একসময় বাংলার মানুষ গল্প দেখত না, গল্প শুনত। বই থাকত কারও হাতে, কিন্তু গল্পের জগৎ তৈরি হতো গায়েনের কণ্ঠে এবং শ্রোতার কল্পনায়। তারপর ছাপাখানা এল। হাতে লেখা পুঁথি বদলে গেল মুদ্রিত বইয়ে। বইয়ের পাতায় এল কাঠখোদাই করা ছবি। পরে সেই ছবি রঙিন হলো, থিয়েটারের মঞ্চে দৃশ্যমান হলো, আর উনিশ শতকের শেষদিকে বায়োস্কোপ এসে সেই দৃশ্যকে চলমান করে দিল।
এই দীর্ঘ পরিবর্তনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে কলকাতার বটতলা। বটতলার ইতিহাস তাই শুধু সস্তা বইয়ের ইতিহাস নয়; এটি বাংলার মানুষের পড়া, শোনা, দেখা এবং কল্পনা করার পদ্ধতি বদলে যাওয়ার ইতিহাস। গল্পটির শুরু অবশ্য বটতলায় নয়—আরও অনেক আগে।
৬২৫ সালের উহুদের যুদ্ধে নিহত আমীর হামজা ইসলামের প্রথম যুগের ঐতিহাসিক চরিত্র। কিন্তু ফারসি কিসসা-কাহিনির জগতে তিনি ধীরে ধীরে অন্য এক চরিত্রে রূপ নেন। সেখানে তিনি দুর্ধর্ষ যোদ্ধা ও অভিযাত্রী; দেশ থেকে দেশে ঘোরেন, দৈত্য-দানব ও জাদুকরের সঙ্গে যুদ্ধ করেন, পরীর দেশে যান, রাজকন্যাদের বিয়ে করেন এবং নানা বাদশাহর বিরুদ্ধে অভিযান চালান। আমীর হামজার এই কিংবদন্তি চরিত্র মধ্যযুগীয় ফারসি দাস্তান-সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে। মোগল সম্রাট আকবরের আমলে ‘দাস্তান-ই-আমির হামজা’ নিয়ে বিশাল চিত্রিত পাণ্ডুলিপিও তৈরি হয়েছিল।
এই গল্পগুলো বাংলায় পৌঁছানোর অন্যতম পথ ছিল ফারসি। কিন্তু ফারসি জানতেন অল্প মানুষ। ফলে কাহিনিগুলো যখন বাংলাভাষী মুসলমান সমাজে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল, তখন সেগুলো শুধু অনুবাদ হলো না—বাংলার মৌখিক সাহিত্য ও স্থানীয় কাহিনি বলার রীতির সঙ্গে মিশে গেল। তৈরি হলো দোভাষী সাহিত্য। এর ভাষায় বাংলা বাক্যের সঙ্গে আরবি-ফারসি শব্দ এমনভাবে মিশে থাকত যে সেটি সাধারণ মানুষের কাছে আলাদা এক সাহিত্যিক স্বর তৈরি করেছিল। বাংলাপিডিয়ার মতে, এই ধারার গুরুত্বপূর্ণ প্রথম রচনাগুলোর মধ্যে গরীবুল্লাহর ‘ইউসুফ-জুলেখা’ ও ‘আমীর হামজা’ রয়েছে; পরে সৈয়দ হামজা এই ফারসিকৃত দোভাষী রীতিতে ‘আমীর হামজা’র দ্বিতীয় অংশ, ‘জৈগুনের পুঁথি’ ও ‘হাতেম তাই’ রচনা করেন।
আঠারো শতকের বাংলায় এই কাহিনিগুলো মূলত ছিল পুঁথি ও পরিবেশনার সাহিত্য। হুগলির ফকির গরীবুল্লাহ ‘আমীর হামজা’ পয়ারে রচনা করেছিলেন। কাজটি সম্পূর্ণ করার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়; পরে সৈয়দ হামজা এর দ্বিতীয় অংশ লেখেন। ১৭৯০-এর দশকে তাঁর হাতে দোভাষী পুঁথির এই ধারাটি আরও বিস্তৃত হয়।
