যুদ্ধবিরতির ঘোষণা সাধারণত একটি সংঘাতের শেষের আশা জাগায়। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় যুদ্ধবিরতির পরও উত্তেজনা পুরোপুরি থামে না। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ আবারও সেই বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কয়েক সপ্তাহ আগে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি অঞ্চলটিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে বলে আন্তর্জাতিক মহল আশাবাদী ছিল। কিন্তু হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় সেই আশায় বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। উভয় দেশই একে অপরকে চুক্তি ভঙ্গের জন্য দায়ী করছে এবং নিজেদের সামরিক পদক্ষেপকে আত্মরক্ষার অধিকার হিসেবে তুলে ধরছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে আবারও অনিশ্চয়তার ছায়া ঘনিয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, উপসাগরে একটি তেলবাহী ট্যাংকারে ইরানের ড্রোন হামলার জবাবে তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সংরক্ষণাগার এবং উপকূলীয় রাডার স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে শক্তিশালী হামলা চালিয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি, আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যৎ হামলার সক্ষমতা কমিয়ে আনাই ছিল এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য। মার্কিন প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, এই হামলা কোনো নতুন যুদ্ধ শুরু করার জন্য নয়; বরং বিদ্যমান যুদ্ধবিরতির শর্ত রক্ষার একটি প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বিবৃতিতে বলেন, ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল এবং যুক্তরাষ্ট্র সেই চুক্তি মেনে চলেছে। তাঁর ভাষায়, চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে কোনো আপত্তি থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত ছিল। কিন্তু হামলার পথ বেছে নেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রও জবাব দিতে বাধ্য হয়েছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, সহিংসতার জবাব সহিংসতার মাধ্যমেই দেওয়া হবে। এই বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থানকে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরে, যেখানে কূটনীতির পাশাপাশি সামরিক প্রতিক্রিয়াকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে। তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রই প্রথম যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। তারা বলেছে, ওয়াশিংটন তার পূর্বের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে ইরানের সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন বাহিনী মোতায়েন থাকা বিভিন্ন সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে পাল্টা আঘাত হেনেছে। আইআরজিসি আরও সতর্ক করে জানিয়েছে, ভবিষ্যতে যদি একই ধরনের আগ্রাসনের পুনরাবৃত্তি ঘটে, তাহলে ইরানের প্রতিক্রিয়া হবে আরও ব্যাপক, আরও কঠোর এবং আরও শক্তিশালী।
ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির প্রধান ইব্রাহিম আজিজিও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও প্রমাণ করেছেন যে তিনি আলোচনার নীতি কিংবা যুদ্ধবিরতির প্রতি যথাযথ সম্মান দেখান না। তাঁর মতে, সাম্প্রতিক হামলা কেবল একটি সামরিক পদক্ষেপ নয়; বরং এটি যুদ্ধবিরতির চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের এই বক্তব্য দেশটির অভ্যন্তরীণ জনমতকে আরও কঠোর অবস্থানের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
মূলত ১৭ জুন উভয় দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক মহল স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল। দীর্ঘদিনের উত্তেজনা ও সামরিক সংঘাতের পর এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতি। অনেকেই মনে করেছিলেন, এই সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন এক স্থিতিশীলতার সূচনা করবে। কিন্তু মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে নতুন করে হামলা এবং পাল্টা হামলার ঘটনায় স্পষ্ট হয়েছে যে যুদ্ধবিরতির কাগুজে চুক্তি বাস্তব পরিস্থিতিকে সবসময় নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
এই সংঘাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পৌঁছে যায়। ফলে এখানে সামান্য অস্থিরতাও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। অতীতেও দেখা গেছে, হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা বাড়লেই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। একই সঙ্গে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি হয়।
বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্যও এই পরিস্থিতি উদ্বেগের। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব পড়ে দেশের জ্বালানি ব্যয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন খরচ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যেও। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের একটি আঞ্চলিক সংঘাত শেষ পর্যন্ত হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভুল বোঝাবুঝি এবং দ্রুত প্রতিশোধমূলক সামরিক পদক্ষেপ। একটি ছোট হামলা কখন যে বড় আকারের সংঘাতে রূপ নেবে, তা আগে থেকে অনুমান করা কঠিন। বিশেষ করে ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং দূরপাল্লার অস্ত্রের যুগে কয়েক মিনিটের মধ্যেই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে। ফলে যুদ্ধবিরতি বজায় রাখতে কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ, পারস্পরিক আস্থা এবং কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমান উত্তেজনা কমাতে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলো যদি দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করে, তাহলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে। অন্যথায় প্রতিশোধ ও পাল্টা প্রতিশোধের এই চক্র অঞ্চলটিকে আবারও দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যেতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তথ্যযুদ্ধ। উভয় দেশই নিজেদের অবস্থানকে বৈধ প্রমাণ করতে বিভিন্ন বিবৃতি দিচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক জনমত নিজেদের পক্ষে আনার চেষ্টা করছে। ফলে কোন পক্ষ আগে হামলা চালিয়েছে বা কোন পক্ষ যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ করেছে—এসব বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন দাবি সামনে আসছে। নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া এসব দাবির সত্যতা যাচাই করা কঠিন। তাই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও পর্যবেক্ষকদের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বর্তমান ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে, যুদ্ধবিরতি মানেই স্থায়ী শান্তি নয়। কাগজে-কলমে চুক্তি স্বাক্ষর করা তুলনামূলক সহজ হলেও বাস্তবে সেই চুক্তি কার্যকর রাখা অনেক বেশি কঠিন। পারস্পরিক অবিশ্বাস, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সামরিক উপস্থিতি এবং কৌশলগত স্বার্থ—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের মতো অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা একটি দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলা সেই বাস্তবতাকেই আবারও সামনে এনেছে। যুদ্ধবিরতির আশা এখনো পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি, তবে নতুন সংঘাতের ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বিশ্বের দৃষ্টি এখন এই দুই দেশের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। তারা কি আবার আলোচনার টেবিলে ফিরে আসবে, নাকি প্রতিশোধের রাজনীতি আরও বড় সামরিক সংঘাতে রূপ নেবে—তার উত্তরই নির্ধারণ করবে মধ্যপ্রাচ্যের নিকট ভবিষ্যৎ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তার গতিপথ।
আপনার মতামত জানানঃ