
মহেশখালীর গভীর সমুদ্রে নোঙর করা একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগল। ক্ষতিগ্রস্ত হলো বয়লার পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত বৈদ্যুতিক কেবল। টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেল। কিছুদিনের মধ্যেই শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ নেমে এলো, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হলো, সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ সারি তৈরি হলো এবং বহু কারখানার উৎপাদন অর্ধেকে নেমে গেল কিংবা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল।
ঘটনাটি প্রশ্ন তুলেছে—মাত্র একটি টার্মিনালের দুর্ঘটনায় কেন প্রায় পুরো দেশের শিল্পব্যবস্থা এতটা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে?
এর সহজ উত্তর হলো, বাংলাদেশ শুধু গ্যাসসংকটে নেই; দেশটি এমন একটি জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে যেখানে বড় কোনো যন্ত্র, টার্মিনাল বা সরবরাহপথ বিকল হলে তার বিকল্প ব্যবস্থা প্রায় নেই। স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন কমছে, আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে, অথচ সেই এলএনজি দেশে আনার কার্যকর প্রবেশপথ মাত্র দুটি। দুটিই একই এলাকা—মহেশখালীতে। ফলে একটি টার্মিনাল বন্ধ হওয়া নিছক একটি শিল্প দুর্ঘটনা নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতির একটি বড় সরবরাহপথ বন্ধ হয়ে যাওয়া।
২১ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান টার্মিনালে আগুনের পর প্রায় দুই সপ্তাহ এলএনজি পুনর্গ্যাসীকরণ বন্ধ ছিল। টার্মিনালটি স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক প্রায় ৫০০ থেকে ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে দিতে পারে। ৫ আগস্ট একটি ইউনিট আংশিক চালু করে প্রথমে প্রায় ১১৫ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ পুনরুদ্ধার করা হয়। কিন্তু পূর্ণ সক্ষমতা ফিরে না আসায় ঘাটতির বড় অংশ থেকেই যায়। Reuters
বাংলাদেশের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা আনুমানিক ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়েও সরবরাহ সেই চাহিদার তুলনায় এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি কম থাকে। অর্থাৎ দুর্ঘটনার আগেই গ্যাসব্যবস্থায় কোনো উদ্বৃত্ত সক্ষমতা ছিল না। সংকটের মধ্যে একটি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে আরও ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ হারানো মানে আগে থেকেই রেশনিংয়ের মধ্যে থাকা ব্যবস্থার ওপর নতুন আঘাত।
পেট্রোবাংলার ৯ আগস্ট সকাল থেকে ১০ আগস্ট সকাল পর্যন্ত হিসাবে স্থানীয় ও আমদানি করা এলএনজি মিলিয়ে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ ছিল প্রায় ২ হাজার ৩৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট। চাহিদার তুলনায় এটি প্রায় দেড় হাজার মিলিয়ন ঘনফুট কম। পেট্রোবাংলা
এই ঘাটতি শুধু সংখ্যার বিষয় নয়। কোন খাতে কত গ্যাস দেওয়া হবে, সেটি তখন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে পরিণত হয়। বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস দিলে শিল্পে চাপ কমে। শিল্পে সরবরাহ বাড়ালে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হয়। বাসাবাড়ি ও সিএনজি স্টেশনে সরবরাহ ধরে রাখলে সার কারখানা বা ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখতে হয়। এক গ্রাহককে গ্যাস দেওয়ার অর্থ প্রায়ই আরেক গ্রাহকের সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া।
