সমুদ্রের গভীরে, বরফশীতল পানির নিচে ধীর গতিতে ভেসে বেড়ানো এক বিশাল প্রাণী—বোহেড তিমি—হঠাৎ করেই মানব সভ্যতার এক প্রাচীন স্বপ্নকে নতুন করে আলোচনায় এনে দিয়েছে: দীর্ঘায়ু। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষ চেয়েছে আরও দীর্ঘ, সুস্থ জীবন। ইতিহাসে অমরত্বের কাহিনি যেমন কল্পনায় ছিল, তেমনি বাস্তবে বিজ্ঞানও বারবার চেষ্টা করেছে বার্ধক্যকে ধীর করার উপায় খুঁজতে। এবার সেই অনুসন্ধানে এক নতুন দিক খুলে দিয়েছে তিমির শরীরে থাকা এক বিশেষ প্রোটিন, যা মানুষের আয়ু বাড়ানোর সম্ভাবনার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
বোহেড তিমি এমন একটি প্রাণী, যা প্রায় ২০০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়। পৃথিবীর খুব কম স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যেই এমন দীর্ঘায়ু দেখা যায়। শুধু দীর্ঘ জীবনই নয়, এই তিমির আরেকটি বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো—তারা তুলনামূলকভাবে কম রোগে আক্রান্ত হয় এবং বার্ধক্যের লক্ষণও ধীরে প্রকাশ পায়। এই অস্বাভাবিক সহনশীলতা এবং দীর্ঘজীবনের পেছনে কী রহস্য লুকিয়ে আছে, তা জানার জন্যই বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরে গবেষণা করে আসছেন।
সম্প্রতি এক গবেষণায় উঠে এসেছে ‘সিআইআরবিপি’ বা CIRBP নামের একটি প্রোটিনের কথা, যা এই তিমির শরীরে অস্বাভাবিক মাত্রায় উপস্থিত। এই প্রোটিনের কাজ হলো ডিএনএর ক্ষত মেরামত করা, বিশেষ করে ডাবল-স্ট্র্যান্ড ব্রেক নামে পরিচিত গুরুতর ক্ষতগুলো। মানুষের শরীরেও প্রতিনিয়ত ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত হয়—পরিবেশগত প্রভাব, বিকিরণ, বা কোষ বিভাজনের সময় নানা ত্রুটির কারণে। এসব ক্ষতি যদি ঠিকমতো মেরামত না হয়, তাহলে তা ক্যানসারসহ বিভিন্ন রোগের কারণ হতে পারে এবং কোষের কার্যকারিতা ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়। এখানেই CIRBP প্রোটিনের গুরুত্ব।
গবেষণায় দেখা গেছে, বোহেড তিমির শরীরে এই প্রোটিনের পরিমাণ অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর তুলনায় প্রায় ১০০ গুণ বেশি। এটি তাদের কোষকে দ্রুত ও কার্যকরভাবে ডিএনএ মেরামতের সক্ষমতা দেয়, ফলে কোষ দীর্ঘদিন সুস্থ থাকে এবং বার্ধক্য ধীরগতিতে এগোয়। বিজ্ঞানীরা যখন পরীক্ষাগারে মানুষের কোষ এবং ফলখেকো মাছির কোষে এই প্রোটিন যুক্ত করেন, তখন উভয় ক্ষেত্রেই ডিএনএ মেরামতের প্রক্রিয়া উন্নত হয়। বিশেষ করে মাছির ক্ষেত্রে আয়ু বৃদ্ধির প্রমাণও পাওয়া গেছে, যা এই গবেষণাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
এই আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের সামনে নতুন প্রশ্নও তুলে ধরেছে। যদি একটি প্রোটিন ডিএনএ মেরামতের দক্ষতা বাড়িয়ে দিতে পারে, তবে কি সেটি মানুষের আয়ু বৃদ্ধির পথ খুলে দিতে পারে? যদিও এই প্রশ্নের উত্তর এখনো নিশ্চিত নয়, তবুও সম্ভাবনাটি এতটাই শক্তিশালী যে এটি বার্ধক্যবিজ্ঞান বা জেরোন্টোলজির ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তাপমাত্রার প্রভাব। গবেষকেরা লক্ষ্য করেছেন, কম তাপমাত্রা CIRBP প্রোটিনের কার্যকারিতা বাড়িয়ে দেয়। এটি স্বাভাবিকও বটে, কারণ বোহেড তিমি সুমেরু অঞ্চলের অত্যন্ত ঠান্ডা পানিতে বাস করে। সেই পরিবেশ তাদের শরীরে এই প্রোটিনের উৎপাদন ও কার্যকারিতা বৃদ্ধি করতে সহায়তা করে। এখান থেকে একটি নতুন ধারণা জন্ম নিয়েছে—মানুষের জীবনযাত্রায় কি এমন কিছু পরিবর্তন আনা যায়, যা এই প্রোটিনের কার্যকারিতা বাড়াতে সাহায্য করবে? উদাহরণ হিসেবে ঠান্ডা পানিতে গোসল বা শীতল পরিবেশে থাকা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে, যদিও এ বিষয়ে এখনো পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তবে এই গবেষণাকে ঘিরে যতটা উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, ততটাই সতর্কতাও প্রয়োজন। মানুষের শরীর অত্যন্ত জটিল, এবং একটি মাত্র প্রোটিন দিয়ে পুরো বার্ধক্য প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়। তাছাড়া, ল্যাবরেটরিতে কোষ বা ছোট প্রাণীর ওপর পাওয়া ফলাফল সরাসরি মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই বিজ্ঞানীরা জোর দিচ্ছেন আরও বিস্তৃত গবেষণার ওপর, যাতে এই প্রোটিনের কার্যকারিতা, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।
এই আবিষ্কার আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকেও মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃতি নিজেই এক বিশাল গবেষণাগার। কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রাণী এমন সব বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে, যা মানুষের কাছে বিস্ময়কর। তিমির দীর্ঘায়ু তারই একটি উদাহরণ। এই বৈশিষ্ট্যগুলো বুঝতে পারলে মানুষ নিজের স্বাস্থ্য ও আয়ু উন্নত করার নতুন পথ খুঁজে পেতে পারে।
মানুষের ২০০ বছর বেঁচে থাকা এখনো বাস্তবতার অনেক দূরে। তবে এই গবেষণা অন্তত এটুকু দেখিয়েছে যে, বার্ধক্য একটি অনিবার্য কিন্তু অপরিবর্তনীয় প্রক্রিয়া নয়। সঠিক বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান এবং প্রযুক্তির উন্নতির মাধ্যমে হয়তো একদিন মানুষ তার জীবনকে আরও দীর্ঘ ও সুস্থ করে তুলতে পারবে। তিমির শরীরের একটি প্রোটিন সেই দীর্ঘ যাত্রার এক ক্ষুদ্র কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হয়ে উঠতে পারে।
আপনার মতামত জানানঃ