বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের আকাশে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা মেঘ কি এবার ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে? নাকি দিল্লি-ঢাকার নতুন কূটনৈতিক যোগাযোগের আড়ালে তৈরি হচ্ছে আরও বড় কোনো সমঝোতার হিসাব? প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরকে ঘিরে সাম্প্রতিক তৎপরতা এই প্রশ্নগুলোই সামনে নিয়ে এসেছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, নয়াদিল্লি চাইছে চলতি আগস্টের শেষ নাগাদ অথবা সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে তারেক রহমানের একটি দ্বিপক্ষীয় সফর আয়োজন করতে। সফরটি সফল হলে পানি, জ্বালানি, বাণিজ্য, ভিসা এবং সামগ্রিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন দরজা খুলতে পারে বলে মনে করছে ভারতীয় পক্ষ।
ঘটনাটি শুধু একজন রাষ্ট্রপ্রধানের সফরের খবর নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে বদলে যাওয়া দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক বাস্তবতা, শেখ হাসিনাকে ঘিরে ভারত-বাংলাদেশের টানাপোড়েন, সীমান্ত ও পানিবণ্টন প্রশ্ন, বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ এবং বাংলাদেশকে ঘিরে ভারতের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থ। ফলে তারেক রহমানের দিল্লি সফর হলে সেটি নিছক সৌজন্য সফর হিসেবে দেখা কঠিন।
গত কয়েক মাসে দিল্লি ও ঢাকার মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা নতুন গতি পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রথম দিকেই তাঁকে অভিনন্দন জানান এবং ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানান। ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমানের শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা উপস্থিত হয়ে মোদির আমন্ত্রণপত্র তাঁর হাতে তুলে দেন।
এরপর জুলাইয়ে ভারত আবারও তারেক রহমানকে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানায়। বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য নয়; তবে ভারত এবার বিশেষ অতিথি হিসেবে বাংলাদেশকে যুক্ত করার উদ্যোগ নেয়। ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলন হওয়ার কথা রয়েছে।
তবে ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেওয়া আর দ্বিপক্ষীয় সফর—দুটিকে একই জিনিস হিসেবে দেখছে না কূটনৈতিক মহল। বাংলাদেশের জন্য একটি আলাদা দ্বিপক্ষীয় সফরের গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ সেখানে শুধু আন্তর্জাতিক একটি সম্মেলনে অংশ নেওয়া নয়, সরাসরি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে দর-কষাকষির সুযোগ থাকবে।
এই জায়গাতেই ভারতের আগ্রহের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। জুলাইয়ের শেষ দিকে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, দিল্লি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে স্বাগত জানাতে ‘অত্যন্ত আগ্রহী’ এবং সফরটি যত দ্রুত সম্ভব হওয়ার আশা করছে। তবে তিনি একই সঙ্গে স্পষ্ট করেন, সফরের সময় নির্ধারণ মূলত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকারের ওপর নির্ভর করবে।
আগস্টের শুরুতে পরিস্থিতি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১০ আগস্ট ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী ঢাকার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। এর আগে ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। রয়টার্সের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, ওই বৈঠকে তারেক রহমান দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
অর্থাৎ, একদিকে ভারত চাইছে দ্রুত সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে, অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্য শেখ হাসিনার প্রশ্নটি এখনো বড় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ইস্যু। শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন এবং তাঁর প্রত্যর্পণের বিষয়টি বাংলাদেশের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার যেকোনো উদ্যোগে এই বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার টেবিলে থাকবে।
ভারতের জন্য সমস্যাটি এখানেই। দিল্লি হয়তো সম্পর্ককে সামনে এগিয়ে নিতে চায়, কিন্তু বাংলাদেশ চাইছে তার সঙ্গে থাকা রাজনৈতিক অস্বস্তিগুলোরও সমাধান। ভারতীয় পক্ষ যদি মনে করে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যক্রম নিয়ে অতিরিক্ত চাপ দেওয়া হলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অগ্রগতি আটকে যেতে পারে, তাহলে বাংলাদেশের অবস্থানও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ ঢাকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের প্রশ্নটি এখনো অত্যন্ত স্পর্শকাতর।