আমদানিনির্ভরতার সংকীর্ণ দরজা
এলএনজি বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরাসরি পাইপলাইনে ঢোকানো যায় না। উৎপাদনকারী দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসকে অত্যন্ত কম তাপমাত্রায় তরল করা হয়, বিশেষায়িত জাহাজে করে আমদানিকারক দেশে আনা হয় এবং সেখানে আবার গ্যাসে রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে পাঠানো হয়। এই শেষ প্রক্রিয়াটিই পুনর্গ্যাসীকরণ।
বাংলাদেশে এই কাজ করে দুটি ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট বা এফএসআরইউ। দুটির সম্মিলিত ঘোষিত সক্ষমতা দৈনিক প্রায় ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। স্বাভাবিক অবস্থায় এগুলো থেকে প্রায় এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যায়। অর্থাৎ দেশের মোট গ্যাস সরবরাহের এক-তৃতীয়াংশের কাছাকাছি এখন এই দুটি ভাসমান স্থাপনার ওপর নির্ভরশীল।
সমস্যা হলো, দুই টার্মিনালই একই ভৌগোলিক এলাকায় এবং একই ধরনের সামুদ্রিক ও পাইপলাইন অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত। ঘূর্ণিঝড়, উত্তাল সমুদ্র, মুরিং ক্ষতি, জাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ, অগ্নিকাণ্ড কিংবা সাবসি পাইপলাইনের ত্রুটি—যেকোনো একটি কারণে সরবরাহ দ্রুত কমে যেতে পারে।
এটি নতুন অভিজ্ঞতাও নয়। ২০২৩ সালে ঘূর্ণিঝড় মোখার সময় দুটি টার্মিনাল বন্ধ রাখায় দেশে বড় ধরনের বিদ্যুৎ ও গ্যাসসংকট তৈরি হয়েছিল। ২০২৪ সালেও রক্ষণাবেক্ষণ ও কারিগরি ত্রুটির কারণে এলএনজি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়। চট্টগ্রাম অঞ্চল বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, কারণ ওই অঞ্চলের বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার কারখানা ও শিল্পের বড় অংশ পুনর্গ্যাসীকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরশীল।
বারবার একই ধরনের ঘটনা ঘটলেও পর্যাপ্ত বিকল্প সরবরাহপথ, স্থলভিত্তিক টার্মিনাল বা কার্যকর জরুরি পরিকল্পনা গড়ে ওঠেনি। ফলে এক টার্মিনাল বন্ধ হলে অন্যটি শুধু নিজের সক্ষমতার মধ্যে সরবরাহ করতে পারে; বন্ধ টার্মিনালের পুরো ঘাটতি পূরণ করার অব্যবহৃত সক্ষমতা তার নেই।
জ্বালানি নিরাপত্তায় এটিকে ‘সিঙ্গেল পয়েন্ট অব ফেইলিওর’ বলা হয়—এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বা সংযোগ, যেটি বিকল হলে পুরো ব্যবস্থার বড় অংশ অকার্যকর হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের এলএনজি ব্যবস্থায় একটি নয়, এমন একাধিক ঝুঁকি একই জায়গায় কেন্দ্রীভূত হয়েছে।
কেন শিল্পে আঘাত এত দ্রুত আসে
বাংলাদেশের টেক্সটাইল, স্পিনিং, ডাইং, সিরামিক, কাচ, ইস্পাত, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সার শিল্প সরাসরি গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। কোথাও গ্যাস কাঁচামাল, কোথাও চুল্লির জ্বালানি, আবার কোথাও কারখানার নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান উৎস।
টেক্সটাইল কারখানাগুলোর বড় অংশ ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্র ব্যবহার করে। জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সরবরাহ অনিরবচ্ছিন্ন না হওয়ায় তারা গ্যাস পুড়িয়ে নিজেরাই বিদ্যুৎ তৈরি করে। একই গ্যাস দিয়ে বয়লার চালানো, সুতা উৎপাদন, কাপড় রং করা ও ফিনিশিংয়ের কাজ হয়। ফলে গ্যাসের চাপ কমলে শুধু একটি মেশিন বন্ধ হয় না; পুরো উৎপাদনশৃঙ্খল থেমে যায়।
