
বিশ্ব যত এগোচ্ছে, প্রযুক্তি যত মানুষের জীবনকে সহজ করছে, ঠিক ততই ইন্টারনেটের অন্ধকার দিকগুলো আরও ভয়ংকর হয়ে উঠছে—এমনই এক শিউরে ওঠার মতো বাস্তবতা সামনে এনেছে সাম্প্রতিক অনুসন্ধান। একবিংশ শতাব্দীর এই যুগে, যেখানে আমরা নিরাপত্তা, সচেতনতা এবং মানবাধিকারের কথা বলি, সেখানে পৃথিবীর নানা প্রান্তে গড়ে উঠেছে এমন এক বিকৃত অনলাইন নেটওয়ার্ক, যা নারীর প্রতি সহিংসতাকে শুধু উৎসাহিতই করছে না, বরং তা শেখানোর মতো পর্যায়ে নিয়ে গেছে। এই ভয়াবহ বাস্তবতাকে অনেকেই বলছেন—একটি বৈশ্বিক ‘রেপ একাডেমি’।
ঘটনার সূত্রপাত একক কোনো দেশ বা ব্যক্তি দিয়ে নয়, বরং একাধিক দেশের নানা বিচ্ছিন্ন ঘটনা একত্রিত হয়ে যে ভয়াবহ চিত্র তৈরি করেছে, তা মানবসভ্যতার জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ। ফ্রান্সে সংঘটিত ডমিনিক পেলিকটের ঘটনা বিশ্বকে প্রথমবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়, কীভাবে একজন স্বামী নিজের স্ত্রীকে বছরের পর বছর মাদক প্রয়োগ করে অচেতন করে রেখে অপরিচিত পুরুষদের দিয়ে ধর্ষণ করাতে পারে। এটি ছিল শুধু একটি অপরাধ নয়—বরং একটি সংগঠিত, পরিকল্পিত এবং প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধচক্রের অংশ।
এই ঘটনার পর অনেকে ভেবেছিলেন, হয়তো এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কিন্তু পরবর্তীতে অনুসন্ধানে উঠে আসে আরও ভয়ংকর সত্য—এটি কোনো একক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কাজ নয়, বরং ইন্টারনেটের অন্ধকার জগতে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য মানুষের মধ্যে একটি বিকৃত কমিউনিটি গড়ে উঠেছে, যেখানে তারা একে অপরকে শেখাচ্ছে কীভাবে নারীদের অচেতন করে যৌন নির্যাতন করতে হয়, কীভাবে সেই ভিডিও ধারণ করতে হয় এবং কীভাবে তা থেকে অর্থ উপার্জন করা যায়।
এই চক্রের একটি বড় অংশ পরিচালিত হচ্ছে বিভিন্ন পর্নোগ্রাফি ওয়েবসাইট এবং এনক্রিপ্টেড মেসেজিং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে। বিশেষ করে কিছু সাইটে হাজার হাজার ভিডিও পাওয়া গেছে, যেগুলো ‘স্লিপ কনটেন্ট’ নামে পরিচিত। এসব ভিডিওতে দেখা যায়, নারীরা ঘুমন্ত বা অচেতন অবস্থায় রয়েছে, আর সেই সুযোগে তাদের ওপর চালানো হচ্ছে যৌন নির্যাতন। ভিডিওগুলোর সঙ্গে যুক্ত থাকে বিভিন্ন ট্যাগ—যেমন ‘পাসডআউট’ বা ‘আইচেক’—যা নির্দেশ করে, ভুক্তভোগী সম্পূর্ণ অচেতন কি না।
এই ‘আইচেক’ ভিডিওগুলো বিশেষভাবে ভয়ংকর। এতে দেখা যায়, পুরুষেরা নারীর চোখের পাতা তুলে পরীক্ষা করছে—সে সত্যিই অচেতন কি না। এই প্রক্রিয়াটি শুধু একটি বিকৃত কৌতূহল নয়, বরং এটি একটি ‘টেকনিক’, যা তারা একে অপরকে শেখাচ্ছে। অর্থাৎ এখানে অপরাধ শুধু সংঘটিত হচ্ছে না, বরং তা পদ্ধতিগতভাবে শেখানো এবং ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
এ ধরনের গ্রুপগুলোতে শুধু ভিডিও শেয়ারই হয় না, বরং বিস্তারিত আলোচনা হয়—কোন ওষুধ ব্যবহার করলে মানুষ দ্রুত অচেতন হবে, কত ডোজ নিরাপদ (অপরাধীর দৃষ্টিতে), কীভাবে তা খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া যায়, এমনকি কীভাবে সন্দেহ এড়ানো যায়। এই আলোচনাগুলো থেকে বোঝা যায়, এটি কোনো হঠাৎ আবেগের অপরাধ নয়—বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত, ঠান্ডা মাথার অপরাধ।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এই অপরাধগুলো অনেক ক্ষেত্রেই ঘটছে ঘরের ভেতর, পরিচিত মানুষের মাধ্যমে। ভুক্তভোগীরা অধিকাংশ সময় বুঝতেই পারেন না, তাঁদের সঙ্গে কী ঘটছে। অনেক নারী জানিয়েছেন, তাঁরা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়তেন, অস্বাভাবিকভাবে ঘুমিয়ে যেতেন, সকালে উঠে শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখতে পেতেন—কিন্তু কখনোই পুরো ঘটনার স্মৃতি মনে করতে পারতেন না। ফলে দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা নিজেকেই সন্দেহ করতেন, ভাবতেন হয়তো এটি তাঁদের মানসিক সমস্যা।
একজন ব্রিটিশ নারী জানান, বহু বছর সংসার করার পর তিনি জানতে পারেন, তাঁর স্বামী নিয়মিত তাঁর খাবারের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দিতেন এবং অচেতন অবস্থায় তাঁকে নির্যাতন করতেন। এই সত্য জানার পর তাঁর পুরো জীবন ভেঙে পড়ে। তিনি বলেন, “আমরা বাইরের মানুষকে ভয় পাই, কিন্তু সবচেয়ে কাছের মানুষটিই যে এমন হতে পারে, তা কখনো ভাবিনি।”