তারেক রহমানের সম্ভাব্য সফরের সঙ্গে সবচেয়ে বড় যে বিষয়গুলো জড়িয়ে আছে, তার একটি হলো পানি। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের আলোচিত ইস্যু গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি। ১৯৯৬ সালের চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের শেষ দিকে শেষ হওয়ার কথা। ফলে চুক্তির নবায়ন সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গে দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা তীব্র হচ্ছে।
পানি বাংলাদেশের জন্য কেবল কূটনৈতিক কোনো ইস্যু নয়; এটি কৃষি, পরিবেশ, নদীর প্রবাহ, জীববৈচিত্র্য এবং কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যদিকে ভারতের কাছেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি পশ্চিমবঙ্গসহ সীমান্তবর্তী অঞ্চলের রাজনীতি ও পানিসম্পদের সঙ্গে যুক্ত। ফলে তারেক রহমানের দিল্লি সফরে গঙ্গার পানি একটি বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
এর সঙ্গে আছে জ্বালানি সহযোগিতা। বাংলাদেশ ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মোকাবিলা করছে এবং ভারতের সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা ইতিমধ্যে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নতুন চুক্তি বা বিদ্যমান সহযোগিতা সম্প্রসারণ হলে তা বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখতে পারে। ভারতের জন্যও এটি বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করার সুযোগ।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাণিজ্য। ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত বাংলাদেশি কিছু পণ্যের ওপর বাণিজ্যসংক্রান্ত বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল। দ্য হিন্দুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় সফরের মাধ্যমে এসব বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের পথ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাত এ ধরনের সিদ্ধান্তের প্রভাব অনুভব করতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ভারতের বাজার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আবার ভারতও বাংলাদেশের অন্যতম বড় বাণিজ্য অংশীদার। তাই রাজনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হলে তার প্রভাব দ্রুত বাণিজ্য ও ব্যবসায় গিয়ে পড়ে। বিপরীতে রাজনৈতিক আস্থা বাড়লে সীমান্ত বাণিজ্য, যোগাযোগ, বিনিয়োগ, জ্বালানি এবং আঞ্চলিক সংযোগের মতো বিষয়গুলোতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
ভিসা সুবিধাও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের রাজনৈতিক টানাপোড়েনে ভিসা কার্যক্রম নানা সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েছে। সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগী, ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া সহজ হওয়া দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার একটি দৃশ্যমান সংকেত হতে পারে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—ভারত কেন এত দ্রুত এই সফরটি আয়োজন করতে চাইছে?
এর একটি উত্তর পাওয়া যায় ভারতের বৃহত্তর আঞ্চলিক কৌশলে। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, বঙ্গোপসাগর, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি সম্ভাব্য সংযোগসেতু।
আরেকটি বাস্তবতা হলো চীন। বাংলাদেশের অবকাঠামো, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় চীনের উপস্থিতি গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তারেক রহমান সরকারের প্রথম দিকের বিদেশ সফরেও চীন গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পেয়েছে। ফলে ঢাকার সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে দিল্লি কোনো ধরনের কৌশলগত শূন্যতা তৈরি করতে চাইবে না। তারেক রহমানের সঙ্গে দ্রুত উচ্চপর্যায়ের সম্পর্ক তৈরি করা ভারতের জন্য সেই অর্থে একটি ভূরাজনৈতিক প্রয়োজনও।
তবে এটিকে ভারতের একতরফা উদ্যোগ হিসেবে দেখাও ঠিক হবে না। বাংলাদেশেরও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রয়োজন আছে। অর্থনীতি, বাণিজ্য, সীমান্ত, পানি, জ্বালানি, যোগাযোগ—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরতা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি উত্তেজনা কোনো পক্ষের জন্যই লাভজনক নয়।
তবে বাংলাদেশের অবস্থানও আগের মতো নয়। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ঢাকার পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তনের আলোচনা জোরালো হয়েছে। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান—সব পক্ষের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রাখার চেষ্টা এখন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফলে দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার অর্থ এই নয় যে ঢাকা ভারতের সব অবস্থান মেনে নেবে।