অনেক কারখানায় স্বাভাবিক উৎপাদনের জন্য প্রায় ৮ পিএসআই চাপ প্রয়োজন হলেও সংকটের সময় তা ২ থেকে ৩ পিএসআইয়ে নেমে যাওয়ার অভিযোগ এসেছে। কম চাপে যন্ত্র চালালে উৎপাদনের গুণগত মান নষ্ট হয়, কাঁচামাল অপচয় হয় এবং যন্ত্রপাতিরও ক্ষতি হতে পারে। তাই অনেক মালিক কম সক্ষমতায় চালানোর বদলে ইউনিট বন্ধ রাখতে বাধ্য হন।
সিরামিক ও কাচ শিল্পের সংকট আরও কঠিন। তাদের চুল্লি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় দীর্ঘ সময় সচল রাখতে হয়। হঠাৎ গ্যাসের চাপ কমে গেলে আধা-তৈরি পণ্য নষ্ট হয় এবং চুল্লি পুনরায় চালু করতে বাড়তি সময় ও অর্থ লাগে। বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের হিসাবে, সাম্প্রতিক সংকটে তাদের ৭০ সদস্য কারখানার মধ্যে অন্তত ২৫টি উৎপাদন স্থগিত করেছিল। The Business Standard
একইভাবে সার কারখানায় গ্যাস কেবল জ্বালানি নয়, ইউরিয়া উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল। গ্যাস কম থাকলে সরকার প্রায়ই সার কারখানা বন্ধ রেখে বিদ্যুৎকেন্দ্র বা অন্য গ্রাহকদের সরবরাহ দেয়। তখন দেশে উৎপাদন কমে এবং বেশি দামে বিদেশ থেকে সার আমদানির প্রয়োজন হয়। এর ব্যয় শেষ পর্যন্ত সরকারি ভর্তুকি, কৃষি উৎপাদন এবং খাদ্যমূল্যের ওপর পড়ে।
ডিজেল জেনারেটর দিয়ে সাময়িকভাবে বিদ্যুতের ঘাটতি সামাল দেওয়া গেলেও গ্যাসনির্ভর উৎপাদন প্রক্রিয়ার বিকল্প হিসেবে ডিজেল সব ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায় না। যেখানে সম্ভব, সেখানেও ডিজেলের বিদ্যুৎ গ্যাসভিত্তিক ক্যাপটিভ বিদ্যুতের চেয়ে অনেক ব্যয়বহুল। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ে, কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রেতার সঙ্গে আগে নির্ধারিত দামে পণ্য সরবরাহ করতে হয়।
কারখানা সময়মতো পণ্য তৈরি করতে না পারলে ক্রেতা মূল্যছাড় দাবি করতে পারে, আকাশপথে পণ্য পাঠাতে হতে পারে অথবা অর্ডার বাতিল হতে পারে। একবার ক্রেতা বাংলাদেশ থেকে অর্ডার সরিয়ে প্রতিযোগী দেশে নিয়ে গেলে তাকে ফিরিয়ে আনা কঠিন। ফলে কয়েক সপ্তাহের গ্যাসসংকটের ক্ষতি কয়েক মাস কিংবা কয়েক বছর স্থায়ী হতে পারে।
মূল সমস্যা দুর্ঘটনা নয়
টার্মিনালের আগুন তাৎক্ষণিক সংকটের কারণ। কিন্তু জাতীয় শিল্পব্যবস্থা থমকে যাওয়ার মূল কারণ আরও গভীরে।
একসময় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির বড় সুবিধা ছিল সস্তা দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাস। বিদ্যুৎ, সার, টেক্সটাইল, সিরামিক ও অন্যান্য শিল্প সেই সুবিধার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। কিন্তু নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উৎপাদনে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। পুরোনো ক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন স্বাভাবিকভাবেই কমেছে, অথচ চাহিদা বেড়েছে।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে পেট্রোবাংলার তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত হিসাবে, রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোর স্থানীয় ক্ষেত্র থেকে উৎপাদন চার বছরে দৈনিক ৮৪৯ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে ৭০৯ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে। একই সময়ে নতুন ও সংস্কার করা কূপ থেকে কিছু গ্যাস যোগ হলেও পুরোনো কূপের পতন পূরণ করা যায়নি। The Financial Express
সামগ্রিক স্থানীয় উৎপাদনও দীর্ঘদিন ধরে নিম্নমুখী। ২০১৭ সালে দেশীয় ক্ষেত্রগুলো থেকে দৈনিক প্রায় ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেত। বর্তমানে তা প্রায় ১ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট বা তারও নিচে নেমে এসেছে। অর্থাৎ শিল্পের চাহিদা বাড়লেও নিজস্ব সস্তা জ্বালানির ভিত্তি ক্রমেই সংকুচিত হয়েছে।
