
একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী বিদেশে যেতে চাইলে রাষ্ট্র তাঁর কাছে কী জানতে চাইবে? পরিচয়, প্রয়োজনীয় ভ্রমণ নথি ও যাত্রার উদ্দেশ্য, নাকি তিনি বিবাহিত কি না এবং তাঁর পরিবার অনুমতি দিয়েছে কি না? প্রশ্নের এই পার্থক্যের মধ্যেই নাগরিক হিসেবে নারীকে দেখার দুটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি আছে। একটি তাঁকে নিজ সিদ্ধান্তের দায়িত্ব বহনকারী মানুষ হিসেবে দেখে। অন্যটি ধরে নেয়, তাঁর সিদ্ধান্তের বৈধতা অন্য কারও সম্মতির ওপর নির্ভর করে।
ঢাকার বিমানবন্দরে তিন প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে নেপাল যেতে না দেওয়ার অভিযোগ এই পার্থক্য সামনে এনেছে। তাঁদের আইনজীবীর ভাষ্য অনুযায়ী, ৮ আগস্ট তাঁরা প্রয়োজনীয় ভ্রমণ নথি নিয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যান। ইমিগ্রেশনে তাঁদের বৈবাহিক অবস্থা ও পরিবারের সম্মতি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত যেতে দেওয়া হয়নি।
২৯ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট জানতে চেয়ে রুল দিয়েছেন, বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও তাঁদের বিদেশযাত্রায় বাধা দেওয়া কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না। আদালত অভিযোগ তদন্ত ও নিষ্পত্তির নির্দেশও দিয়েছেন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে আইনগত ভিত্তি ছাড়া তাঁদের ভবিষ্যৎ বিদেশযাত্রা বাধাগ্রস্ত না করার নির্দেশের কথাও এসেছে।
ঘটনাটিকে তাই শুধু তিনজন যাত্রীর ফ্লাইট মিস করার অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখলে তার রাজনৈতিক তাৎপর্য কমে যায়। অভিযোগ সত্য হলে প্রশ্ন উঠবে, ইমিগ্রেশন ডেস্কে একজন নারীর পাসপোর্টের পাশাপাশি কেন তাঁর সামাজিক অনুমোদনও যাচাই করা হচ্ছিল? রাষ্ট্রের চোখে তাঁর প্রাপ্তবয়স্ক পরিচয় কি সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য যথেষ্ট ছিল না?
ডয়চে ভেলের বাংলা প্রতিবেদনের পরিচিতিতে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের উদ্বেগ তুলে ধরে বলা হয়েছে, নীতি পুলিশিং বাড়ছে। এটি একটি অধিকার সংগঠনের মূল্যায়ন। এই একটি ঘটনা বা কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে দেশজুড়ে ঘটনার হার কতটা বেড়েছে, তা নির্ধারণ করা যায় না। তবে উদ্বেগটি গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখার কারণ আছে: নাগরিকের বৈধ অধিকার প্রয়োগের সময় কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সামাজিক বা ধর্মীয় ধারণা কোনো অলিখিত শর্ত হয়ে উঠছে কি না।
