
নির্বাচনের প্রতি আস্থা মানে শুধু ভোটের দিন কেন্দ্রে যাওয়া নয়। আস্থা মানে ভোটার বিশ্বাস করবেন, তাঁর পছন্দ গোপন থাকবে, তাঁর ভোট যথাযথভাবে গণনা হবে এবং ফল তাঁর মতামতকে প্রতিফলিত করবে। প্রার্থী বিশ্বাস করবেন, প্রতিদ্বন্দ্বী সরকারি ক্ষমতার বাড়তি সুবিধা পাবেন না। আর পরাজিত পক্ষ বুঝতে পারবে, ফল নিয়ে আপত্তি থাকলে তা যাচাই ও প্রতিকারের বিশ্বাসযোগ্য পথ আছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার এই আস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হতে পারে। কিন্তু সরকারের নাম বদলালেই নির্বাচনের পুরো পরিবেশ বদলে যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
৬ অক্টোবর জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকবে এমন একটি তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা গড়তে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নেওয়া হচ্ছে। প্রধান ও সদস্যদের বাছাইপদ্ধতি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ভবিষ্যতে ব্যবস্থাটি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গণভোটের প্রয়োজন হবে—এমন বিধান রাখার কথাও তিনি বলেছেন। এগুলো আলোচিত পরিকল্পনা ও মন্ত্রীর বক্তব্য; সবকিছু ইতিমধ্যে চূড়ান্তভাবে কার্যকর হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যাবে না।
এই আলোচনার আইনি প্রেক্ষাপটও স্পষ্ট করা জরুরি। ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বরের আপিল বিভাগের রায়ে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্ত তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার বিধান পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে, এর প্রয়োগ ভবিষ্যৎমুখী এবং সংসদ ভেঙে যাওয়াসংক্রান্ত নির্ধারিত শর্তের সঙ্গে যুক্ত। সেখানে ত্রয়োদশ সংসদের মেয়াদ শেষে বা আগেই বিলুপ্ত হলে ব্যবস্থা সক্রিয় হওয়ার ব্যাখ্যা রয়েছে। ফলে আদালতের রায়ে বিধানের পুনরুজ্জীবন এবং সংসদে নতুন গঠনপদ্ধতি ও সুরক্ষা নিয়ে আলোচনা—দুটি সম্পর্কিত হলেও পৃথক বিষয়।
বাংলাদেশে এই ব্যবস্থার আকর্ষণের কারণ বোঝা কঠিন নয়। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী সরকারই যদি প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্বাহী কর্তৃত্ব ধরে রাখে, তাহলে বিরোধী পক্ষ তার নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ করতে পারে। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার মূল যুক্তি হলো, প্রতিযোগিতার সময়ে নির্বাহী ক্ষমতাকে প্রতিদ্বন্দ্বী দলের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থেকে সরানো। এই যুক্তি ভোটের দিনকে ঘিরে উদ্বেগ কমাতে পারে। তবে উদ্বেগ কমা এবং প্রতিষ্ঠান নিরপেক্ষ হওয়া এক জিনিস নয়।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৯৬ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ব্যবস্থাটি সাংবিধানিক রূপ পায়। ২০১১ সালে আদালতের রায় ও পঞ্চদশ সংশোধনীর ধারাবাহিকতায় তা বিলুপ্ত হয়। এই ইতিহাস দেখায়, নির্বাচনকালীন ব্যবস্থার প্রশ্ন বারবার আদালত, সংসদ ও রাজনৈতিক আন্দোলনের সংযোগস্থলে ফিরে এসেছে। তাই বর্তমান আলোচনা কেবল একটি পুরোনো বিধান ফিরিয়ে আনার কাজ নয়; অতীতের বিরোধ থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের নিয়মকে গ্রহণযোগ্য করারও পরীক্ষা।
সেই পরীক্ষার প্রথম প্রশ্ন: তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানকে বেছে নেবেন কে? কোনো ব্যক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে দলের সদস্য নন বলেই সব পক্ষ তাঁকে নিরপেক্ষ মনে করবে না। তাঁর আগের দায়িত্ব, প্রকাশ্য অবস্থান, আর্থিক সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে আপত্তি উঠলে তা যাচাইয়ের পথ কী হবে, সেটিও জানা দরকার। নিরপেক্ষতা কেবল ব্যক্তিগত সুনামের ওপর দাঁড়ালে একজন মানুষকে নিয়ে বিরোধেই পুরো ব্যবস্থা আটকে যেতে পারে।
