এশিয়ার ভূরাজনীতির মানচিত্রে একটি নীরব কিন্তু গভীর পরিবর্তন ঘটছে—যেখানে বহুদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসা যুক্তরাষ্ট্র এখন ধীরে ধীরে তার অবস্থান হারাতে বসেছে, আর সেই শূন্যস্থান পূরণে এগিয়ে আসছে রাশিয়া ও ইরান। সাম্প্রতিক সংঘাত, বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা এবং তার জেরে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার বিপর্যয়, এশিয়ার দেশগুলোর সামনে এমন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে পুরোনো মিত্রতার চেয়ে জাতীয় স্বার্থই বড় হয়ে উঠছে।
মধ্যপ্রাচ্য বরাবরই বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের কেন্দ্রবিন্দু, আর সেই অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি। এই প্রণালির মাধ্যমে বিশ্ববাজারে প্রবাহিত তেলের একটি বড় অংশ এশিয়ার দেশগুলোতে পৌঁছায়। কিন্তু ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এই পথকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। ফলে হঠাৎ করেই তেলের ঘাটতি দেখা দিয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে শুরু করে ফিলিপাইন, ভারত, জাপান ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোতে। এই সংকট এমন এক চাপ তৈরি করেছে, যেখানে রাজনৈতিক অবস্থান নয়, বরং প্রয়োজনই হয়ে উঠেছে সিদ্ধান্তের মূল চালিকাশক্তি।
যেসব দেশ এতদিন পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়া বা ইরানের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখেছিল, তারা এখন সেই অবস্থান থেকে সরে আসতে বাধ্য হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ফিলিপাইন পাঁচ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো রুশ তেল আমদানি শুরু করেছে। একইভাবে ভারত সাত বছর পর আবার ইরানের তেল গ্রহণ করেছে। এই পরিবর্তন শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি একটি বড় কূটনৈতিক বার্তাও বহন করে—যেখানে বোঝা যাচ্ছে, বিশ্ব রাজনীতিতে স্থায়ী মিত্র বা শত্রু বলে কিছু নেই; আছে শুধু স্বার্থ।
এই প্রেক্ষাপটে ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিও সমালোচনার মুখে পড়েছে। তার নীতির অস্পষ্টতা এবং যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থান এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। অনেক নেতা এখন মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল থাকা ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে তারা বিকল্প উৎস ও নতুন কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার দিকে ঝুঁকছেন।
এই সংকটের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হিসেবে আবারও সামনে এসেছেন ভ্লাদিমির পুতিন। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে যিনি একসময় আন্তর্জাতিক মঞ্চে চাপে ছিলেন, সেই পুতিন এখন নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন। রাশিয়ার তেল এখন শুধু সহজলভ্যই নয়, অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত সরবরাহযোগ্যও। বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলোর জন্য এটি একটি বড় সুবিধা। দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো যেখানে পশ্চিমা দেশ থেকে তেল আনতে দুই মাস সময় লাগতে পারে, সেখানে রাশিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় বন্দর থেকে কয়েক দিনের মধ্যেই সরবরাহ সম্ভব।
দক্ষিণ কোরিয়া এই সংকটে সবচেয়ে বাস্তববাদী অবস্থান নিয়েছে। তারা সরাসরি রাশিয়া ও ইরান থেকে তেল ও গ্যাস আমদানির পরিকল্পনা করছে, যদিও তারা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হিসেবেই পরিচিত। তাদের এই সিদ্ধান্ত দেখিয়ে দেয়, বর্তমান বিশ্বে জ্বালানি নিরাপত্তা কূটনৈতিক সম্পর্কের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একইভাবে জাপান এক অদ্ভুত দ্বৈত অবস্থানে রয়েছে—একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গেও ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। ফলে তারা দুই পক্ষের মধ্যেই ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে।
ইন্দোনেশিয়া আবার নিজেদের ‘স্বতন্ত্র পররাষ্ট্রনীতি’র কথা বলে একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করছে এবং রাশিয়ার কাছ থেকে জ্বালানি আমদানির আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এই ধরনের দ্বিমুখী কৌশল এখন অনেক দেশের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে। কারণ তারা বুঝতে পারছে, একক কোনো শক্তির ওপর নির্ভর করা ভবিষ্যতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
এই পুরো পরিস্থিতি আসলে একটি বড় বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে—বিশ্ব এখন আর একমেরু নয়। চীন, রাশিয়া ও ইরানের মতো দেশগুলো নিজেদের প্রভাব বাড়াচ্ছে, আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব তুলনামূলকভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। বিশেষ করে জ্বালানি খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এই পরিবর্তন হঠাৎ করে ঘটেনি; বরং এটি দীর্ঘদিনের একটি প্রক্রিয়ার ফল। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা নীতি, সামরিক হস্তক্ষেপ এবং একতরফা সিদ্ধান্ত অনেক দেশকে বিকল্প ভাবতে বাধ্য করেছে। ইরান যুদ্ধ সেই প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুততর করেছে মাত্র। এখন অনেক দেশই বুঝতে পারছে, বহুমুখী সম্পর্ক গড়ে তোলা ছাড়া টিকে থাকা কঠিন।
তবে এর অর্থ এই নয় যে এশিয়ার দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করছে। বরং তারা সম্পর্কের নতুন সংজ্ঞা তৈরি করছে—যেখানে একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত সহযোগিতা থাকবে, অন্যদিকে প্রয়োজন অনুযায়ী রাশিয়া বা ইরানের সঙ্গেও সম্পর্ক রাখা হবে। এটি একটি ‘ব্যালান্সিং অ্যাক্ট’, যেখানে প্রতিটি দেশ নিজের সুবিধা সর্বোচ্চ করার চেষ্টা করছে।
এই পরিবর্তনের আরেকটি দিক হলো, জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা বেড়ে যাওয়া। তেলের দাম বাড়ছে, সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে, এবং এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনেও। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এটি আরও বড় চ্যালেঞ্জ, কারণ তাদের অর্থনীতি এই ধরনের ধাক্কা সামলানোর মতো শক্তিশালী নয়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, এশিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি জ্বালানি সংকট নয়; এটি একটি ভূরাজনৈতিক রূপান্তরের সূচনা। এখানে প্রতিটি দেশ নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী নতুন পথ খুঁজছে, পুরোনো জোটের সীমাবদ্ধতা বুঝে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। এই পরিবর্তন কতটা স্থায়ী হবে, তা এখনো বলা কঠিন। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে এখন আর একক কোনো শক্তি নেই; বরং এটি হয়ে উঠছে বহু শক্তির একটি জটিল সমীকরণ, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপই ভবিষ্যতের নতুন দিক নির্ধারণ করছে।
আপনার মতামত জানানঃ