
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা হিসেবে পরিচিত তৈরি পোশাক খাত এক অদ্ভুত দ্বৈত বাস্তবতার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। একদিকে এই খাত দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ জোগান দিচ্ছে, অন্যদিকে একই খাত গত তিন বছরে প্রায় ৪০০ কারখানা হারিয়েছে। এই বৈপরীত্য শুধু সংখ্যার খেলা নয়; এর ভেতরে লুকিয়ে আছে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, অভ্যন্তরীণ নীতি-সংকট, উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকার সংগ্রাম।
তৈরি পোশাক শিল্পের উত্থান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। স্বল্প পুঁজি, সস্তা শ্রম এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে এই খাত দ্রুতই বিশ্বে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে পরিচিত। প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক সরাসরি এই খাতে কাজ করছে, যার বড় অংশ নারী। ফলে এটি শুধু একটি শিল্প নয়, বরং একটি সামাজিক রূপান্তরের মাধ্যমও বটে। নারী ক্ষমতায়ন, গ্রামীণ অর্থনীতির গতিশীলতা এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির সম্প্রসারণ—সবকিছুর পেছনে এই খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই শক্তিশালী খাত নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বৈশ্বিক মন্দা, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং জ্বালানি সংকট—সবকিছু মিলিয়ে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। এর ফলে অনেক ছোট ও মাঝারি কারখানা টিকে থাকতে পারছে না। বিজিএমইএর তথ্যমতে, গত তিন বছরে প্রায় ৪০০ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, যা শিল্পের জন্য একটি সতর্কবার্তা। যদিও একই সময়ে প্রায় ৩৫০ নতুন কারখানা স্থাপিত হয়েছে, তবুও পুরনো কারখানাগুলোর বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি ভারসাম্যহীন পরিস্থিতি তৈরি করছে।
রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে নিম্নমুখী প্রবণতা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ফেব্রুয়ারিতে আগের বছরের তুলনায় রপ্তানি আয় প্রায় ৩.৭৩ শতাংশ কমেছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে এই পতন স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এর পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে চাহিদা হ্রাস, যা বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি গন্তব্য। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় ক্রেতারা এখন কম দামে পণ্য কিনতে চাইছে, ফলে উৎপাদকদের ওপর চাপ বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে শিল্প সংশ্লিষ্টরা সরকারের কাছে বিভিন্ন প্রস্তাব তুলে ধরেছেন। তাদের মতে, রপ্তানি আয়ের ওপর উৎস কর ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০.৫০ শতাংশ করা হলে শিল্প মালিকরা বছরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় করতে পারবেন। এই সাশ্রয়কৃত অর্থ নতুন প্রযুক্তি, কারখানা সম্প্রসারণ এবং শ্রমিক কল্যাণে বিনিয়োগ করা সম্ভব হবে। এছাড়া সাব-কন্ট্রাক্ট বা উপচুক্তিভিত্তিক কারখানাগুলোর জন্য দ্বৈত কর পরিহার এবং ভ্যাট প্রক্রিয়া সহজীকরণের দাবি জানানো হয়েছে, কারণ এসব জটিলতার কারণে ছোট কারখানাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
শিল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে সবুজ উৎপাদন। বর্তমানে বাংলাদেশে ২৩০টির বেশি লিড সার্টিফায়েড সবুজ পোশাক কারখানা রয়েছে, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। এটি নিঃসন্দেহে দেশের জন্য একটি গর্বের বিষয়। তবে এই ধারা বজায় রাখতে হলে সোলার পিভি সিস্টেম আমদানিতে শুল্কছাড় এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে বিনিয়োগে সরকারি সহায়তা জরুরি। উদ্যোক্তারা মনে করেন, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন শুধু আন্তর্জাতিক বাজারে গ্রহণযোগ্যতা বাড়াবে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন ব্যয়ও কমাবে।
কারখানার নিরাপত্তা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম প্রতিস্থাপন, বন্দর থেকে কাঁচামাল দ্রুত ছাড় করা এবং কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করা—এসব বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে কাঁচামাল ছাড় করতে ৭ থেকে ১০ দিন সময় লাগে, যা উৎপাদন প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়। এই সময় তিন দিনে নামিয়ে আনা গেলে উৎপাদন আরও গতিশীল হবে এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা সহজ হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এসব প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা গেলে উৎপাদন ব্যয় গড়ে ৩ থেকে ৫ শতাংশ কমানো সম্ভব। এর ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প আবারও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে ফিরে আসতে পারবে। একই সঙ্গে আগামী অর্থবছরে রপ্তানি আয় ৫৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়ানোর সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
তবে শুধু নীতিগত সহায়তা দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। শিল্প মালিকদেরও নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, দক্ষ শ্রমিক তৈরি এবং মান নিয়ন্ত্রণে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি, কারণ এই খাতের সাফল্যের পেছনে তাদের অবদান সবচেয়ে বেশি।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত একদিকে যেমন সাফল্যের প্রতীক, অন্যদিকে এটি এখন একটি মোড় ঘোরানোর সময় পার করছে। সঠিক নীতি, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং শিল্প মালিকদের দায়িত্বশীল ভূমিকার মাধ্যমে এই খাত আবারও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। অন্যথায়, বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো ভবিষ্যতে আরও বড় সংকটে রূপ নিতে পারে।
অতএব, সময় এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার—বাংলাদেশ কি তার সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক শক্তিকে নতুন করে গড়ে তুলবে, নাকি চ্যালেঞ্জের চাপে ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়বে। বাস্তবতা হলো, এই খাতের সাফল্য মানেই দেশের অর্থনীতির সাফল্য, আর এর ব্যর্থতা মানেই একটি বড় ধাক্কা। তাই সব পক্ষের সম্মিলিত উদ্যোগই পারে এই গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকে আবারও এগিয়ে নিতে।
আপনার মতামত জানানঃ