তাই বাছাইয়ের নিয়ম আগে থেকে প্রকাশ্য ও নির্দিষ্ট হওয়া প্রয়োজন। যোগ্যতার মানদণ্ড, প্রস্তাব দেওয়ার সুযোগ, আপত্তি জানানোর সময় এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পদ্ধতি স্পষ্ট থাকতে হবে। নির্বাচনের কাছাকাছি এসে নিজেদের পছন্দমতো নিয়ম বদলানোর সুযোগ থাকলে সন্দেহ থেকেই যাবে। আবার কোনো একটি পক্ষের আপত্তিতে অনির্দিষ্টকাল প্রক্রিয়া থেমে যাওয়ার সুযোগও রাখা যাবে না। সম্মতি অর্জনের চেষ্টা এবং অচলাবস্থা কাটানোর গ্রহণযোগ্য বিধান—দুটিই প্রয়োজন।
দ্বিতীয় প্রশ্ন নির্বাচন কমিশনকে নিয়ে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকলেও নির্বাচন কমিশনকে নিজস্ব দায়িত্ব স্বাধীনভাবে পালনের সক্ষমতা দিতে হবে। ভোটার তালিকা, প্রার্থীসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত, নির্বাচনী আচরণ, কেন্দ্রের ব্যবস্থাপনা এবং ফল প্রকাশে কমিশনের কর্তৃত্ব অস্পষ্ট হলে নির্বাহী সরকারের নির্দলীয় পরিচয় তা পূরণ করবে না। নির্বাচনকালীন সরকার কমিশনকে সহায়তা করবে, কিন্তু রাজনৈতিক চাপের জায়গায় নির্বাহী নির্দেশ বসালে স্বাধীনতার প্রশ্ন থেকেই যায়।
তৃতীয় প্রশ্ন প্রশাসনের আচরণ। শীর্ষ নেতৃত্ব বদলালেও মাঠপর্যায়ে যাঁরা দায়িত্ব পালন করবেন, তাঁদের কাজের ধরন রাতারাতি বদলে যায় না। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, পেশাগত পদোন্নতির প্রত্যাশা কিংবা আগে থেকে গড়ে ওঠা সম্পর্ক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই দায়িত্ব বণ্টন, বদলি, নির্বাচনী অভিযোগে ব্যবস্থা এবং পুলিশি হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে প্রকাশ্য মানদণ্ড দরকার। যে নিয়ম এক দলের ক্ষেত্রে কার্যকর, অন্য দলের ক্ষেত্রেও সেটি কার্যকর হচ্ছে কি না—আস্থা তৈরি হবে তা দেখেই।
চতুর্থ প্রশ্ন প্রতিযোগিতার সুযোগ। ভোটের দিন শান্তিপূর্ণ হলেও প্রার্থীরা যদি আগে সমানভাবে সভা করতে, প্রচার চালাতে বা ভোটারের কাছে পৌঁছাতে না পারেন, তাহলে নির্বাচন নিয়ে সংশয় কাটবে না। রাজনৈতিক অভিযোগ ও অপরাধের অভিযোগও পৃথকভাবে যাচাই করতে হবে। আইন প্রয়োগ হবে প্রমাণ ও ন্যায্য প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে; নির্বাচনী পরিচয় কাউকে দায়মুক্তি দেবে না, আবার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হওয়াও শাস্তির ভিত্তি হতে পারে না। প্রতিযোগিতার এই পরিবেশ তৈরির কাজ ভোটের অনেক আগে শুরু হয়।
এই জায়গায় অর্থের প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাহী সরকার নির্দলীয় হলেও অস্বচ্ছ ব্যয়, স্থানীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ভোটের প্রতিযোগিতাকে অসম করতে পারে। নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব জমা দেওয়ার সঙ্গে সেই হিসাব যাচাইয়ের সক্ষমতা প্রয়োজন। শুধু দুর্বল প্রার্থীর ব্যয় পরীক্ষা করে প্রভাবশালী প্রার্থীর ক্ষেত্রে চোখ বন্ধ রাখলে তত্ত্বাবধায়ক পরিচয় থেকেও আস্থা আসবে না। নিয়মের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করে তার সমান প্রয়োগে।
পঞ্চম প্রশ্ন ভোট গণনা ও ফল যাচাই। ভোটারকে শুধু বলা যথেষ্ট নয় যে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। কেন্দ্রভিত্তিক ফল, সংশ্লিষ্ট নথি এবং আপত্তি নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া এমনভাবে পরিচালিত হওয়া দরকার, যাতে প্রার্থী ও পর্যবেক্ষকেরা তা পরীক্ষা করতে পারেন। একই সঙ্গে ভোটারের গোপনীয়তা অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। আস্থার সবচেয়ে শক্ত ভিত্তি এমন একটি প্রক্রিয়া, যার যথার্থতা ক্ষমতাবান ব্যক্তির আশ্বাস ছাড়াও যাচাই করা যায়।
সংবাদমাধ্যম ও পর্যবেক্ষকদের স্বাধীনতা সেই যাচাইয়ের অংশ। কোথাও অনিয়মের অভিযোগ উঠলে সাংবাদিককে নিরাপদে তথ্য সংগ্রহ করতে দিতে হবে। পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি প্রচারের উপকরণ হয়ে থাকলে লাভ সীমিত। তাঁরা কী দেখতে পারবেন, কীভাবে অভিযোগ জানাবেন এবং তাঁদের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব স্পষ্ট থাকা দরকার। সমালোচনাকে নির্বাচনের ভাবমূর্তি নষ্ট করার চেষ্টা হিসেবে দেখলে সমস্যার তথ্যই আড়ালে থেকে যাবে।
তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারেরও ক্ষমতার সীমা থাকতে হবে। বাংলাদেশের ২০০৭–০৮ সালের অভিজ্ঞতায় সেনাসমর্থিত সরকারের অধীনে জরুরি শাসন প্রায় দুই বছর চলেছিল। সেই ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়, সাময়িক নির্বাচনকালীন ব্যবস্থাকে দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিচালনায় পরিণত হওয়ার সুযোগ দেওয়া বিপজ্জনক।
এ কারণে মেয়াদ, দায়িত্ব এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের নিয়ম স্পষ্ট হওয়া জরুরি। নির্বাচন সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত পরিবর্তনের পার্থক্য থাকতে হবে। ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে সময় বাড়ানোর প্রয়োজন হলে কে অনুমোদন দেবেন, কী কারণ দেখাতে হবে এবং কোন তদারকি থাকবে—আগেই নির্ধারণ করা প্রয়োজন। নির্বাচনের রক্ষক নিজেই অনির্দিষ্ট ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠলে আস্থার সংকট নতুন রূপ নেবে।
গণভোটের মাধ্যমে ব্যবস্থাটির পরিবর্তন কঠিন করার প্রস্তাব স্থায়িত্বের প্রশ্ন সামনে আনে। কিন্তু কঠিনভাবে পরিবর্তনযোগ্য একটি বিধান নিজে থেকেই ভালো বিধান হয়ে যায় না। দুর্বল বাছাইপদ্ধতি বা অস্পষ্ট দায়িত্ব সাংবিধানিক সুরক্ষা পেলেও তা দুর্বলই থাকবে। স্থায়িত্বের সুরক্ষা দেওয়ার আগে ব্যবস্থার গঠন, ক্ষমতার সীমা ও জবাবদিহি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা জরুরি। গণভোট হলে তার প্রশ্ন ও প্রভাবও জনগণের কাছে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করতে হবে।
রাজনৈতিক সম্মতি গুরুত্বপূর্ণ, তবে শুধু প্রধান দলগুলোর সমঝোতাই জনগণের আস্থার সমার্থক নয়। ছোট দল, নারী, সংখ্যালঘু, প্রতিবন্ধী ভোটার, তরুণ এবং স্থানীয় নাগরিক সংগঠনের অভিজ্ঞতাও আলোচনায় আসতে হবে। ক্ষমতা ভাগাভাগির গ্রহণযোগ্য সমীকরণ তৈরি হয়েছে কি না এবং একজন সাধারণ ভোটার নিরাপদে নিজের পছন্দ জানাতে পারবেন কি না—এই দুটি আলাদা প্রশ্ন। দ্বিতীয়টির উত্তর ছাড়া প্রথমটি অসম্পূর্ণ।
পরাজিত পক্ষের আচরণও আস্থার পরীক্ষার অংশ। যথাযথভাবে যাচাইযোগ্য ফল হলে তা মেনে নেওয়ার রাজনৈতিক প্রস্তুতি থাকতে হবে। আবার ফল গ্রহণের আহ্বান দিয়ে প্রমাণভিত্তিক অভিযোগ থামিয়ে দেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়। অভিযোগকে পরীক্ষা করা এবং ভিত্তিহীন অভিযোগকে প্রত্যাখ্যান করা—দুটির জন্যই নিরপেক্ষ, দ্রুত ও বিশ্বাসযোগ্য প্রতিকারব্যবস্থা প্রয়োজন।
তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরলে নির্বাচনে আস্থা ফেরার সম্ভাবনা বাড়তে পারে, বিশেষ করে প্রতিদ্বন্দ্বী সরকারের নির্বাহী ক্ষমতা নিয়ে যে সন্দেহ থাকে তা কমানোর ক্ষেত্রে। কিন্তু আস্থা ফিরেছে কি না, তার পরীক্ষা হবে ব্যবস্থার নাম দিয়ে নয়। পরীক্ষা হবে প্রধানের গ্রহণযোগ্য বাছাই, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, প্রশাসনের সমান আচরণ, প্রার্থীদের সুযোগ, ভোটারের নিরাপত্তা এবং ফল যাচাইয়ের বাস্তব সক্ষমতায়।
বাংলাদেশের সামনে সুযোগটি হলো তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাকে একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনী প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গড়ে তোলা। এর জন্য সংবিধানে বিধান থাকার পাশাপাশি সেই বিধান কাজে প্রয়োগের প্রতিষ্ঠানগুলোও শক্ত হতে হবে। ভোটার যখন বুঝবেন তাঁর ভোট গণনা হয়েছে, প্রার্থী যখন দেখবেন নিয়ম সবার জন্য একই এবং অভিযোগকারী যখন কার্যকর প্রতিকার পাবেন—তখনই নির্বাচনে আস্থা ফিরবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার সেই পথ খুলতে পারে; পথটি সম্পূর্ণ করতে হবে নিয়ম, প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক আচরণ দিয়ে।
আপনার মতামত জানানঃ