১৭৯৭ সালের কাছাকাছি সৈয়দ হামজার ‘জৈগুনের পুঁথি’ এই ধারার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। কাহিনির নায়িকা জৈগুন কোনো নিস্তেজ রাজকন্যা নন; তিনি যুদ্ধ জানেন। যুদ্ধক্ষেত্রে মোহাম্মদ হানিফার সঙ্গে তাঁর দেখা, দ্বন্দ্বে জৈগুনের জয় এবং পরে তাদের সম্পর্ক—সব মিলিয়ে গল্পটি হয়ে ওঠে প্রেম, বীরত্ব ও রোমাঞ্চের মিশ্র আখ্যান।
কিন্তু তখনও এই গল্প ‘বই পড়ার’ বিষয় যতটা, তার চেয়ে বেশি ছিল ‘বই গাওয়ার’ বিষয়।
একজন গায়েন বা বয়াতি পুঁথি সামনে রেখে কাহিনি গাইতেন। শ্রোতাদের সবাই পড়তে জানতেন না। একজনের হাতে থাকা পুঁথি তাই একটি পুরো আসরের বই হয়ে উঠত। গায়েন নিজের কণ্ঠ, তাল, মাত্রা ও পরিবেশনের ক্ষমতা অনুযায়ী সুর বসাতেন। একই পুঁথি দুই গায়েনের মুখে দুই রকম শোনাতে পারত। মুদ্রণ আসার আগের বাংলা সাহিত্যজগতে মৌখিক পরিবেশনার এই ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
এই জায়গাতেই ইতিহাসের পরবর্তী পরিবর্তনটি ঘটে।
উনিশ শতকের শুরুতে কলকাতায় মুদ্রণযন্ত্র দ্রুত বিস্তৃত হতে থাকে। ১৮১৬ সালে গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’ মুদ্রণ করেন। বইটিতে ছয়টি ছবি ছিল বলে উল্লেখ পাওয়া যায় এবং রামচাঁদ রায়ের কাঠখোদাই করা ব্লক ব্যবহার করা হয়েছিল। এই ঘটনাকে বাংলা মুদ্রিত বইয়ে ছবির প্রাথমিক গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতিগুলোর একটি হিসেবে ধরা হয়।
এর অর্থ ছিল গভীর। এতদিন গল্পের দৃশ্য ছিল শ্রোতার মাথার ভেতর। এখন বইয়ের পাতায় সেই দৃশ্যের একটি নির্দিষ্ট রূপ তৈরি হলো।
জৈগুন দেখতে কেমন—এ প্রশ্নের উত্তর আগে প্রত্যেক শ্রোতা নিজের মতো করে দিতেন। কাঠখোদাইয়ের যুগে সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে শুরু করলেন কারিগর। তিনি কাঠে রেখা কাটলেন, সেই ব্লক কালি পেল, কাগজে চাপ পড়ল, আর একটি ছবি শত শত বা হাজার হাজার বইয়ের পাতায় একই রূপে ছড়িয়ে গেল।
এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কলকাতার উত্তরাংশে একটি নতুন বইয়ের বাজারও গড়ে উঠতে থাকে।
শোভাবাজার ও চিৎপুর অঞ্চলের আশপাশে ছোট ছোট দেশীয় প্রেস তৈরি হয়। পরে এই এলাকাই ‘বটতলা’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। ‘বটতলা’ কোনো একক ছাপাখানার নাম ছিল না; এটি ধীরে ধীরে একটি বিস্তৃত মুদ্রণকেন্দ্র ও বইয়ের বাজারের নাম হয়ে যায়। গবেষণায় বটতলাকে উনিশ শতকের কলকাতার জনপ্রিয় মুদ্রণসংস্কৃতির কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এখানে পঞ্জিকা, ধর্মীয় বই, পৌরাণিক কাহিনি, রোমাঞ্চ, প্রহসন, প্রেমের গল্প, গান, পুঁথি এবং নানা ধরনের সস্তা বই প্রকাশিত হতো।
