২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টে বাংলাদেশে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থান দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীন সরকারের পতন ঘটে এবং দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। কিন্তু আন্দোলনের এক বছর পেরিয়ে গেলেও একটি প্রশ্ন এখনো স্পষ্টভাবে মীমাংসিত হয়নি—এই আন্দোলনে প্রকৃতপক্ষে কতজন নিহত হয়েছেন? বিভিন্ন সময় সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা, মানবাধিকার সংগঠন, হাসপাতাল, রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যা প্রকাশ করা হয়েছে। ফলে নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক থামেনি।
যেকোনো বড় গণআন্দোলন বা সংঘর্ষের পর প্রাণহানির সঠিক হিসাব নির্ধারণ করা একটি জটিল কাজ। বিশেষ করে যখন ঘটনাগুলো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকে, যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, প্রশাসনিক কাঠামো অকার্যকর হয়ে যায় এবং তথ্য সংগ্রহে নানা সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ক্ষেত্রেও ঠিক এমনটাই ঘটেছে। রাজধানী ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুর, সিলেট, বরিশাল, কুমিল্লাসহ দেশের প্রায় সব বড় শহরে সংঘর্ষ হয়েছে। কোথাও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে, কোথাও সংঘর্ষে, কোথাও অগ্নিকাণ্ডে কিংবা চিকিৎসার অভাবে মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এসব ঘটনার অনেকগুলোর তাৎক্ষণিক নথিভুক্তি হয়নি।
নিহতের সংখ্যা নিয়ে সবচেয়ে বড় জটিলতা শুরু হয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পৃথক তথ্য প্রকাশের কারণে। একটি সংস্থা কেবল গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের তালিকা করেছে, অন্য একটি সংস্থা হাসপাতালে মৃত্যুবরণকারীদের অন্তর্ভুক্ত করেছে। আবার কেউ কেউ আন্দোলন চলাকালে সংঘর্ষ-সংশ্লিষ্ট সব ধরনের মৃত্যুকেই একই তালিকায় রেখেছে। ফলে একটি তালিকার সঙ্গে আরেকটি তালিকার সরাসরি মিল পাওয়া যায় না।
অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, একজন ব্যক্তি প্রথমে নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছেন, পরে হাসপাতালে মারা গেছেন, আবার অন্য একটি সংস্থা তাঁকে আলাদা করে নতুনভাবে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এতে একই ব্যক্তির নাম একাধিক তালিকায় চলে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিপরীত ঘটনাও ঘটেছে। অনেক পরিবারের সদস্য ভয়ে কিংবা নিরাপত্তাজনিত কারণে কারও মৃত্যুর তথ্য সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশ করেননি। ফলে কিছু মৃত্যুর তথ্য দীর্ঘ সময় পরে সামনে এসেছে।
আন্দোলনের সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। মোবাইল নেটওয়ার্কও বারবার বন্ধ হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের ওপরও নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা ছিল। অনেক সাংবাদিক ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারেননি। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ সম্ভব হয়নি। পরবর্তী সময়ে যখন তথ্য সংগ্রহ শুরু হয়, তখন অনেক প্রমাণ নষ্ট হয়ে যায় অথবা প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যে পার্থক্য দেখা দেয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো—‘নিহত’ বলতে কাদের বোঝানো হবে, সে বিষয়ে একক সংজ্ঞার অভাব। কেউ যদি গুলিবিদ্ধ হয়ে এক সপ্তাহ পরে হাসপাতালে মারা যান, তাঁকে কি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নিহত হিসেবে ধরা হবে? আবার কেউ যদি সংঘর্ষের সময় আহত হয়ে কয়েক মাস পরে মৃত্যুবরণ করেন, তাঁর মৃত্যুও কি একই তালিকায় থাকবে? এসব প্রশ্নের একক উত্তর না থাকায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করেছে।
রাজনৈতিক অবস্থানও এই বিতর্ককে আরও জটিল করেছে। সরকার পরিবর্তনের পর নতুন প্রশাসন পূর্ববর্তী ঘটনার তদন্ত শুরু করে। অন্যদিকে ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক পক্ষ বিভিন্ন সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ফলে নিহতের সংখ্যা কেবল মানবিক বা পরিসংখ্যানগত বিষয় না থেকে রাজনৈতিক বিতর্কেরও অংশ হয়ে ওঠে। এক পক্ষ মনে করে প্রকৃত সংখ্যা কম দেখানো হচ্ছে, অন্য পক্ষের অভিযোগ সংখ্যা বাড়িয়ে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এই দ্বন্দ্ব সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর কাজও সহজ ছিল না। তারা সাধারণত প্রত্যক্ষ সাক্ষাৎকার, হাসপাতালের নথি, স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য, সংবাদ প্রতিবেদন এবং পরিবারের বক্তব্য মিলিয়ে তালিকা প্রস্তুত করে। কিন্তু আন্দোলনের মতো বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে সব তথ্য একই সময়ে সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। অনেক এলাকার তথ্য পেতে মাসের পর মাস লেগে গেছে। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিহতের তালিকাও পরিবর্তিত হয়েছে।
