দেশের অন্যতম বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে চলা বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। হাইকোর্টে দাখিল করা একটি তদন্ত প্রতিবেদনে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেএমসি বিল্ডার্সের মাধ্যমে ব্যাংকের শেয়ার নিয়ন্ত্রণ এবং এস আলম গ্রুপের স্বার্থ রক্ষার প্রক্রিয়ায় তিনি ভূমিকা পালন করেছিলেন। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর রাজনৈতিক অঙ্গন, আর্থিক খাত এবং আইনজীবী মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারসংক্রান্ত মামলার শুনানি হাইকোর্টে চলমান রয়েছে। মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার এম. আব্দুল কাইয়ুম জানিয়েছেন, আগামী বুধবার মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য রয়েছে। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে এবং তদন্ত প্রতিবেদনের বিভিন্ন তথ্য আদালতের বিবেচনায় রয়েছে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৭ সালে সরকারের প্রত্যক্ষ সমর্থনে এস আলম গ্রুপ ব্যাংক কোম্পানি আইনের একাধিক বিধান লঙ্ঘন করে ইসলামী ব্যাংকের প্রায় ৮২ শতাংশ শেয়ারের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। অভিযোগ অনুযায়ী, এ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শেয়ার কেনাবেচা এবং পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেই সময় জেএমসি বিল্ডার্সের প্রতিনিধি হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিনকে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে তিনি ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের আগে তিনি ওই পদ থেকে সরে দাঁড়ান।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকের শেয়ার অধিগ্রহণের পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল সুপরিকল্পিত। এতে ব্যাংকের মালিকানা কাঠামো পরিবর্তনের পাশাপাশি পরিচালনা পর্ষদে প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়। তদন্তে দাবি করা হয়েছে, জেএমসি বিল্ডার্সসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শেয়ার ক্রয়ের ক্ষেত্রে অর্থের উৎস, লেনদেনের ধরন এবং মালিকানা পরিবর্তনের পদ্ধতিতে অসংগতি পাওয়া গেছে।
২০২৫ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার কেলেঙ্কারি নিয়ে নতুন করে তদন্তের নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট। আদালতের নির্দেশ অনুসারে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ) তদন্ত শুরু করে। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ৪২ পৃষ্ঠার একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া হয়। প্রতিবেদনে ব্যাংকের শেয়ার জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ, পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনিয়ম এবং এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেএমসি বিল্ডার্স ব্যাংক থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ বের করে সেই অর্থ দিয়েই পুনরায় ব্যাংকের শেয়ার ক্রয় করে। অর্থাৎ যে অর্থ ব্যাংক থেকেই বের করা হয়েছিল, সেই অর্থ ব্যবহার করেই ব্যাংকের মালিকানা বৃদ্ধির চেষ্টা চালানো হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তদন্তে আরও বলা হয়েছে, এ ধরনের লেনদেন ব্যাংকিং নীতিমালা ও করপোরেট সুশাসনের পরিপন্থী।
অভিযোগ রয়েছে, পরিচালনা পর্ষদে অবস্থান করে এস আলম গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়। এসব ঋণের বড় একটি অংশ যথাযথ জামানত ছাড়াই অথবা প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই ছাড়া অনুমোদিত হয়েছিল বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে ব্যাংকের তারল্য সংকট তৈরি হয় এবং আমানতকারীদের স্বার্থও ঝুঁকির মুখে পড়ে।
তদন্তে আরও দাবি করা হয়েছে, ঋণ বিতরণ, শেয়ার হস্তান্তর এবং পরিচালনা পর্ষদের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। এর প্রভাব পড়ে ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ সক্ষমতা এবং গ্রাহকদের আস্থার ওপর। যদিও পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের বিভিন্ন পদক্ষেপে ব্যাংকের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হয়।
এ বিষয়ে চারটি স্বাধীন নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন তদন্তের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব নিরীক্ষায় বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম, শেয়ার হস্তান্তরের অসঙ্গতি এবং পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পরে এসব নিরীক্ষা প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই করে লন্ডনভিত্তিক ফরেনসিক প্রতিষ্ঠান ‘দ্য লয়েড’ অনুমোদন দিয়েছে বলেও তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
ব্যারিস্টার এম. আব্দুল কাইয়ুম বলেন, ইসলামী ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ, বিশ্বাসভঙ্গ এবং জালিয়াতির অভিযোগে ২০২৫ সালে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনসহ ২১ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। আদালত সেই মামলার তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর মতে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে দায়িত্ব পালন করা কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ওঠা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং এর সুষ্ঠু বিচার হওয়া প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে মামলাটি বিচারাধীন থাকায় আদালতের সিদ্ধান্তই হবে চূড়ান্ত। তবে তদন্ত প্রতিবেদনে যেসব তথ্য উঠে এসেছে, সেগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ দেশের বৃহত্তম ব্যাংকগুলোর একটির আর্থিক স্থিতিশীলতা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের বিষয় নয়; এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং ব্যাংকিং খাতের প্রতি জনগণের আস্থার সঙ্গে জড়িত।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তনের পর থেকে ব্যাংকটির কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে বড় অঙ্কের ঋণ অনুমোদন, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, করপোরেট সুশাসনের দুর্বলতা এবং পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা বিতর্ক সৃষ্টি হয়। এসব ঘটনার কারণে ব্যাংকটির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মনে করেন অনেক অর্থনীতিবিদ।
অর্থনীতিবিদদের একটি অংশের মতে, ব্যাংকিং খাতের সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে শুধু দায়ীদের আইনের আওতায় আনাই যথেষ্ট নয়; একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম প্রতিরোধে কার্যকর সংস্কার প্রয়োজন। অন্যথায় বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো একই ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের আর্থিক খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। দেশের লাখ লাখ গ্রাহক, হাজারো উদ্যোক্তা এবং অসংখ্য ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন এ ব্যাংকের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে ব্যাংকটির পরিচালনা ও মালিকানা নিয়ে যেকোনো বিতর্ক জাতীয় অর্থনীতির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
তদন্ত প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে এখন পর্যন্ত আদালতের কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি এবং মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে। আইন অনুযায়ী আদালতের রায় না হওয়া পর্যন্ত সবাই নির্দোষ হিসেবে বিবেচিত হন। ফলে তদন্ত প্রতিবেদনে যেসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো বর্তমানে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচ্য।
আগামী বুধবার হাইকোর্টে মামলার পরবর্তী শুনানিতে তদন্ত প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আরও আলোচনা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। আদালতের নির্দেশনা, তদন্ত সংস্থার উপস্থাপিত তথ্য এবং উভয় পক্ষের যুক্তি-তর্কের ভিত্তিতেই মামলার পরবর্তী অগ্রগতি নির্ধারিত হবে।
দেশের ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে এই মামলাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, আদালতের চূড়ান্ত রায় শুধু একটি ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নয়, বরং দেশের আর্থিক খাতের নীতি, করপোরেট প্রশাসন এবং আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দৃষ্টি এখন হাইকোর্টের চলমান বিচারিক প্রক্রিয়া এবং তদন্তের পরবর্তী অগ্রগতির দিকে।
আপনার মতামত জানানঃ