আরেকজন নারী পাঁচ বছর ধরে একই ধরনের অভিজ্ঞতার শিকার হন। তিনি বারবার অসুস্থ হয়ে পড়তেন, শরীরে দাগ নিয়ে জেগে উঠতেন, কিন্তু তাঁর স্বামী সবকিছু অস্বীকার করতেন এবং তাঁকে ‘পাগল’ বলে উড়িয়ে দিতেন। পরে যখন তিনি প্রমাণ পান, তখনও তাঁকে বিশ্বাস করতে চায়নি অনেকেই। এটি শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়—বরং একটি সামাজিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।
এই অপরাধচক্রের আরেকটি দিক হলো অর্থনৈতিক লাভ। অনেক অপরাধী তাঁদের অপরাধ লাইভ স্ট্রিমিংয়ের মাধ্যমে প্রচার করে এবং দর্শকদের কাছ থেকে অর্থ নেয়। এই অর্থ লেনদেনের জন্য ব্যবহার করা হয় ক্রিপ্টোকারেন্সি, যাতে সহজে শনাক্ত করা না যায়। ফলে এই অপরাধ শুধু বিকৃত মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ নয়—বরং এটি একটি লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলধারার কিছু পর্নোগ্রাফিক কনটেন্টও এই ধরনের সহিংসতাকে স্বাভাবিক করে তুলছে। যখন মানুষ নিয়মিত এমন কনটেন্ট দেখে, তখন তাদের কাছে সম্মতি এবং অসম্মতির সীমারেখা ঝাপসা হয়ে যায়। ফলে তারা বাস্তব জীবনে সেই বিকৃত ধারণাগুলো প্রয়োগ করতে শুরু করে।
আইনগত দিক থেকেও এই সমস্যার সমাধান সহজ নয়। অনেক দেশে এমন আইন রয়েছে, যা অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোকে ব্যবহারকারীদের আপলোড করা কনটেন্টের জন্য সরাসরি দায়মুক্তি দেয়। ফলে এসব সাইট সহজেই নিজেদের দায় এড়িয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইনি জটিলতা, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং অপরাধীদের গোপনীয়তা রক্ষা করার কৌশল—সব মিলিয়ে এই চক্র ভাঙা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, মাদক প্রয়োগের মাধ্যমে যৌন নির্যাতনের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ করা প্রায় অসম্ভব। কারণ অধিকাংশ ভুক্তভোগী লজ্জা, ভয় বা স্মৃতিভ্রংশের কারণে অভিযোগই করেন না। অনেক ক্ষেত্রে তারা বুঝতেই পারেন না যে তারা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। আবার যারা অভিযোগ করেন, তারাও সবসময় যথাযথ সহায়তা পান না—কারণ পুলিশ ও চিকিৎসা ব্যবস্থার মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে।
এই পরিস্থিতি শুধু নারীদের জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্য একটি বড় হুমকি। যখন ঘরের ভেতর, বিশ্বাসের সম্পর্কের মধ্যে এমন অপরাধ ঘটে, তখন তা সামাজিক বন্ধনকেই ভেঙে দেয়। এটি মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি করে, নিরাপত্তাহীনতা বাড়ায় এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
তবে এই অন্ধকারের মধ্যেও কিছু আলোর দিক রয়েছে। কিছু ভুক্তভোগী সাহস করে সামনে এসে তাঁদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করছেন, অভিযোগ করছেন এবং অন্যদের সচেতন করছেন। তাঁদের এই সাহসই অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে উঠছে। তারা দেখিয়ে দিচ্ছেন, লজ্জা ভুক্তভোগীর নয়—বরং অপরাধীর।
এই সমস্যার সমাধানে প্রয়োজন বহুমুখী উদ্যোগ। প্রথমত, আইন আরও কঠোর করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে, যাতে এই ধরনের অপরাধচক্র ভেঙে ফেলা যায়। দ্বিতীয়ত, অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে এবং সন্দেহজনক কনটেন্ট দ্রুত সরিয়ে ফেলতে হবে। তৃতীয়ত, সমাজে সচেতনতা বাড়াতে হবে—বিশেষ করে সম্মতি, সম্পর্কের নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল আচরণ সম্পর্কে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়ানো। তাদের কথা শোনা, বিশ্বাস করা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া। কারণ একটি সমাজের মানবিকতা যাচাই হয়, সে কীভাবে তার সবচেয়ে দুর্বল মানুষদের সঙ্গে আচরণ করে।
এই বৈশ্বিক ‘রেপ একাডেমি’ শুধু একটি অপরাধচক্র নয়—এটি আমাদের সময়ের একটি ভয়ংকর বাস্তবতা, যা আমাদের চোখ খুলে দেয়। এটি আমাদের বাধ্য করে ভাবতে—প্রযুক্তি আমরা কীভাবে ব্যবহার করছি, আমাদের মূল্যবোধ কোথায় যাচ্ছে এবং আমরা কীভাবে একটি নিরাপদ, মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে পারি।
আপনার মতামত জানানঃ