এখানে নীতি পুলিশিং বলতে রাষ্ট্রের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি যখন আইন প্রয়োগের বদলে নিজের ধারণা বা বিশ্বাস অনুযায়ী অন্যের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ন্ত্রণ করতে চান, সেই আচরণকে বোঝানো হচ্ছে। কে একা যাবেন, কার পরিবার জানে, অবিবাহিত অবস্থায় কোন ভ্রমণ মানানসই—এসব প্রশ্ন সামাজিক কথোপকথনে যেমনই থাকুক, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ভিত্তি করতে হলে প্রাসঙ্গিক আইনগত যুক্তি দেখাতে হবে।
কারণ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত মত এবং সরকারি ক্ষমতা সমান নয়। একজন ব্যক্তি নারীর স্বাধীন ভ্রমণ অপছন্দ করতে পারেন। কিন্তু ইমিগ্রেশন ডেস্কে বসে সেই অপছন্দ দিয়ে যাত্রা আটকে দিলে তা নাগরিকের অধিকার, সময় ও অর্থের ওপর প্রভাব ফেলে। তখন মতটি আর ব্যক্তিগত থাকে না; ক্ষমতার মাধ্যমে কার্যকর বাধায় পরিণত হয়।
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮ অনুচ্ছেদে শুধু লিঙ্গসহ নির্দিষ্ট পরিচয়ের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই অনুচ্ছেদ রাষ্ট্র ও জনজীবনের সব ক্ষেত্রে নারীর সঙ্গে পুরুষের সমান অধিকারের কথা বলে। ৩৬ অনুচ্ছেদ নাগরিকের দেশত্যাগ ও দেশে ফেরার অধিকার স্বীকার করে, তবে জনস্বার্থে আইন দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বিধিনিষেধের শর্তও রাখে।
এই সাংবিধানিক কাঠামো থেকে দুটি কথা একসঙ্গে মনে রাখতে হয়। বিদেশযাত্রার অধিকার আছে; আবার আইনসম্মত বাধা বা যাচাইও থাকতে পারে। কিন্তু ‘কর্মকর্তার সন্দেহ হয়েছে’ বলা মাত্র সব সিদ্ধান্ত যুক্তিসংগত হয়ে যায় না। কোন তথ্য সন্দেহের ভিত্তি, কোন নিয়ম প্রযোজ্য এবং কেন সেই পরিস্থিতিতে ভ্রমণ বন্ধ করা প্রয়োজন—এসবের ব্যাখ্যা গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু অবিবাহিত হওয়া থেকে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক নারীর ভ্রমণের উদ্দেশ্য সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্ত টানা যায় না। বিবাহিত মানুষও পাচারের ঝুঁকিতে থাকতে পারেন, আর অবিবাহিত মানুষ বৈধ কাজে বা অবকাশে ভ্রমণ করতে পারেন।
পারিবারিক সঙ্গী উপস্থিত থাকাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নয়। সামাজিক পরিচয়কে ঝুঁকির চূড়ান্ত প্রমাণ বানালে প্রকৃত ঝুঁকি শনাক্ত করার কাজও দুর্বল হতে পারে।
অন্যদিকে মানব পাচারের আশঙ্কা অস্বীকার করাও দায়িত্বশীল অবস্থান নয়। ১ অক্টোবর শেয়ার বিজনেস২৪-এর প্রতিবেদনে নাম প্রকাশ না করা পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্য হিসেবে নেপাল রুটে পাচারের বিষয়ে সতর্কতা এবং ওই তিন নারীর আমন্ত্রণপত্র দেখাতে না পারার দাবি এসেছে। একই প্রতিবেদনে পুলিশ সদর দপ্তরের গণমাধ্যম শাখার কর্মকর্তা এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইনের বক্তব্য হিসেবে বিষয়টি বিচারাধীন থাকায় মন্তব্য না করার কথা বলা হয়েছে।
