দেশে টানা প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে চলা তীব্র গ্যাস সংকট এখন আর শুধু বাসাবাড়ির রান্না কিংবা বিদ্যুৎ উৎপাদনের সমস্যা নয়। সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসে পড়েছে শিল্প খাতে। গ্যাসের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহেও নতুন করে টান পড়ায় দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে একের পর এক কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কোথাও পুরোপুরি মেশিন বন্ধ, কোথাও অর্ধেক সক্ষমতায় চলছে উৎপাদন, আবার কোনো কোনো কারখানায় শ্রমিকরা কর্মস্থলে উপস্থিত থেকেও কাজ পাচ্ছেন না।
বিশেষ করে স্টিল, কাচ, সিরামিক, সিমেন্ট, টেক্সটাইল, স্পিনিং, ডাইং ও বিভিন্ন গ্যাসনির্ভর ভারী শিল্পের পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ। উৎপাদন বন্ধ থাকায় শুধু শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ক্ষতিই বাড়ছে না, এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে সরবরাহব্যবস্থা, কর্মসংস্থান, স্থানীয় বাজার, রপ্তানি এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে। উদ্যোক্তারা বলছেন, সংকট দীর্ঘ হলে এর প্রভাব শুধু কারখানার গেটের ভেতর সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা বাজার ও ভোক্তার জীবনেও পৌঁছে যাবে।
গত বৃহস্পতিবার দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের চিত্র ছিল উদ্বেগজনক। গ্যাসনির্ভর ভারী শিল্পের বেশির ভাগ কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর একাধিক কারখানাও অচল হয়ে পড়ে। স্থানীয় বাজারে ভোজ্যতেল, আটা, ময়দা, সুজি, চিনি, সিমেন্ট, কাগজ, রাসায়নিকসহ নানা পণ্যের সরবরাহে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
দেশের অন্যতম বড় শিল্পগোষ্ঠী মেঘনা গ্রুপের সব কারখানা গত বুধবার থেকে বন্ধ থাকার কথা জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামালের ভাষ্য, কারখানাগুলোতে উৎপাদন চালিয়ে নেওয়ার মতো ন্যূনতম গ্যাসও পাওয়া যাচ্ছে না। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুৎ সংকট। ফলে পুরো উৎপাদন ব্যবস্থা বন্ধ রাখতে হয়েছে।
মেঘনা গ্রুপের ব্যবসার পরিধি বিশাল। ভোজ্যতেল, আটা, ময়দা, সুজি ও চিনি থেকে শুরু করে সিমেন্ট, পেপার, এলপিজি, ফিড ও কেমিক্যাল—বিভিন্ন ধরনের পণ্য উৎপাদন করে প্রতিষ্ঠানটি। তাদের শিল্প ইউনিটের সংখ্যা ৫৭টি। দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের পাশাপাশি তারা ৫২টি দেশে পণ্য রপ্তানি করে। ফলে এত বড় একটি শিল্পগোষ্ঠীর উৎপাদন একসঙ্গে বন্ধ হয়ে যাওয়ার অর্থ শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি নয়; এর সঙ্গে যুক্ত সরবরাহকারী, পরিবেশক, পরিবহনব্যবস্থা, খুচরা বিক্রেতা এবং ভোক্তাদের ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।
মেঘনা গ্রুপের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, উৎপাদন বন্ধ থাকলেও সরবরাহকারী ও গ্রাহকদের কাছ থেকে নিয়মিত পণ্যের চাহিদা আসছে। কিন্তু কারখানা চালু না থাকলে সেই চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে বাজারে পণ্য সরবরাহব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শুধু মেঘনা গ্রুপ নয়, টি কে গ্রুপের উৎপাদন ব্যবস্থাও প্রায় পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে। প্রতিষ্ঠানটির কেমিক্যাল, ভোজ্যতেল ও সিমেন্ট কারখানাগুলোতে কয়েক দিন ধরে উৎপাদন বন্ধ। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ ও গজারিয়ায় থাকা কারখানাগুলোও গ্যাস সংকটের কারণে কার্যত থমকে আছে।
