১৯৭১—এই একটি বছরই বাঙালির ইতিহাসকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে। রক্ত, ত্যাগ আর অদম্য সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় একটি স্বাধীন রাষ্ট্র—বাংলাদেশ। এই মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত ছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মিত্র। সীমান্ত খুলে দেওয়া, শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া, সামরিক সহায়তা প্রদান—সব মিলিয়ে ভারত এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু ইতিহাসের পাতা যখন উল্টে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের দিকে তাকানো হয়, তখন একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন ধীরে ধীরে সামনে আসে—এই মিত্রতা কি নিখাদ ছিল, নাকি এর ভেতরে লুকিয়ে ছিল কৌশলগত স্বার্থ, যেখানে লাভের পাল্লা ভারী হয়েছে ভারতের দিকেই?
মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের মাধ্যমে শুধু একটি দেশের জন্ম হয়নি; দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতেও একটি বড় পরিবর্তন ঘটে। পাকিস্তান ভেঙে যাওয়ার মাধ্যমে ভারতের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ দুর্বল হয়ে পড়ে, এবং ভারত নিজেকে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। এই বাস্তবতায় অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ভারতের জন্য শুধু মানবিক বা নৈতিক সমর্থনের বিষয় ছিল না; বরং এটি ছিল একটি কৌশলগত সুযোগ, যার মাধ্যমে ভারত নিজের নিরাপত্তা ও প্রভাবকে বহুগুণে বাড়িয়ে নিতে পেরেছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিঃসন্দেহে বাঙালির সংগ্রামের ফল, কিন্তু সেই সংগ্রামের পরবর্তী ফলাফল কি পুরোপুরি বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে ছিল—এই প্রশ্নই আজকের আলোচনার কেন্দ্রে।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু সামনে আসে—পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দীদের প্রশ্ন। প্রায় ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সেনা ভারতের হাতে বন্দী ছিল। এই যুদ্ধবন্দীরা ছিল একটি শক্তিশালী কূটনৈতিক হাতিয়ার, যার মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধের বিচার আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হতে পারত। কিন্তু শিমলা চুক্তি-এর মাধ্যমে ভারত পাকিস্তানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছে যায়, যেখানে এই বন্দীদের ফেরত দেওয়ার পথ সুগম হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ সীমিত ছিল বলে সমালোচকরা মনে করেন। তাদের যুক্তি—যে যুদ্ধ বাংলাদেশের মাটিতে সংঘটিত হয়েছে, যে অপরাধের শিকার হয়েছে বাংলাদেশের মানুষ, সেই বিচার প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক কূটনীতির খেলায় বাংলাদেশ অনেকটাই প্রান্তিক অবস্থানে থেকে যায়, আর ভারত নিজের বৃহত্তর আঞ্চলিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়।
যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীর দ্রুত বাংলাদেশ ত্যাগকে একদিকে যেমন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান হিসেবে দেখা হয়, অন্যদিকে কিছু বিশ্লেষক এটিকে একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবেও ব্যাখ্যা করেন। তাদের মতে, ভারত দীর্ঘমেয়াদে সরাসরি উপস্থিতি বজায় না রেখে পরোক্ষ প্রভাব বজায় রাখার পথ বেছে নেয়। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক ক্ষেত্রে সেই প্রভাব ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হতে থাকে। স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল ভঙ্গুর, প্রশাসনিক কাঠামো ছিল নবগঠিত, এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের লড়াই চলছিল। এই পরিস্থিতিতে ভারত একটি প্রভাবশালী অবস্থানে ছিল, যা অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়।
এই প্রভাবের একটি বড় উদাহরণ হিসেবে প্রায়ই উল্লেখ করা হয় ফারাক্কা ব্যারেজ-সংক্রান্ত বিরোধ। গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে এই প্রকল্পটি স্বাধীনতার পরপরই দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনার কারণ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, ফারাক্কার কারণে দেশের উত্তরাঞ্চলে পানির প্রবাহ কমে যায়, যার ফলে কৃষি, মৎস্যসম্পদ এবং পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এই ইস্যুটি শুধু একটি পরিবেশগত বা অর্থনৈতিক সমস্যা ছিল না; এটি ছিল দুই দেশের সম্পর্কের ভেতরে লুকিয়ে থাকা স্বার্থের সংঘাতের প্রতিফলন। প্রশ্ন উঠতে থাকে—যে দেশটি মুক্তিযুদ্ধের সময় পাশে দাঁড়িয়েছিল, সেই দেশ কি স্বাধীনতার পরও একইভাবে বাংলাদেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে?