বরং সম্ভাব্য সফরটি হতে পারে দর-কষাকষির একটি বড় মঞ্চ। বাংলাদেশ চাইতে পারে পানি ও বাণিজ্যে বাস্তব সুবিধা, ভিসা সহজীকরণ, সীমান্তে উত্তেজনা কমানো এবং শেখ হাসিনাকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রশ্নে ভারতের সহযোগিতা। ভারত চাইতে পারে নিরাপত্তা সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক যোগাযোগে নিশ্চয়তা এবং বাংলাদেশে ভারতবিরোধী তৎপরতা কমানো।
এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—ভারতের মাটিতে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। দিল্লি যদি দ্রুত সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চায়, তাহলে এই বিষয়টি কীভাবে সামলানো হবে সেটিই হতে পারে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলোর একটি। কারণ বাংলাদেশে শেখ হাসিনাকে নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনি অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। আবার ভারতের কাছে তাঁকে ঘিরে নিজস্ব আইনি, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক হিসাব রয়েছে।
ফলে তারেক রহমানের সফর যদি শেষ পর্যন্ত হয়ও, সফরের সাফল্য শুধু ছবি তোলা বা যৌথ বিবৃতি প্রকাশের ওপর নির্ভর করবে না। আসল পরীক্ষা হবে—সেখান থেকে বাংলাদেশ কী পায় এবং ভারত কী পায়।
দুই দেশের সম্পর্কের ইতিহাস বলে, বড় বড় বৈঠক অনেক সময় দ্রুত আশাবাদ তৈরি করে, কিন্তু বাস্তব পরিবর্তন আসে ধীরে। পানি চুক্তি, সীমান্ত, বাণিজ্য কিংবা ভিসা—প্রতিটি বিষয়েই প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক জটিলতা রয়েছে। তাই একটি সফর রাতারাতি সব সমস্যার সমাধান করবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।
তারপরও সম্ভাব্য সফরটির প্রতীকী গুরুত্ব অনেক। ২০২৪ সালের আগস্টের পর যে সম্পর্ক একসময় অবিশ্বাস, অভিযোগ ও প্রকাশ্য কূটনৈতিক উত্তেজনায় পৌঁছেছিল, সেখান থেকে দুই দেশের নেতৃত্ব আবার আলোচনার টেবিলে ফিরছে। এটি নিজেই একটি পরিবর্তনের সংকেত।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—তারেক রহমান কি আগস্টের শেষেই দিল্লি যাবেন, নাকি সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন? ভারতীয় পক্ষ দ্রুততার পক্ষে থাকলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের। ব্রিকস সম্মেলন সামনে থাকায় সেপ্টেম্বরের দিল্লি সফরের জন্য একটি স্বাভাবিক কূটনৈতিক সুযোগও তৈরি হয়েছে। আবার তার আগেই দ্বিপক্ষীয় সফর হলে সেটি সম্পর্কের পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে আরও শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা দিতে পারে।
তবে সফরের সময়ের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হবে সফরের এজেন্ডা। যদি পানি, জ্বালানি, বাণিজ্য, ভিসা এবং রাজনৈতিক আস্থার মতো বিষয়গুলোতে বাস্তব অগ্রগতি হয়, তাহলে এটি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। আর যদি শুধু সৌজন্য বৈঠক ও কূটনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে পুরোনো সমস্যাগুলো আবারও সামনে আসবে।
দিল্লি এখন যে বার্তা দিচ্ছে, তার সারকথা হলো—সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জানালা খোলা আছে। ঢাকার বার্তাও প্রায় একই—সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে পারে, তবে বাংলাদেশের স্বার্থ ও সংবেদনশীল বিষয়গুলোকে উপেক্ষা করে নয়।
সুতরাং তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরকে শুধু একটি বিদেশ সফর হিসেবে দেখলে পুরো ছবিটা ধরা পড়বে না। এটি হতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশীর মধ্যে নতুন সমীকরণের সূচনা। একদিকে ভারতের কৌশলগত প্রয়োজন, অন্যদিকে বাংলাদেশের স্বার্থ ও নতুন পররাষ্ট্রনীতির ভারসাম্য—এই দুইয়ের সংঘাত ও সমন্বয়ের মধ্যেই নির্ধারিত হবে আগামী দিনের ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা তাই শুধু ‘তারেক রহমান কবে দিল্লি যাবেন?’ নয়। বড় প্রশ্ন হলো—তিনি দিল্লি গেলে কী নিয়ে ফিরবেন। পানি নিয়ে কোনো অগ্রগতি হবে কি? বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ উঠবে কি? ভিসা সহজ হবে কি? জ্বালানি সহযোগিতা বাড়বে কি? আর সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন—শেখ হাসিনাকে ঘিরে দুই দেশের রাজনৈতিক দূরত্ব কি কোনোভাবে কমানো সম্ভব হবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই বলে দেবে, ভারত সত্যিই সম্পর্ক পুনর্গঠনে কতটা প্রস্তুত এবং বাংলাদেশ কতটা শক্ত অবস্থান থেকে সেই আলোচনায় বসতে পারছে। সম্ভাব্য দিল্লি সফর তাই দুই দেশের জন্য একই সঙ্গে একটি সুযোগ এবং একটি পরীক্ষা। সফল হলে এটি দীর্ঘদিনের শীতলতা কাটিয়ে নতুন বাস্তববাদী সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি করতে পারে। ব্যর্থ হলে প্রমাণ হবে, কূটনৈতিক যোগাযোগ শুরু করা যতটা সহজ, পারস্পরিক আস্থার সংকট কাটানো ততটা সহজ নয়।
আপনার মতামত জানানঃ