এ অবস্থায় উদ্যোক্তাদের একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—সরকারের সীমিত গ্যাস সরবরাহ কোন খাতে কতটা দেওয়া হবে, সেই অগ্রাধিকার কীভাবে নির্ধারণ করা হচ্ছে? শিল্প উদ্যোক্তাদের কেউ কেউ মনে করছেন, বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদনের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে শিল্প খাতে গ্যাসের সরবরাহ এতটাই কমে গেছে যে বিপুল সংখ্যক কারখানা বন্ধ হয়ে পড়ছে। তাদের যুক্তি, একটি খাত সচল রাখতে গিয়ে যদি শত শত শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর ক্ষতি আরও বড় হতে পারে।
গ্যাস সংকটের বড় ধাক্কা লেগেছে আরএফএল গ্রুপেও। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আর এন পাল জানিয়েছেন, তাদের কারখানাগুলোতে উৎপাদন প্রায় ৫০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। হবিগঞ্জ, নরসিংদী ও গাজীপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলে তাদের মোট উৎপাদনের বড় অংশ সম্পন্ন হয়। এসব এলাকায় গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ায় কারখানার উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বিকল্প হিসেবে ডিজেল কিংবা পল্লী বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করার চেষ্টা করা হলেও তাতে উৎপাদন ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। প্লাস্টিক, পিভিসি পাইপ, ফুটওয়্যার ও ইলেকট্রনিকসের মতো নন-ফুড পণ্যের উৎপাদনেও এর প্রভাব পড়ছে। অর্থাৎ গ্যাসের ঘাটতি এখন কেবল ভারী শিল্পে নয়, ভোক্তাপণ্য উৎপাদনেও চাপ তৈরি করছে।
হবিগঞ্জের শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতিও একই রকম। সেখানে প্রাণ-আরএফএল, স্কয়ার, যমুনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক, ট্রান্সকম, বাদশা, সায়হাম ও বেঙ্গলসহ বড় শিল্পগোষ্ঠীর বহু কারখানা রয়েছে। গত বুধবার থেকে এসব কারখানার ১৭১টিতে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানা গেছে। এর ফলে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে এবং দেড় লাখের বেশি শ্রমিক অলস সময় পার করছেন।
শ্রমিকদের জন্য এ পরিস্থিতি নতুন ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। একটি কারখানা বন্ধ থাকলে সবচেয়ে আগে প্রশ্ন ওঠে শ্রমিকদের কাজ ও মজুরি নিয়ে। সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ থাকলেও যদি সংকট দীর্ঘ হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আর্থিক চাপ বাড়বে। সেই চাপ শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের কর্মসংস্থানেও প্রভাব ফেলতে পারে।
গাজীপুরের চিত্রও খুব একটা ভিন্ন নয়। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলটিতে হাজার হাজার কারখানা রয়েছে। গ্যাস সংকটের কারণে সেখানে শত শত কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। শিল্প পুলিশের হিসাবে, গাজীপুর জেলা ও মহানগরে প্রায় সাড়ে তিন হাজার শিল্পকারখানার মধ্যে গ্যাস সংকটের কারণে ১২ থেকে ১৫ শতাংশ কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। সংখ্যার হিসাবে তা প্রায় ৫২৫টি কারখানা।
যেসব বড় কারখানা বিকল্প ব্যবস্থায় উৎপাদন চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে, সেগুলোরও উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ফলে কারখানার ভেতরে মেশিনের শব্দ কমে গেছে, উৎপাদন লাইনে তৈরি হয়েছে স্থবিরতা। কোথাও শ্রমিকদের ছুটি দেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও শ্রমিকরা কর্মস্থলে উপস্থিত থেকেও কাজের অপেক্ষায় বসে থাকছেন।
শফিপুর ও গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্প এলাকায় ঘুরলে এই সংকটের বাস্তব চিত্র আরও স্পষ্ট হয়। কোনো কারখানায় মেশিন পুরোপুরি বন্ধ, কোনো কারখানায় সীমিত উৎপাদন চলছে। এস এ স্পিনিং মিলসসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উৎপাদন কার্যক্রম থেমে গেছে।
তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বস্ত্র ও তৈরি পোশাকশিল্পে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক খাতের গুরুত্ব বিবেচনায় এ খাতে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব বহুমাত্রিক হতে পারে। শুধু স্থানীয় বাজার নয়, রপ্তানি বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
তৈরি পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গ্যাসের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংকটের কারণে অনেক কারখানার উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। কয়েক দিন ধরে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। ফলে অনেক কারখানাই নির্ধারিত সময়ে উৎপাদন করতে পারছে না।
নিট পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিকেএমইএর পক্ষ থেকেও একই ধরনের উদ্বেগ জানানো হয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যে বিদ্যুৎ সংকট ভয়াবহ আকার নিয়েছে বলে উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন। অনেক কারখানা বন্ধ রাখতে হয়েছে। সংকট দীর্ঘ হলে উৎপাদন ও রপ্তানি উভয় ক্ষেত্রেই বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে।
বস্ত্রকলগুলোর ওপরও এর প্রভাব পড়েছে। তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য ফেব্রিক্সের বড় একটি অংশ দেশের বস্ত্রকলগুলো সরবরাহ করে। কিন্তু গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবে বেশির ভাগ বস্ত্রকলই উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। যেসব কারখানা খোলা রয়েছে, সেগুলোও পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।
ডেনিম, ডাইং ও ফিনিশিংয়ের মতো খাতগুলো বিশেষভাবে ঝুঁকির মুখে। এসব উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় গ্যাসের প্রয়োজনীয়তা বেশি। স্পিনিং মিলগুলো কোনোভাবে বিদ্যুতের মাধ্যমে চালানোর চেষ্টা করলেও গ্যাসের অভাবে চিলার বন্ধ হয়ে গেলে কারখানার ভেতরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এতে উৎপাদিত সুতার মানও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ডিজেল ব্যবহার করার চেষ্টা করছেন অনেক উদ্যোক্তা। কিন্তু এতে উৎপাদন খরচ এতটাই বেড়ে যাচ্ছে যে দীর্ঘমেয়াদে এই পদ্ধতি টেকসই নয়। একটি বড় শিল্পগোষ্ঠীতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ডিজেল প্রয়োজন হচ্ছে এবং এর পেছনে কয়েক কোটি টাকার পরিবর্তে কয়েক দশ লাখ টাকা পর্যন্ত দৈনিক ব্যয় হচ্ছে। এভাবে উৎপাদন চালিয়ে গেলে পণ্য তৈরি হলেও লাভের বদলে লোকসানের বোঝা বাড়বে।
এখানেই সংকটের সবচেয়ে কঠিন দিকটি সামনে আসে। শিল্পকারখানা চালু রাখতে জ্বালানি প্রয়োজন, কিন্তু বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। আবার উৎপাদন বন্ধ রাখলে শ্রমিক, যন্ত্রপাতি, ঋণের কিস্তি, সরবরাহকারী ও ক্রেতাদের সঙ্গে চুক্তি—সবকিছুর ওপর চাপ পড়ে। অর্থাৎ উদ্যোক্তাদের সামনে কোনো সহজ পথ নেই।
আরেকটি বড় আশঙ্কা হলো বিদেশি ক্রেতা হারানোর ঝুঁকি। তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিমুখী শিল্পে সময়মতো পণ্য সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি কারখানা যদি নির্ধারিত সময়ে অর্ডার সরবরাহ করতে না পারে, তাহলে বিদেশি ক্রেতা বিকল্প উৎসের দিকে যেতে পারেন। দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্কও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এই সংকটের পেছনে গ্যাস সরবরাহের ভারসাম্যও গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে। সার উৎপাদনেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাস যাচ্ছে। একই সঙ্গে বাসাবাড়ির চাহিদা পূরণের চাপ রয়েছে। ফলে শিল্প খাতে সরবরাহের পরিমাণ কমে গেছে।