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট একটি ভয়াবহ ট্র্যাজেডি বাংলাদেশের ইতিহাসকে আবারও নাড়িয়ে দেয়। শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ড-এ নিহত হন জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান। এই ঘটনার পর ভারতের প্রতিক্রিয়া ছিল আনুষ্ঠানিক শোক ও নিন্দা। ইন্দিরা গান্ধী গভীর শোক প্রকাশ করেন এবং ঘটনাটিকে দুঃখজনক বলে আখ্যা দেন। কিন্তু এখানেই আবার কিছু প্রশ্ন সামনে আসে, যেগুলো আজও বিতর্কিত এবং স্পষ্ট উত্তরবিহীন।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সে সময়কার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিবেচনায় অনেকেই প্রশ্ন তোলেন—ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা, বিশেষ করে RAW, কি এই ধরনের একটি অভ্যুত্থানের পূর্বাভাস পায়নি? যদি পেয়ে থাকে, তাহলে কেন বাংলাদেশকে সতর্ক করা হয়নি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আজও নিশ্চিতভাবে পাওয়া যায়নি। অধিকাংশ গবেষক ও ইতিহাসবিদ এই ঘটনাকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ষড়যন্ত্রের ফল হিসেবে দেখেন। তবে সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কেউ কেউ মনে করেন, ভারতের নীরবতা অন্তত সন্দেহের জন্ম দেয়, যদিও এর পক্ষে শক্ত প্রমাণ অনুপস্থিত। এই ধোঁয়াশাই ইতিহাসকে আরও জটিল করে তোলে, যেখানে সত্য ও অনুমান একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়।
মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং আন্তর্জাতিক চাপ—সব মিলিয়ে একটি কঠিন বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল। এই বাস্তবতায় ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও, সেই ভূমিকা সবসময় বাংলাদেশের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ভারতের নীতিগুলো তার নিজের জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করেই নির্ধারিত হয়েছে, যেখানে বাংলাদেশের স্বার্থ সবসময় সমান গুরুত্ব পায়নি। তবে এটিও সত্য যে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো দেশই নিছক আবেগ বা বন্ধুত্বের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয় না; প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনেই থাকে কৌশলগত হিসাব-নিকাশ।
এই পুরো আলোচনার মধ্যে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—মুক্তিযুদ্ধের সময়কার মিত্রতা এবং যুদ্ধ-পরবর্তী সম্পর্ক এক জিনিস নয়। যুদ্ধের সময় একটি অভিন্ন লক্ষ্য ছিল—পাকিস্তানের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। কিন্তু স্বাধীনতার পর সেই অভিন্ন লক্ষ্য আর থাকেনি; বরং প্রতিটি দেশ নিজ নিজ স্বার্থ অনুযায়ী পথ চলা শুরু করেছে। এই পরিবর্তনই সম্পর্কের ভেতরে টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছে, যা আজও বিভিন্ন ইস্যুতে প্রতিফলিত হয়।
তাই প্রশ্নটি সরল নয়, এবং এর উত্তরও একমাত্রিক নয়। ভারত কি বাংলাদেশের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছে—এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর হয়তো দেওয়া সম্ভব নয়। তবে এটুকু বলা যায় যে, ভারতের নীতিগুলো সবসময় বাংলাদেশের প্রত্যাশা পূরণ করেনি, এবং অনেক ক্ষেত্রে ভারতের লাভই বেশি হয়েছে বলে মনে হয়। এই বাস্তবতাকে বুঝতে হলে আবেগ নয়, বরং ইতিহাসের ঘটনাগুলোকে ঠান্ডা মাথায় বিশ্লেষণ করতে হবে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা একটি গৌরবময় অর্জন, যা কোনোভাবেই খাটো করা যায় না। কিন্তু সেই স্বাধীনতার পরবর্তী পথচলায় যে জটিলতা, যে অসমতা এবং যে প্রশ্নগুলো তৈরি হয়েছে, সেগুলোও উপেক্ষা করা যায় না। ইতিহাসের এই ধূসর অঞ্চলগুলোই আমাদের ভাবতে বাধ্য করে—মিত্রতা কি সত্যিই নিঃস্বার্থ হতে পারে, নাকি প্রতিটি মিত্রতার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে স্বার্থের এক অদৃশ্য হিসাব?
আপনার মতামত জানানঃ