বটতলার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার দাম।
এই বইগুলো মূলত এমন পাঠকের জন্য বাজার তৈরি করেছিল, যারা অভিজাত প্রকাশনার দাম বহন করতে পারতেন না। নিম্ন-মধ্যবিত্ত শহুরে পরিবার থেকে গ্রামাঞ্চলের পাঠক—বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ এই বই কিনতেন। ফলে বটতলার মুদ্রণসংস্কৃতি ‘উচ্চ’ ও ‘নিম্ন’ সাহিত্যের প্রচলিত বিভাজনকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল। অনিন্দিতা ঘোষের গবেষণায়ও দেখানো হয়েছে, ঔপনিবেশিক বাংলার মুদ্রণসংস্কৃতি এক সরল ‘পুরোনো মৌখিক সংস্কৃতি থেকে আধুনিক লিখিত সংস্কৃতি’তে রূপান্তরের গল্প ছিল না; বরং পুরোনো মৌখিক ও নতুন মুদ্রিত সংস্কৃতি পাশাপাশি থেকে একে অন্যকে প্রভাবিত করেছিল।
বটতলার এই বইয়ের বাজারে দোভাষী পুঁথিরও জায়গা হলো। আমীর হামজা, হাতেম তাই, ইউসুফ-জুলেখা, সোনাভান—এ ধরনের কাহিনি আর শুধু হাতে লেখা পুঁথির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকল না। মুদ্রণযন্ত্র সেগুলোকে বহু কপিতে ছড়িয়ে দিল।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটল। আগে গায়েনের কাছে পুঁথি ছিল পরিবেশনার স্ক্রিপ্ট। এখন একই পুঁথি হয়ে গেল বাজারের পণ্য। পাঠক চাইলে নিজে পড়তে পারেন, আবার গায়েনের হাতে দিয়ে শুনতেও পারেন। অর্থাৎ ছাপাখানা মৌখিক সংস্কৃতিকে মুছে দেয়নি; বরং অনেক ক্ষেত্রে সেটিকে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছিল। গবেষণাতেও বটতলার মুদ্রণকে মৌখিক সংস্কৃতির সরল প্রতিস্থাপন হিসেবে না দেখে তার সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্কের অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে।
এরপর এল ছবির দ্বিতীয় বিপ্লব। প্রথম দিকে কাঠখোদাই ছিল মূল ভরসা। বটতলার কারিগররা কাঠের ব্লকে ছবি কাটতেন। তাদের অনেকেই ধাতুর কাজ জানা পরিবার থেকে এসেছিলেন। ফলে তাদের হাতের রেখায় গয়নার নকশার মতো সূক্ষ্মতা দেখা যেত। লতাপাতা, কল্কা, সরু সমান্তরাল দাগ—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল বটতলার নিজস্ব দৃশ্যভাষা।
এই ছবিগুলো শুধু বইয়ের জন্য ছিল না। দেবদেবীর আলাদা ছাপা ছবিও বিক্রি হতো। একই কারিগর কখনো বইয়ের পাতার জন্য ছবি কাটতেন, আবার কখনো আলাদা করে বিক্রির জন্য কালী, দুর্গা, শিব বা অন্যান্য চরিত্রের ছবি তৈরি করতেন।
