সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলো দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের ধনী ব্যক্তি, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের কাছে অর্থ সংরক্ষণের একটি পরিচিত গন্তব্য হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। একসময় সুইস ব্যাংকের গোপনীয়তা ছিল প্রায় কিংবদন্তিতুল্য। সেই কারণেই বিশ্বজুড়ে কালোটাকা, অবৈধ সম্পদ এবং অর্থ পাচার নিয়ে আলোচনায় সুইস ব্যাংকের নাম বারবার উঠে এসেছে। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক চুক্তি, তথ্য আদান–প্রদানের ব্যবস্থা এবং আর্থিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধির কারণে সুইস ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অনেক পরিবর্তন এসেছে, তবু এসব ব্যাংকে বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের জমা অর্থের পরিমাণ এখনও বিশ্বজুড়ে আগ্রহের বিষয়।
সম্প্রতি প্রকাশিত সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এক বছরের ব্যবধানে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪১ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৪ সালে যেখানে বাংলাদেশিদের জমা অর্থ ছিল প্রায় ৫৯ কোটি সুইস ফ্রাঁ, সেখানে ২০২৫ সালের শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঁতে। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী, এই অর্থের পরিমাণ বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকার সমান।
এই পরিসংখ্যান প্রকাশের পর স্বাভাবিকভাবেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে অর্থ পাচার, বৈদেশিক সম্পদ এবং দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা। কারণ, গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, ব্যাংক খাতের চাপ, বিনিয়োগের দুর্বল গতি এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেই সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত বৃদ্ধির খবর বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে একটি বিষয় শুরুতেই পরিষ্কার করা প্রয়োজন। সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের নামে থাকা সব অর্থই যে অবৈধ বা পাচার করা অর্থ, এমন ধারণা সঠিক নয়। সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রতিবেদনে যে হিসাব প্রকাশ করা হয়, সেখানে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের অর্থও অন্তর্ভুক্ত থাকে। বাংলাদেশের অনেক ব্যাংক বৈধভাবে বিদেশি ব্যাংকে অর্থ জমা রাখে। আবার প্রবাসী বাংলাদেশিরাও ব্যক্তিগত সঞ্চয় বা ব্যবসায়িক প্রয়োজনে সুইস ব্যাংকে হিসাব খুলে অর্থ জমা রাখতে পারেন।
এ ছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত সুইস ব্যাংকের শাখাগুলোতে বাংলাদেশি নাগরিকদের জমা রাখা অর্থও এই হিসাবের অন্তর্ভুক্ত হয়। ফলে প্রকাশিত তথ্যকে সরাসরি অর্থ পাচারের পরিসংখ্যান হিসেবে দেখা যায় না। বরং এটি বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট মোট আমানতের একটি আর্থিক চিত্র।
তবুও প্রশ্ন থেকেই যায়—এক বছরে এত বড় প্রবৃদ্ধি কেন ঘটল? অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, এর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং অনিশ্চয়তার সময়ে অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নিজেদের সম্পদ বিদেশে স্থানান্তর করার চেষ্টা করে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বৈদেশিক হিসাবেও অর্থের পরিমাণ বাড়তে পারে। তৃতীয়ত, প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঞ্চয় ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রভাবও এই পরিসংখ্যানে প্রতিফলিত হতে পারে।
তবে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো অর্থ পাচারের সম্ভাবনা। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন গবেষণা, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং সরকারি প্রতিবেদনে বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগ উঠে এসেছে। বিশেষ করে ব্যাংক ঋণ জালিয়াতি, অতিমূল্যায়িত আমদানি, কম মূল্যে রপ্তানি দেখানো, ভুয়া বাণিজ্য এবং অফশোর কোম্পানির মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তরের নানা অভিযোগ রয়েছে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেকেই আশা করেছিলেন যে অর্থ পাচারের প্রবণতা কমে আসবে। কিন্তু সুইস ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান সেই প্রত্যাশার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করছেন, বিদেশে সম্পদ সরিয়ে নেওয়ার প্রবণতা এখনও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বরং অতীতে পাচার হওয়া অর্থ বিভিন্ন পথে পুনরায় স্থানান্তরিত হয়ে নতুন গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক মইনুল ইসলামের মতো অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, সুইস ব্যাংকে অর্থ বৃদ্ধির এই তথ্য উদ্বেগের কারণ। কারণ, একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য মূলধনের দেশত্যাগ দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর। দেশের ভেতরে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনে যে অর্থ ব্যবহার হওয়ার কথা, তা বিদেশে চলে গেলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশ বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আমদানি ব্যয় এবং ডলার সংকটের মতো নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এই অবস্থায় দেশীয় মূলধন বিদেশে চলে যাওয়ার বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ, একটি দেশের অর্থনৈতিক শক্তি অনেকাংশে নির্ভর করে সেই দেশের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের ওপর। যদি বড় অঙ্কের অর্থ বিদেশে চলে যায়, তাহলে তা শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ কমিয়ে দিতে পারে।
অন্যদিকে অর্থ পাচার শুধু অর্থনীতির সমস্যা নয়; এটি সুশাসন ও জবাবদিহির সঙ্গেও সম্পর্কিত। যখন জনগণ দেখে যে কিছু ব্যক্তি বিপুল সম্পদ বিদেশে সরিয়ে নিতে সক্ষম হচ্ছে, তখন আর্থিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা কমে যায়। করদাতাদের মধ্যেও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। ফলে অর্থ পাচার প্রতিরোধ কেবল অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।
তবে সুইস ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। কারণ, এই পরিসংখ্যানের মধ্যে বৈধ এবং অবৈধ—উভয় ধরনের অর্থ থাকতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ব্যবসা পরিচালনার জন্য বিদেশি ব্যাংকে অর্থ রাখা একটি স্বাভাবিক বিষয়। আবার বহুজাতিক কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও বিদেশি হিসাব ব্যবহার করা হয়। তাই শুধুমাত্র আমানতের পরিমাণ দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সুইজারল্যান্ডও আগের মতো গোপনীয়তার স্বর্গরাজ্য নেই। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে দেশটি বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে আর্থিক তথ্য বিনিময় করছে। কর ফাঁকি, মানি লন্ডারিং এবং সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে তারা নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ফলে অতীতের তুলনায় সুইস ব্যাংকে অবৈধ অর্থ লুকিয়ে রাখা এখন অনেক বেশি কঠিন।
তবু বিশ্বজুড়ে সম্পদ স্থানান্তরের নতুন নতুন পথ তৈরি হয়েছে। অনেকেই এখন বিভিন্ন অফশোর কেন্দ্র, ট্রাস্ট, শেল কোম্পানি এবং তৃতীয় দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ সরিয়ে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে শুধু সুইস ব্যাংকের হিসাব দিয়ে অর্থ পাচারের সামগ্রিক চিত্র পাওয়া সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পাচার হওয়া অর্থ শনাক্ত করা এবং তা ফেরত আনার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা। বিভিন্ন সময়ে সরকার বিদেশে থাকা সম্পদের তথ্য সংগ্রহ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং আইনি পদক্ষেপের কথা বলেছে। তবে বাস্তবে অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল এবং সময়সাপেক্ষ। এজন্য প্রয়োজন শক্তিশালী কূটনৈতিক প্রচেষ্টা, দক্ষ তদন্ত এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা।
একই সঙ্গে অর্থ পাচার রোধে দেশের ভেতরেও আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংক ঋণ বিতরণে জবাবদিহি, বাণিজ্যিক লেনদেনে নজরদারি, কর প্রশাসনের আধুনিকীকরণ এবং দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রম জোরদার করা ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থ ৪১ শতাংশ বৃদ্ধির খবর তাই শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা, মূলধনের গতিপ্রকৃতি এবং আর্থিক শাসনব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। এই অর্থের কত অংশ বৈধ, কত অংশ অবৈধ কিংবা কত অংশ প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঞ্চয়—তা নিয়ে বিশদ বিশ্লেষণ প্রয়োজন। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী করতে হলে মূলধনের নিরাপদ ও উৎপাদনশীল ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। আর সে জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং এমন একটি আর্থিক পরিবেশ, যেখানে মানুষ দেশের ভেতরেই বিনিয়োগ করতে আস্থা পায়।
সুইস ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য সেই প্রয়োজনীয় আলোচনাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। এখন দেখার বিষয়, নীতিনির্ধারকরা এই সংকেতকে কতটা গুরুত্ব দেন এবং অর্থ পাচার রোধ ও পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেন।
আপনার মতামত জানানঃ