এই পতন মোকাবিলায় দ্রুত এলএনজি আমদানির দিকে যাওয়া হয়েছিল। ২০১৮ সালে প্রথম ভাসমান টার্মিনাল চালুর পর আমদানি করা গ্যাস জাতীয় গ্রিডে বড় ভূমিকা রাখতে শুরু করে। কিন্তু এলএনজিকে দেশীয় গ্যাসের সমান নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী বিকল্প ধরে নেওয়াই ছিল নীতিগত ভুল।
আমদানি করা এলএনজির দাম বিশ্ববাজারের ওপর নির্ভরশীল। জাহাজ ভাড়া, ডলার বিনিময় হার, পুনর্গ্যাসীকরণ ব্যয় এবং টার্মিনালের নির্ধারিত চার্জও এর সঙ্গে যুক্ত হয়। বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে গেলে সরকারকে হয় বিপুল ভর্তুকি দিতে হয়, নয়তো আমদানি কমাতে হয়।
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত এই দুর্বলতা আরও স্পষ্ট করেছে। কাতার বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এলএনজি সরবরাহকারী। ২০২৫ সালে বাংলাদেশের প্রায় ৭০ লাখ টন এলএনজি আমদানির মধ্যে প্রায় ৪১ লাখ ৫০ হাজার টন এসেছিল কাতার থেকে। কিন্তু সংঘাত ও সরবরাহ বিঘ্নের কারণে কাতার এ বছরের নির্ধারিত চালান কমিয়েছে। Reuters
দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির চালান কমলে বাংলাদেশকে স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস কিনতে হয়। মার্চে কিছু স্পট চালানের দাম প্রতি এমএমবিটিইউ ২৩ থেকে ২৮ ডলারের বেশি হয়েছিল, যা জানুয়ারির প্রায় ১০ ডলারের দ্বিগুণেরও বেশি। Reuters
অর্থাৎ এলএনজি ব্যবস্থার ঝুঁকি দুই দিক থেকে আসে। টার্মিনাল সচল থাকলেও জাহাজ বা গ্যাস কেনার অর্থ না থাকলে সরবরাহ পাওয়া যাবে না। আবার গ্যাস কেনা থাকলেও টার্মিনাল, মুরিং বা পাইপলাইনে সমস্যা হলে তা গ্রিডে পৌঁছাবে না। বাংলাদেশের বর্তমান নীতিতে আমদানির সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু মূল্যঝুঁকি ও অবকাঠামোগত বিকল্প সমানভাবে তৈরি করা হয়নি।
নতুন টার্মিনালই কি সমাধান?
সাম্প্রতিক দুর্ঘটনার পর আরও একটি এফএসআরইউ স্থাপনের উদ্যোগ দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। নতুন টার্মিনাল কিছু বাড়তি পুনর্গ্যাসীকরণ সক্ষমতা ও সীমিত বিকল্প অবশ্যই তৈরি করতে পারে। কিন্তু নতুন টার্মিনালও যদি একই মহেশখালী এলাকায়, একই ধরনের সামুদ্রিক ঝুঁকি এবং একই আমদানিনির্ভর ব্যবস্থার মধ্যে থাকে, তাহলে মৌলিক দুর্বলতা পুরোপুরি দূর হবে না।
টার্মিনালের সংখ্যা তিনটি হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম নাগালের বাইরে গেলে সেগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হবে না। পাইপলাইন পর্যাপ্ত না হলে বাড়তি গ্যাস শিল্পাঞ্চলে পৌঁছাবে না। আর স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন কমতে থাকলে নতুন আমদানি শুধু পুরোনো উৎপাদনের পতন পূরণ করতেই ব্যয় হবে।
প্রথম প্রয়োজন হলো গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোর জন্য বাধ্যতামূলক বিকল্প ও জরুরি ব্যবস্থা। দুটি টার্মিনালের রক্ষণাবেক্ষণ একই সময়ে না করা, জরুরি যন্ত্রাংশ দেশে মজুত রাখা, সাবসি পাইপলাইন ও মুরিংয়ের বিকল্প তৈরি করা এবং দুর্ঘটনার পর কোন খাতে কীভাবে গ্যাস রেশনিং হবে—তার প্রকাশ্য পরিকল্পনা থাকা দরকার।
সাম্প্রতিক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত বৈদ্যুতিক কেবল ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে এনে মেরামত করতে হয়েছে। ছোট একটি যন্ত্রাংশের জন্য যদি জাতীয় সরবরাহব্যবস্থা কয়েক সপ্তাহ অপেক্ষা করে, তাহলে তা শুধু কারিগরি সমস্যা নয়; এটি রক্ষণাবেক্ষণ ও জরুরি প্রস্তুতির ব্যর্থতা।