এই ব্যাখ্যার দুটি সীমা আছে। আমন্ত্রণপত্রসংক্রান্ত দাবিটি নাম প্রকাশ না করা কর্মকর্তাদের; এটি তদন্তের সিদ্ধান্ত নয়। আবার কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ্য ব্যাখ্যা না পাওয়া মানে অভিযোগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণিত হওয়াও নয়। প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট যাত্রার নথি, কর্মকর্তাদের রেকর্ড, প্রশ্নের ধরন এবং সিদ্ধান্তের কারণ যাচাই করা।
যাচাইয়ে কোনো নথিগত সমস্যা পাওয়া গেলে তা নির্দিষ্ট করে বলতে হবে। কোনো ঝুঁকির বিশ্বাসযোগ্য তথ্য থাকলে তার ভিত্তিতে আইনসম্মত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু সেমিনারের নথি যাচাইয়ের প্রয়োজন এবং অবিবাহিত হওয়ার বিষয়ে আপত্তি একই প্রশ্ন নয়। একটি যুক্তি দিয়ে অন্য ধরনের আচরণের জবাব এড়িয়ে গেলে অভিযোগের আসল বিষয় অনির্ধারিত থেকে যাবে।
‘নারীর নিরাপত্তার জন্য’ যুক্তিটিও পরীক্ষা করা দরকার। সুরক্ষা এমন ব্যবস্থা হওয়া উচিত, যা মানুষের স্বাধীনতা বজায় রেখে ঝুঁকি কমায়। পাচারের লক্ষণ শনাক্ত করা, গোপনে যাত্রীর বক্তব্য নেওয়ার সুযোগ রাখা কিংবা প্রতারণার তথ্য যাচাই করা সুরক্ষার কাজ। কিন্তু নারী বলে তাঁকে স্বাভাবিকভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অক্ষম ধরে নেওয়া সুরক্ষা ও নিয়ন্ত্রণের সীমা মিশিয়ে দেয়।
অভিভাবককে ফোন করার প্রশ্নেও একই সতর্কতা প্রয়োজন। কোনো বিশেষ ঝুঁকির ঘটনায় তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজন এবং সব প্রাপ্তবয়স্ক নারীর ভ্রমণের জন্য পরিবারের অনুমোদন চাওয়া এক বিষয় নয়। পরিবারের সদস্য নাগরিকের পছন্দ সম্পর্কে আপত্তি জানালেই কি আইনসম্মত যাত্রা বন্ধ হবে? এমন অলিখিত নিয়ম তৈরি হলে স্বাধীনতার কার্যকর মালিক হয়ে যাবে পরিবার, নাগরিক নিজে নয়।
এই সমস্যা কেবল অবিবাহিত নারীর নয়। একজন বিবাহিত নারীকে স্বামীর অনুমতি দেখাতে বলা হলে তাঁর স্বাধীনতাও অন্যের সম্মতির অধীন হয়। তাই সমাধান হিসেবে ‘বিবাহিত প্রমাণ’ বা ‘অভিভাবক সঙ্গে নেওয়া’কে স্বাভাবিক করে তোলা উচিত নয়। মূল প্রশ্নটি হলো, প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের নাগরিক অধিকারের ওপর এমন আলাদা শর্তের আইনগত ভিত্তি কী।
অর্থনৈতিক ক্ষতির বিষয়টিও অবহেলা করা যায় না। আইনজীবীর বক্তব্য অনুযায়ী, তিন নারী টিকিট ও অন্যান্য বুকিংয়ে আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছেন। তাঁরা অভিযোগ ও আইনি নোটিশে সাড়া না পেয়ে রিট করেছেন বলেও আইনজীবী জানিয়েছেন। ক্ষতির সুনির্দিষ্ট অঙ্ক যাচাই না করে বলা যাবে না। তবে অন্যায়ভাবে কোনো যাত্রা আটকে গেলে তার খরচ শুধু বিমানভাড়া নয়; কর্মশালা, চাকরি, শিক্ষা বা পেশাগত যোগাযোগের সুযোগও হারাতে পারে।
এ ধরনের অভিজ্ঞতার সম্ভাব্য প্রভাব বিমানবন্দরের বাইরেও যায়। অন্য নারীরা যদি মনে করেন, প্রয়োজনীয় নথি থাকলেও ব্যক্তিগত প্রশ্নে যাত্রা আটকে যেতে পারে, তাহলে তাঁরা ভ্রমণ পরিকল্পনা বদলাতে পারেন। কেউ অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে সঙ্গী নিতে পারেন, কেউ সুযোগ ছেড়ে দিতে পারেন। একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত তখন অন্য মানুষের সিদ্ধান্তেও অনিশ্চয়তার প্রভাব ফেলতে পারে। এটি সম্ভাব্য প্রভাবের বিশ্লেষণ, পরিমাপ করা ক্ষতির হিসাব নয়।