এখানে আবার কালীঘাটের সঙ্গে বটতলার সম্পর্ক তৈরি হয়। দক্ষিণ কলকাতার কালীঘাটে পটুয়াদের আঁকা ছবি তীর্থযাত্রীদের কাছে বিক্রি হতো। উত্তর কলকাতার বটতলায় কাঠখোদাই করে ছবি ছাপা হতো। বাজারের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুই ধারার মধ্যে যোগাযোগও বাড়ে। কালীঘাটের জনপ্রিয় দৃশ্য কাঠে নকল করে ছাপা হয়েছে, আবার সেই ছাপা ছবিতে পরে হাতে রং বসানো হয়েছে। উনিশ শতকের বাংলা শিল্পসংস্কৃতির এই দুই জনপ্রিয় ধারার সম্পর্ক তাই কেবল নান্দনিক ছিল না—এর পেছনে ছিল একটি বড় বাণিজ্যিক বাজার।
বটতলার বাজার যত বাড়তে থাকে, বইয়ের বিষয়ও তত বিস্তৃত হয়।
পঞ্জিকা হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় পণ্যগুলোর একটি। সেখানে শুধু তিথি-নক্ষত্র নয়, দৈনন্দিন জীবনের নানা তথ্যও পাওয়া যেত। পরে বিজ্ঞাপন ঢুকে পড়ে। ওষুধ, তেল, প্রসাধন, বিদেশি পণ্য—সবকিছুর বিজ্ঞাপন পঞ্জিকার পাতায় জায়গা নেয়।
অর্থাৎ বটতলার বই শুধু সাহিত্য ছিল না। এটি ছিল তথ্যের বই, বিজ্ঞাপনের বই, ধর্মের বই, বিনোদনের বই এবং কখনো কখনো সামাজিক বিতর্কের বই।
এই জনপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গে ভদ্রলোক সমাজের আপত্তিও বাড়ে। সস্তা বইকে অনেক শিক্ষিত মানুষ ‘খারাপ’ বা ‘অশ্লীল’ বলে আখ্যা দেন। বিশেষ করে নারী পাঠকদের নিয়ে উদ্বেগ ছিল। কিন্তু গবেষণায় দেখা যায়, ‘খারাপ বই’ নিয়ে এই বিতর্কের ভেতরে শ্রেণি, লিঙ্গ ও পাঠকের সামাজিক পরিচয়ের প্রশ্নও কাজ করছিল। বটতলার জনপ্রিয় সাহিত্য এমন মানুষের কাছেও পৌঁছাচ্ছিল, যাদের পাঠাভ্যাস অভিজাত সমাজের নিয়ন্ত্রণে ছিল না।
এ সময় ছাপা ছবি আরেকটি কাজ করতে শুরু করে—ঘটনাকে মানুষের চোখের সামনে স্থির করে দেওয়া।
তারকেশ্বরের এলোকেশী-নবীনচন্দ্রের ঘটনা এর একটি বিখ্যাত উদাহরণ। ১৮৭৩ সালের এই ঘটনা নিয়ে বটতলায় প্রহসন, নাটক ও ছবি প্রকাশিত হয়। একই ঘটনার ভিন্ন ভিন্ন দৃশ্য ছাপা হতে থাকে। কালীঘাটের পটুয়া ও বটতলার কাঠখোদাইকার একই সামাজিক ঘটনার আলাদা দৃশ্যমান ব্যাখ্যাও তৈরি করেছিলেন। বটতলার কাঠখোদাই তাই শুধু ধর্মীয় ছবি নয়; সমকালীন সমাজের ঘটনাও ধারণ করেছিল।
কিন্তু তখন আরেকটি প্রযুক্তি এগিয়ে আসছিল—লিথোগ্রাফি। কাঠের ব্লকে একজন কারিগর নিজের হাতে রেখা কাটতেন। লিথোগ্রাফি সেই প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও বাণিজ্যিকভাবে বিস্তৃত করার সুযোগ দিল। বিশেষ করে রঙিন মুদ্রণ জনপ্রিয় হওয়ার পর ছবির বাজার দ্রুত বদলে যায়। ১৮৭৮ সালে কলকাতা আর্ট স্টুডিও প্রতিষ্ঠার পর রঙিন জনপ্রিয় ছবির নতুন যুগ শুরু হয়। বটতলার পুরোনো কাঠখোদাইয়ের বাজার ধীরে ধীরে এই নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পড়ে।