দ্বিতীয়ত, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানকে ঘোষণার বাইরে বাস্তব অগ্রাধিকারে নিতে হবে। স্থলভাগে নতুন কূপ খনন, পুরোনো কূপের সংস্কার এবং সাগরে অনুসন্ধানে দীর্ঘসূত্রতা কমানো প্রয়োজন। সব কূপে গ্যাস পাওয়া যাবে না, কিন্তু অনুসন্ধান না করলে নতুন মজুত আবিষ্কারের সম্ভাবনাও নেই।
ভোলাসহ দেশের কিছু এলাকায় গ্যাস থাকলেও জাতীয় সঞ্চালন লাইনের অভাবে তা বড় বাজারে পৌঁছানো যাচ্ছে না। নতুন উৎস আবিষ্কারের পাশাপাশি সেই গ্যাস পরিবহনের অবকাঠামোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয়ত, সব ধরনের শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনকে একই জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল রাখার নীতি বদলাতে হবে। সৌরবিদ্যুৎ গ্যাসের পুরো বিকল্প নয়, বিশেষ করে শিল্পের উচ্চতাপ উৎপাদনে। কিন্তু কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ, দক্ষ মোটর ও বয়লার, বর্জ্যতাপ পুনর্ব্যবহার এবং উন্নত গ্রিড সরবরাহ ক্যাপটিভ গ্যাসের চাহিদা কিছুটা কমাতে পারে।
চতুর্থত, কোন খাতে সীমিত গ্যাস দিলে অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি মূল্য সংযোজন ও কর্মসংস্থান রক্ষা করা সম্ভব, তার ভিত্তিতে সরবরাহের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাব, বকেয়া বিল বা অপরিকল্পিত সংযোগের ভিত্তিতে গ্যাস বিতরণ করলে সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার সম্ভব নয়।
অবৈধ সংযোগ ও পাইপলাইনের অপচয় বন্ধ করাও জরুরি। তবে শুধু আবাসিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন বা চুরি বন্ধ করে বর্তমান বিশাল ঘাটতি পূরণ করা যাবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। ঘাটতির আকার এত বড় যে উৎপাদন, আমদানি, পরিবহন, দক্ষ ব্যবহার ও জ্বালানি বৈচিত্র্য—সব ক্ষেত্রেই একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
মহেশখালীর দুর্ঘটনা তাই একটি সতর্কবার্তা। দেশের শিল্প একটি টার্মিনালের কারণে থেমে যায়নি; থেমেছে কারণ জ্বালানি ব্যবস্থায় আগে থেকেই কোনো নিরাপদ ব্যবধান ছিল না। চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ঘাটতি, স্থানীয় উৎপাদনের পতন, মাত্র দুটি আমদানি টার্মিনাল, একই স্থানে অবকাঠামোর কেন্দ্রীকরণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরতা—সব দুর্বলতা একটি দুর্ঘটনায় একসঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে।
কারখানার মালিককে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে, শ্রমিকের কর্মঘণ্টা কমছে, রপ্তানি আদেশ ঝুঁকিতে পড়ছে, সরকারকে বেশি দামে সার ও জ্বালানি কিনতে হচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তাকে বাড়তি মূল্য দিতে হচ্ছে। টার্মিনালের আগুন নিভে গেলেও এই অর্থনৈতিক ক্ষতি সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয় না।
প্রকৃত প্রশ্ন তাই টার্মিনালটি কবে পুরোপুরি চালু হবে, শুধু সেটি নয়। প্রশ্ন হলো—পরবর্তী দুর্ঘটনা, ঘূর্ণিঝড়, বৈশ্বিক যুদ্ধ কিংবা এলএনজির মূল্যবৃদ্ধির সময় বাংলাদেশের হাতে বিকল্প কী থাকবে?
সেই বিকল্প তৈরি না হলে নতুন টার্মিনাল সাময়িকভাবে সরবরাহ বাড়াবে, কিন্তু জ্বালানি নিরাপত্তা দেবে না। আর একটি দেশের শিল্প যদি একটি কেবল, একটি জাহাজ বা একটি ভাসমান টার্মিনালের ওপর নির্ভর করে থাকে, তাহলে সংকটটি দুর্ঘটনায় নয়—সংকটটি পুরো পরিকল্পনার মধ্যেই।
আপনার মতামত জানানঃ