বাংলাদেশের ইতিহাসে নদী শুধু একটি ভৌগোলিক উপাদান নয়; এটি এই দেশের অর্থনীতি, কৃষি, সংস্কৃতি এবং অস্তিত্বের অংশ। গঙ্গা, পদ্মা, যমুনা, মেঘনা—এই নদীগুলো শুধু পানি বহন করে না, বহন করে কোটি মানুষের জীবন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। সরকার এই প্রকল্পকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি সংকট, লবণাক্ততা, নৌপথ এবং সেচব্যবস্থার সমাধান হিসেবে তুলে ধরছে। অন্যদিকে অনেক বিশেষজ্ঞ সতর্ক করে বলছেন, এই প্রকল্প বাংলাদেশকে আরও বড় পরিবেশগত ও জলসংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
বিশিষ্ট পানি বিশেষজ্ঞ ও যুক্তরাষ্ট্রের কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার ভূতত্ত্ব ও সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. খালেকুজ্জামান মনে করেন, পদ্মা ব্যারাজ বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদের বদলে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাঁর মতে, ফারাক্কা ব্যারাজ এবং তিস্তা ব্যারাজের অভিজ্ঞতা থেকেই বাংলাদেশের শিক্ষা নেওয়া উচিত।
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বদ্বীপ। এই বদ্বীপ হাজার হাজার বছর ধরে গড়ে উঠেছে নদীবাহিত পলির মাধ্যমে। নদী যখন পাহাড় ও উঁচু অঞ্চল থেকে পলি বয়ে নিয়ে আসে, তখন সেই পলি উপকূল ও নিম্নভূমিতে জমা হয়ে নতুন ভূমি তৈরি করে। এই প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেলে বদ্বীপ দুর্বল হয়ে পড়ে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তন এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির এই সময়ে পলিই বাংলাদেশের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রধান শক্তি।
কিন্তু গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে প্রবেশ করা পলির পরিমাণ নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। ষাটের দশকে বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ২০০ কোটি টন পলি প্রবেশ করত। বর্তমানে সেই পরিমাণ নেমে এসেছে অর্ধেকেরও নিচে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর প্রধান কারণ উজানে নির্মিত বাঁধ, ব্যারাজ এবং অন্যান্য পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো।
গঙ্গা-যমুনা অববাহিকার মাত্র ৮ শতাংশ বাংলাদেশের মধ্যে অবস্থিত। বাকি অংশ ভারত, নেপাল, ভুটান ও চীনের ভেতরে। ফলে উজানে যেকোনো হস্তক্ষেপ সরাসরি বাংলাদেশের ওপর প্রভাব ফেলে। ফারাক্কা ব্যারাজ চালু হওয়ার পর গঙ্গার বিপুল পরিমাণ পলি ভারতের ভেতরেই আটকে যেতে শুরু করে। এর ফলে বাংলাদেশের নদীগুলো আগের মতো পলি পাচ্ছে না।
ড. খালেকুজ্জামান বলছেন, যদি পদ্মার ওপর আরেকটি ব্যারাজ নির্মাণ করা হয়, তাহলে যে সামান্য পলি এখনো বাংলাদেশে প্রবেশ করছে, তার বড় অংশও আটকে যাবে। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হবে এবং উপকূলীয় অঞ্চলে পলি সরবরাহ আরও কমে যাবে। দীর্ঘমেয়াদে এটি বাংলাদেশের বদ্বীপ ব্যবস্থার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
ফারাক্কার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য বড় সতর্কবার্তা। ভারতের অনেক গবেষকই বলেছেন, ফারাক্কা একটি ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। এর ফলে উজানে পলি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হয়েছে, জলাবদ্ধতা বেড়েছে এবং ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। আবার ভাটিতে পানি সংকট আরও তীব্র হয়েছে। মালদা ও মুর্শিদাবাদ অঞ্চলে হাজার হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ড. খালেকুজ্জামানের মতে, বাংলাদেশ যদি একই নদী ব্যবস্থায় আরেকটি ব্যারাজ তৈরি করে, তাহলে একই ধরনের বিপর্যয় এখানেও দেখা দিতে পারে।
পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের আরেকটি বড় প্রশ্ন হচ্ছে—পানি কোথা থেকে আসবে? কারণ ব্যারাজ বা বাঁধ নিজে পানি তৈরি করতে পারে না। পানি আসতে হবে উজান থেকে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ এখনো গঙ্গার ন্যায্য হিস্যা পাচ্ছে না।
গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি পাওয়ার কথা। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, বহু সময় বাংলাদেশ সেই পানি পায়নি। বিশেষ করে মার্চ থেকে মে পর্যন্ত সবচেয়ে সংকটপূর্ণ সময়ে পানি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বড় ঘাটতি থাকে।
বর্তমান চুক্তির একটি বড় দুর্বলতা হলো, এতে কোনো “গ্যারান্টি ক্লজ” নেই। অর্থাৎ ফারাক্কায় পানি কমে গেলে বাংলাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কম পানি পাবে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে নদীগুলো আরও শুকিয়ে যায়।
এই অবস্থায় নতুন ব্যারাজ নির্মাণকে ড. খালেকুজ্জামান “অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত” বলে মনে করেন। তাঁর মতে, প্রথমে বাংলাদেশের উচিত শক্তিশালী ও দীর্ঘমেয়াদি পানি চুক্তি নিশ্চিত করা। তারপর পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে বড় প্রকল্প ভাবা উচিত।