জ্বালানি খাতের কর্মকর্তাদের হিসাবে, তিন সপ্তাহ আগেও শিল্প, বাসাবাড়ি ও অন্যান্য খাতে যে পরিমাণ গ্যাস দেওয়া হতো, বর্তমানে তার তুলনায় সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। শিল্প খাতে সরবরাহ আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। যদি এমনটা হয়, তাহলে বর্তমানে আংশিকভাবে চালু থাকা অনেক কারখানাও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
সংকটের প্রভাব শিল্পাঞ্চলের বাইরেও পৌঁছেছে। জামালপুরে গ্যাস সংকটের প্রতিবাদে সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহনের চালকেরা সড়ক অবরোধ করেছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেও একই ধরনের বিক্ষোভ হয়েছে। অর্থাৎ শিল্পের জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি পরিবহন খাতেও এর প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
এ অবস্থায় সরকারকে একই সঙ্গে কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় নিতে হচ্ছে—বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার উৎপাদন, বাসাবাড়ির গ্যাস এবং শিল্পের উৎপাদন। প্রতিটি খাতেরই নিজস্ব গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু একটি খাতকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে অন্য খাতের উৎপাদন পুরোপুরি থেমে গেলে সামগ্রিক অর্থনীতিতে তার মূল্য কতটা হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
শিল্প উদ্যোক্তাদের দাবি, জরুরি ভিত্তিতে শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো প্রয়োজন। তাদের মতে, সংকট যদি আরও কয়েক দিন স্থায়ী হয়, তাহলে অনেক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে লোকসান বহন করা কঠিন হয়ে যাবে। রপ্তানিমুখী শিল্পে এর প্রভাব পড়লে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।
গ্যাস সংকটের এই চিত্র তাই কেবল কয়েকটি কারখানা বন্ধ হওয়ার খবর নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শ্রমিকের কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তার বিনিয়োগ, বাজারে পণ্যের সরবরাহ, রপ্তানি আয় এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। আজ একটি কারখানার মেশিন বন্ধ, কাল হয়তো তার প্রভাব পড়বে কোনো পণ্যের দামে। আজ কোনো শ্রমিক কাজ ছাড়া কারখানায় বসে আছেন, দীর্ঘ সংকট হলে কাল তাঁর আয় নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের শিল্প অর্থনীতি বহু বছর ধরে গ্যাস ও বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে। তাই জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তার ধাক্কা পুরো উৎপাদন ব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়া স্বাভাবিক। বর্তমান পরিস্থিতি সেই বাস্তবতাই সামনে নিয়ে এসেছে।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন সংকটের দ্রুত সমাধান করা এবং একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি একটি স্থিতিশীল জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে এগোনো। কারণ শিল্পের জন্য শুধু আজকের গ্যাস নয়, আগামী দিনের নির্ভরযোগ্য সরবরাহও দরকার। উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করবেন তখনই, যখন তাঁরা জানবেন কারখানা চালানোর মতো জ্বালানি নিয়মিত পাওয়া যাবে।
নইলে দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে মেশিন থাকবে, শ্রমিক থাকবে, অর্ডার থাকবে—কিন্তু উৎপাদন থাকবে না। আর উৎপাদন না থাকলে অর্থনীতির চাকা সচল রাখাও কঠিন হয়ে পড়বে। তাই বর্তমান গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, জ্বালানি সরবরাহ কোনো একক খাতের সমস্যা নয়; এটি পুরো অর্থনীতির প্রাণপ্রবাহের সঙ্গে যুক্ত। সেই প্রবাহে দীর্ঘস্থায়ী বাধা তৈরি হলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে দেশের প্রতিটি ঘরে, প্রতিটি বাজারে এবং প্রতিটি কর্মজীবী মানুষের জীবনে।
আপনার মতামত জানানঃ