুক্ত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু কোনো দল সমর্থন দিলেই আন্দোলনের সব অভিযোগ সাজানো হয়ে যায় না। আবার শিক্ষার্থীদের সমর্থন দাবি করলেই রাজনৈতিক দল তাদের সব অভিজ্ঞতার প্রতিনিধিত্ব করে—এমনও নয়।
সরকার যদি শিক্ষার্থীদের ক্ষোভকে কেবল প্রতিপক্ষের প্ররোচনা হিসেবে দেখে, তবে নিজের ব্যবস্থাপনার ঘাটতি বোঝার সুযোগ হারাবে। বিরোধীরা যদি শুধু সরকারবিরোধী চাপ তৈরির দিকে মনোযোগ দেয়, তবে শিক্ষার নির্দিষ্ট দাবি আড়ালে চলে যেতে পারে।
এই কারণে শিক্ষার্থীদের নিজস্ব প্রতিনিধিত্ব গুরুত্বপূর্ণ। কোন দাবি বেশি জরুরি, কারা আলোচনায় অংশ নিচ্ছে এবং আন্দোলনে অংশ না নেওয়া শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতাও শোনা হচ্ছে কি না—এসব দেখতে হবে। আন্দোলনের নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক আলোচনার মধ্যে একটি বিশ্বাসযোগ্য সংযোগ প্রয়োজন।
বেলজিয়ামে ফ্রান্সের আন্দোলনের প্রভাব দেখাও তাৎপর্যপূর্ণ। প্রতিবেশী দেশের অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের দেখাতে পারে, তাঁদের সমস্যা নিয়ে সম্মিলিতভাবে কথা বলা সম্ভব। তবে এটিকে এখনই অভিন্ন ইউরোপীয় আন্দোলন বলা যাবে না। স্থানীয় শিক্ষা ব্যবস্থা, দায়িত্ব বণ্টন ও দাবির পার্থক্য রয়েছে।
আলোচনা থেকে ফলাফলে পৌঁছানোর পরীক্ষা
ফ্রান্সের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ৭ অক্টোবর থেকে লিসেগুলোতে অর্ধদিবস আলোচনার আয়োজনের কথা জানিয়েছে। পাশাপাশি ৫ থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত আগোরা প্ল্যাটফর্মে শিক্ষার্থীদের বেনামি মতামত সংগ্রহ এবং মাসের শেষে জাতীয় পর্যায়ে তার সারসংক্ষেপ প্রকাশের ঘোষণা দিয়েছে।
এটি সরাসরি শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা শোনার সুযোগ। তবে আলোচনার আয়োজন নিজেই সমাধান নয়। কোন সমস্যার জন্য কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, কত অর্থ বরাদ্দ হলো, কে বাস্তবায়ন করবে এবং কখন অগ্রগতি দেখা যাবে—তা প্রকাশ করতে হবে।
রয়টার্স অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু অক্টোবরের শেষ নাগাদ অর্থায়ন নিশ্চিত করা নির্দিষ্ট প্রতিক্রিয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে অনুপস্থিত শিক্ষকের বিকল্প ব্যবস্থা ও শিক্ষার্থীদের ভারী সময়সূচি পর্যালোচনার কথা বলেছেন। এখন এই প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর।
সরকার চাইলে সবচেয়ে জরুরি ঘাটতির তালিকা, শিক্ষক প্রতিস্থাপনের অগ্রগতি এবং মেরামতের সময়সূচি প্রকাশ করতে পারে। শিক্ষার্থীদের মতামত থেকে কোন সিদ্ধান্ত এসেছে, সেটিও জানানো দরকার। এতে পরামর্শ গ্রহণকে আনুষ্ঠানিকতার বদলে ফলপ্রসূ প্রক্রিয়ায় পরিণত করা সম্ভব।
ফ্রান্সের ছাত্রবিক্ষোভ সরকারের পতন ঘটাবে কিংবা ১৯৬৮ সালের পুনরাবৃত্তি হবে—এমন সিদ্ধান্ত এখনই টানা যায় না। আন্দোলনের স্থায়িত্ব, সংগঠন ও দাবি আলাদা। এর তাৎপর্য বুঝতে ঐতিহাসিক তুলনার চেয়ে বর্তমান অভিজ্ঞতা মনোযোগ দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
রাষ্ট্রের আস্থা ফিরে আসবে যখন শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক পাবেন, নিরাপদ পরিবেশে পড়তে পারবেন এবং ভবিষ্যতের সিদ্ধান্তগুলো বুঝতে পারবেন। বিদ্যালয়ের দরজা খোলা সেই প্রক্রিয়ার শুরু; ভেতরে শিক্ষার মান নিশ্চিত করাই সরকারের বড় পরীক্ষা।
আপনার মতামত জানানঃ