আদালতে যাওয়ার সুযোগ থাকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রতিটি যাত্রীকে নিজের প্রাপ্তবয়স্ক স্বাধীনতা প্রমাণ করতে আদালতে যেতে হলে প্রশাসনিক ব্যবস্থার সমস্যা থেকেই যায়। মামলা করার সময়, অর্থ ও সহায়তা সবার থাকে না। অধিকার এমনভাবে কার্যকর হতে হবে, যাতে তা ব্যবহার করার জন্য আগে একটি ব্যয়বহুল বিরোধ জিততে না হয়।
প্রথম প্রয়োজন হলো স্পষ্ট ও প্রকাশ্য নির্দেশনা। কোন ক্ষেত্রে অতিরিক্ত যাচাই হবে, কোন ভিত্তিতে যাত্রা বন্ধ করা যাবে এবং সিদ্ধান্তের কারণ কীভাবে নথিভুক্ত হবে—এসব কর্মকর্তা ও যাত্রী উভয়ের কাছে পরিষ্কার থাকা দরকার। নির্দেশনা শুধু একটি ঘটনার প্রতিক্রিয়া হলে চলবে না; ডেস্কে প্রতিদিনের সিদ্ধান্তে তার প্রভাব থাকতে হবে।
দ্বিতীয় প্রয়োজন দ্রুত পর্যালোচনার সুযোগ। ফ্লাইটের সময়সীমার মধ্যে যাত্রীর আপত্তি শোনার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ব্যবস্থা থাকা উচিত। ভুল সিদ্ধান্ত হলে কয়েক সপ্তাহ পরে তা স্বীকার করার চেয়ে যাত্রার আগেই সংশোধন করা বেশি কার্যকর। নিরাপত্তা যাচাইয়ের প্রয়োজনীয় সময় ও নাগরিকের ওপর অপ্রয়োজনীয় বিলম্বের সীমা বোঝার জন্য তথ্যও রাখতে হবে।
তৃতীয় প্রয়োজন অভিযোগের প্রমাণ সংরক্ষণ ও ফল জানানো। সংশ্লিষ্ট রেকর্ড, সিসিটিভি এবং সিদ্ধান্তের কারণ যাচাই করে অভিযোগের নিষ্পত্তি করা দরকার। অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হলে দায়িত্ব নির্ধারণ, প্রযোজ্য ব্যবস্থা এবং ক্ষতি প্রতিকারের পথ বিবেচনা করতে হবে। অভিযোগের সমর্থন না মিললে সেই সিদ্ধান্তের ভিত্তিও স্পষ্ট হতে হবে। জবাবদিহি মানে অভিযোগের পক্ষে আগেই রায় দেওয়া নয়; যাচাইযোগ্য উত্তর দেওয়া।
শেষ পর্যন্ত এই ঘটনা রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন তোলে। রাষ্ট্র কি নারীর নিরাপদ ও স্বাধীন চলাচলের পরিবেশ তৈরি করবে, নাকি তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের অনুমোদনকারী হয়ে বসবে? অধিকার ও নিরাপত্তার মধ্যে অযথা বিরোধ তৈরি না করে আইনভিত্তিক, তথ্যনির্ভর ও বৈষম্যহীন যাচাইয়ের পথই দরকার।
তিন নারীর অভিযোগের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনো এই লেখার জন্য যাচাই করা যায়নি। কিন্তু যে প্রশ্নটি উঠে এসেছে, তার উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই: একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে রাষ্ট্র প্রথমে স্বাধীন নাগরিক হিসেবে দেখবে, নাকি কারও স্ত্রী বা কন্যা হিসেবে? নাগরিকত্বের সমতা কার্যকর হয় তখনই, যখন একটি ইমিগ্রেশন ডেস্কেও সেই প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট থাকে।
আপনার মতামত জানানঃ