এখানে ইতিহাসের গতি আরও দ্রুত হয়। একদিকে বটতলা বই ছাপছে, অন্যদিকে চিৎপুরে থিয়েটার তৈরি হচ্ছে। একই উত্তর কলকাতার সাংস্কৃতিক ভূগোলে ছাপাখানা ও মঞ্চ পাশাপাশি বড় হতে থাকে।
১৮৭২ সালে কলকাতায় ন্যাশনাল থিয়েটারের যাত্রা শুরু হয়। নাটক আর শুধু পড়ার বিষয় নয়—এখন মানুষ টাকা দিয়ে গিয়ে গল্প ‘দেখতে’ পারে।
এটাই ছিল পরবর্তী বড় পরিবর্তন। পুঁথির গায়েন গল্পকে কণ্ঠে দৃশ্যমান করতেন। কাঠখোদাই সেই দৃশ্যকে কাগজে স্থির করেছিল। থিয়েটার সেই দৃশ্যকে জীবন্ত অভিনেতার শরীরে ফিরিয়ে আনল।
তারপর এল সিনেমা। ১৮৯৬ সালে কলকাতায় লুমিয়েরদের চলচ্চিত্র প্রদর্শনের ঘটনা বাংলা অঞ্চলের দৃশ্যসংস্কৃতির ইতিহাসে নতুন অধ্যায় তৈরি করে। অল্প সময়ের মধ্যেই চলচ্চিত্র প্রদর্শনের প্রতি আগ্রহ বাড়ে। ১৮৯৮ সালে মানিকগঞ্জের হীরালাল সেন বাণিজ্যিকভাবে চলচ্চিত্র প্রদর্শনের উদ্যোগ নেন এবং পরে Royal Bioscope Company প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর চলচ্চিত্রের বড় অংশই ছিল মঞ্চনাটকের দৃশ্য ধারণ করা।
এখানেও আগের ইতিহাসের ছাপ স্পষ্ট। প্রথম দিকের চলচ্চিত্রে অভিনেতারা দর্শকের দিকে মুখ করে দাঁড়ান, পেছনে আঁকা মঞ্চপট থাকে, দৃশ্যটি অনেক সময় থিয়েটারের মতো স্থিরভাবে সাজানো হয়। অর্থাৎ নতুন প্রযুক্তি এলেও পুরোনো দৃশ্যভাষা একদিনে হারিয়ে যায়নি।
এমনকি ‘বায়োস্কোপ’ শব্দটিও কেবল সিনেমার সঙ্গে সীমাবদ্ধ থাকেনি। গ্রামবাংলার মেলায় যে বাক্সে চোখ রেখে ধারাবাহিক ছবি দেখা যেত, সেটিকেও বায়োস্কোপ বলা হতো। একজন প্রদর্শক ছবি দেখাতেন, সঙ্গে গল্প বা গান বলতেন। এখানে যেন বহু পুরোনো পুঁথির আসর আবার ফিরে এল—শুধু পুঁথির বদলে এবার ছবি, আর গায়েনের হাতে বইয়ের বদলে চলমান দৃশ্য।
- এই জায়গায় এসে প্রায় দেড়শ বছরের একটি যাত্রা সম্পূর্ণ হয়।
- প্রথমে ছিল কাহিনি—কণ্ঠে।
- তারপর সেই কাহিনি লেখা হলো পুঁথিতে।
- তারপর পুঁথি ছাপা হলো।
- ছাপা বইয়ে কাঠখোদাই করা ছবি এল।
- ছবি রঙিন হলো।
- থিয়েটারে কাহিনি জীবন্ত হলো।
- আর শেষে বায়োস্কোপ সেই দৃশ্যকে চলমান করে দিল।
- এই পরিবর্তনের প্রতিটি ধাপে দর্শক বা পাঠকের কল্পনার জায়গাটিও একটু একটু করে বদলেছে।
পুঁথির যুগে আমীর হামজা বা জৈগুনের চেহারা ছিল প্রত্যেক শ্রোতার নিজের কল্পনায়। কাঠখোদাইয়ের যুগে কারিগর সেই কল্পনার একটি সম্ভাব্য চেহারা নির্ধারণ করলেন। রঙিন ছাপ সেটিকে আরও স্পষ্ট করল। থিয়েটার অভিনেতাকে সেই চরিত্রের শরীর দিল। আর সিনেমা সেই শরীরকে চলমান করে দিল।