তিস্তা ব্যারাজের অভিজ্ঞতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ তিস্তায় ব্যারাজ তৈরি করেছে, কিন্তু পর্যাপ্ত পানি না পাওয়ায় বিশাল এলাকাজুড়ে এখন বালুচর তৈরি হয়েছে। অনেক অংশ প্রায় মরুভূমির মতো হয়ে গেছে।
এই বাস্তবতা দেখিয়ে দেয়, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই সমস্যা সমাধান হয় না। নদীতে যদি পানি না থাকে, তাহলে ব্যারাজও কার্যকর হবে না।
পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পে দাবি করা হচ্ছে, এটি ১৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা দেবে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, এত বড় এলাকায় সেচ দিতে যে পরিমাণ পানি প্রয়োজন, ব্যারাজে তার কাছাকাছিও পানি সংরক্ষণ সম্ভব নয়।
প্রকল্প অনুযায়ী, ব্যারাজে প্রায় ৩ বিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা হবে। অথচ শুধু একদিনের বড় বন্যাতেই পদ্মা দিয়ে এর দ্বিগুণ পানি বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে। ফলে এই সংরক্ষণ ক্ষমতা বাস্তব প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম।
এমনকি পুরো সংরক্ষিত পানি সেচে ব্যবহার করলেও নৌপথ, মৎস্যসম্পদ বা পরিবেশগত প্রবাহের জন্য পর্যাপ্ত পানি থাকবে না।
প্রকল্পের আরেকটি বড় দাবি হচ্ছে—এটি লবণাক্ততা কমাবে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এত অল্প পানি দিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ততা বাস্তবিক অর্থে কমানো সম্ভব নয়।
বরং একটি অঞ্চলে কিছুটা লবণাক্ততা কমলেও অন্য অঞ্চলে তা বাড়তে পারে। কারণ নদীর স্বাভাবিক মিঠাপানির প্রবাহ কমে গেলে মেঘনা মোহনা ও বরিশাল অঞ্চলে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি আরও ভেতরে প্রবেশ করতে পারে।
মৎস্যসম্পদ নিয়েও বড় উদ্বেগ রয়েছে। একসময় ইলিশ মাছ এলাহাবাদ পর্যন্ত যেত। কিন্তু ফারাক্কা ব্যারাজ সেই স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত করেছে। এখন পদ্মায় নতুন ব্যারাজ নির্মিত হলে ইলিশসহ অনেক মাছের প্রজনন ও চলাচল আরও বাধাগ্রস্ত হবে।
প্রকল্পে দুটি ফিশ ল্যাডারের কথা বলা হলেও বিশেষজ্ঞরা এ নিয়ে সন্দিহান। বাংলাদেশের নদীতে ইলিশ বা দেশীয় মাছ এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে কতটা চলাচল করতে পারবে, তার কার্যকর গবেষণা নেই।
ভাঙন নিয়েও প্রকল্পে আশাবাদী দাবি করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, ব্যারাজ নদীর স্বাভাবিক গতি পরিবর্তন করে ভাঙন আরও বাড়াতে পারে। উজানে পানি জমে নদীর চরিত্র বদলে যায়, আবার হঠাৎ পানি ছাড়া হলে ভাটিতে তীব্র স্রোত তৈরি হয়।
ড. খালেকুজ্জামান আশঙ্কা করছেন, পদ্মার মতো বিশাল নদীতে এ ধরনের হস্তক্ষেপ নদী ব্যবস্থাকেই অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
জলাবদ্ধতার ঝুঁকিও রয়েছে। কারণ ব্যারাজের কারণে উজানে পলি জমে নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে যেতে পারে। এতে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হবে এবং বন্যা ও জলাবদ্ধতা বাড়বে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের পানি সমস্যার সমাধান শুধু বড় বড় অবকাঠামো নয়; বরং সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনায়।
ড. খালেকুজ্জামানের মতে, বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পানি আইন ও জাতিসংঘের ওয়াটারকোর্স কনভেনশনে যোগ দিতে হবে। এতে আন্তর্জাতিক নদীগুলো নিয়ে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
একই সঙ্গে দরকার সমন্বিত অববাহিকা ব্যবস্থাপনা। কারণ উজানে যা ঘটে, তার প্রভাব ভাটিতে পড়বেই। ফলে ভারত, নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশের মধ্যে সমন্বিত পানি কূটনীতি জরুরি।
দেশের ভেতরেও অনেক কাজ করার সুযোগ রয়েছে। মৃত খাল, নদী ও জলাশয় পুনরুদ্ধার, ড্রেজিং, পলি ব্যবস্থাপনা এবং প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ করলে অনেক সমস্যার টেকসই সমাধান সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের নদীগুলোকে প্রকল্পভিত্তিকভাবে নয়, জীবন্ত একটি সামগ্রিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। নদী শুধু পানি বহন করে না; এটি পলি, জীববৈচিত্র্য, কৃষি, মৎস্যসম্পদ এবং পুরো পরিবেশব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত।
পদ্মা ব্যারাজ তাই শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নদীনীতি ও পরিবেশগত নিরাপত্তার প্রশ্নও।
আজ যখন জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং পানিসংকট একসঙ্গে বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতা বিবেচনা করা জরুরি।
কারণ ভুল সিদ্ধান্তের মূল্য শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়; কখনো কখনো একটি দেশের পরিবেশগত ভবিষ্যৎও নির্ধারণ করে দেয়।
আপনার মতামত জানানঃ