তবু আগের কোনো মাধ্যম পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। বটতলার ছাপা পুঁথি বহুদিন গায়েনের হাতে গাওয়া হয়েছে। থিয়েটার জনপ্রিয় হওয়ার পরও পুঁথি বিক্রি হয়েছে। সিনেমা আসার পরও বায়োস্কোপের বাক্স মেলায় ঘুরেছে। অর্থাৎ বাংলার জনপ্রিয় সংস্কৃতির ইতিহাস সরলভাবে এক মাধ্যমকে অন্য মাধ্যম দিয়ে প্রতিস্থাপনের ইতিহাস নয়। বরং পুরোনো মাধ্যম নতুন মাধ্যমের সঙ্গে মিশে নতুন রূপ তৈরি করেছে। আধুনিক গবেষণাও বাংলার প্রিন্ট সংস্কৃতিকে এই বহুমাত্রিক ধারাবাহিকতার মধ্যেই দেখতে বলছে।
হীরালাল সেনের তৈরি বহু চলচ্চিত্র আজ আর নেই। ১৯১৭ সালের অগ্নিকাণ্ডে তাঁর সংরক্ষিত চলচ্চিত্রের বড় অংশ নষ্ট হয়ে যায়। বটতলার ক্ষেত্রেও একই ধরনের ক্ষতি হয়েছে। উনিশ শতকের বিপুল কাঠখোদাইয়ের খুব সামান্য অংশ আজ টিকে আছে। ফলে আজ আমরা যে কয়েকটি পুরোনো বটতলা-ছাপ দেখি, সেগুলো আসলে একসময়কার বিশাল দৃশ্যসংস্কৃতির ক্ষুদ্র অবশিষ্টাংশ।
কিন্তু হারিয়ে যাওয়া ছবির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো যে সাংস্কৃতিক পরিবর্তনটি তারা ঘটিয়েছিল।
বটতলা বাংলার বইকে অভিজাত ঘর থেকে বের করে বাজারে নিয়ে গিয়েছিল। পুঁথির কাহিনিকে বহু মানুষের হাতে পৌঁছে দিয়েছিল। ছবিকে বইয়ের অংশ বানিয়েছিল। ধর্মীয় গল্পের পাশাপাশি সমকালীন সমাজ, প্রেম, অপরাধ, কৌতুক, নাটক ও রাজনীতির ঘটনাকেও জনপ্রিয় মুদ্রিত দৃশ্যে পরিণত করেছিল।
আর সেই পথ ধরেই বাংলা সমাজ ধীরে ধীরে এমন এক পৃথিবীতে ঢুকেছিল, যেখানে গল্প শুধু শোনা হয় না—পড়া যায়, দেখা যায়, ছাপা যায়, মঞ্চে অভিনীত হয় এবং শেষ পর্যন্ত পর্দায় চলতেও দেখা যায়।
আমীর হামজার কাহিনি একসময় কোনো গায়েনের কণ্ঠে শুনে একজন শ্রোতা নিজের মতো করে কল্পনা করতেন। কয়েক দশক পরে সেই কাহিনির একটি ছবি বইয়ের পাতায় ছাপা হলো। আরও পরে অন্য গল্পের চরিত্র কাঠের ব্লক থেকে রঙিন ছবিতে এল। তারপর নাট্যমঞ্চে অভিনেতা তাদের শরীর পেলেন। উনিশ শতকের শেষে বায়োস্কোপ এসে সেই শরীরকে নড়াচড়া করাল।
সুতরাং বটতলার ইতিহাস আসলে একটি ছাপাখানার ইতিহাস নয়। এটি বাংলার কল্পনার প্রযুক্তিগত ইতিহাস।
একসময় গল্পের ছবি ছিল মানুষের মাথার ভেতর। তারপর তা উঠল কাঠের ব্লকে। সেখান থেকে কাগজে। কাগজ থেকে রঙে। রঙ থেকে মঞ্চে। আর মঞ্চ থেকে পর্দায়।
পুঁথির গায়েনের কণ্ঠ থেকে বায়োস্কোপের আলো পর্যন্ত—বাংলার এই দীর্ঘ যাত্রায় বদলেছে প্রযুক্তি, বদলেছে বইয়ের বাজার, বদলেছে পাঠক ও দর্শক। কিন্তু একটি জিনিস বদলায়নি: মানুষ গল্প শুনতে, দেখতে এবং নিজের পৃথিবীর বাইরে আরেকটি পৃথিবী কল্পনা করতে চেয়েছে।
বটতলা সেই চাওয়াটাকেই ছাপার অক্ষর, কাঠের রেখা এবং শেষ পর্যন্ত চলমান ছবির ভাষা দিয়েছিল।
আপনার মতামত জানানঃ