হাসপাতালের তথ্যেও সীমাবদ্ধতা ছিল। অনেক আহত ব্যক্তিকে সরকারি হাসপাতালের পরিবর্তে বেসরকারি হাসপাতাল বা স্থানীয় ক্লিনিকে নেওয়া হয়েছিল। আবার অনেকে চিকিৎসা না নিয়েই বাড়িতে ছিলেন। কেউ কেউ পরে মারা গেছেন। সব হাসপাতালের তথ্য এক জায়গায় সংরক্ষিত না থাকায় পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি কঠিন হয়ে পড়ে।
গ্রামের অনেক এলাকায় মৃত্যুর ঘটনা স্থানীয়ভাবে দাফন করা হয়েছে। সব ক্ষেত্রেই থানায় মামলা হয়নি কিংবা মৃত্যুসনদ তাৎক্ষণিকভাবে প্রস্তুত হয়নি। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই দাফন সম্পন্ন হয়েছে। ফলে পরে সেই তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে তদন্তকারীদের নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে।
অনেক পরিবার নিরাপত্তার আশঙ্কায় প্রকাশ্যে কথা বলতে চাননি। কেউ কেউ ধারণা করেছিলেন, তথ্য দিলে হয়রানির শিকার হতে পারেন। আবার কিছু পরিবার রাজনৈতিক পরিচয় প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক ছিল। ফলে নিহতদের প্রকৃত পরিচয় এবং মৃত্যুর পরিস্থিতি যাচাই করাও কঠিন হয়ে ওঠে।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা বাংলাদেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলেও তাদের তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে পুরোপুরি এক ছিল না। তারা যাচাইকৃত তথ্য প্রকাশে বেশি সতর্ক থাকে। কোনো তথ্য নিশ্চিত না হলে তা অন্তর্ভুক্ত করে না। অন্যদিকে স্থানীয় মানবাধিকার সংগঠন অনেক সময় প্রাথমিক তথ্যও তালিকাভুক্ত করে পরে যাচাই সম্পন্ন করে। এই পদ্ধতিগত পার্থক্যের কারণেও সংখ্যায় অমিল দেখা যায়।
ইতিহাসে এমন বিতর্ক নতুন নয়। বিশ্বের বহু গণআন্দোলন, বিপ্লব কিংবা সংঘর্ষের পর নিহতের সংখ্যা নিয়ে বছরের পর বছর গবেষণা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রথমদিকে প্রকাশিত সংখ্যার তুলনায় পরে সরকারি তদন্ত, বিচারিক কমিশন বা স্বাধীন গবেষণার মাধ্যমে নতুন তথ্য পাওয়া গেছে। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিহতের সংখ্যা পরিবর্তিত হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এখনো বিভিন্ন তদন্ত, বিচারিক কার্যক্রম এবং তথ্য যাচাই অব্যাহত রয়েছে। নতুন নতুন সাক্ষ্য, ভিডিও, হাসপাতালের নথি, পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এবং প্রশাসনিক কাগজপত্র পর্যালোচনা করে অনেক ঘটনার সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে। তাই ভবিষ্যতেও নিহতের তালিকায় পরিবর্তন আসতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল একটি সংখ্যা প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়। প্রতিটি নিহত ব্যক্তির পূর্ণ পরিচয়, কোথায়, কখন, কীভাবে মৃত্যু হয়েছে এবং সেই ঘটনার প্রমাণ কী—এসব তথ্য সংরক্ষণ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি নির্ভুল নামের তালিকা ভবিষ্যতের ইতিহাস, বিচার এবং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির জন্য অপরিহার্য।
নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিতর্কের আরেকটি দিক হলো নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়টি। আন্দোলনের সময় যাদের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছিল, তাঁদের কেউ পরে জীবিত ফিরে এসেছেন, আবার কারও মরদেহ পরে শনাক্ত হয়েছে। এই ধরনের ঘটনার কারণে প্রাথমিক তালিকা বারবার সংশোধন করতে হয়েছে।
অনেক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু সব ভিডিওর সময়, স্থান কিংবা ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। একই ভিডিও বিভিন্ন দাবি নিয়ে প্রচারিত হয়েছে। ফলে তথ্য যাচাইকারীদের জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। যাচাই ছাড়া এসব ভিডিওর ওপর ভিত্তি করে নিহতের সংখ্যা নির্ধারণ করলে ভুল হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
আবার কিছু ক্ষেত্রে একই ব্যক্তির নামের বানান ভিন্ন হওয়ায় আলাদা ব্যক্তি হিসেবে গণ্য হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন, হাসপাতালের নথি এবং পরিবারের দেওয়া তথ্যের মধ্যে অমিল থাকলে পরিচয় নিশ্চিত করতে সময় লেগেছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ঘটনার বিচারিক তদন্ত সম্পন্ন হওয়ার আগে চূড়ান্ত সংখ্যা ঘোষণা করা কঠিন। কারণ তদন্ত চলাকালে নতুন সাক্ষ্য বা ফরেনসিক তথ্য সামনে আসতে পারে। তাই অনেক দেশেই প্রাথমিক, অন্তর্বর্তী এবং চূড়ান্ত—এই তিন ধাপে হতাহতের হিসাব প্রকাশ করা হয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নিহতদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্কের মধ্যে একটি মানবিক বিষয়ও রয়েছে। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি জীবন এবং একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি। তাই এই বিষয়টিকে কেবল রাজনৈতিক বিতর্ক হিসেবে দেখলে প্রকৃত মানবিক মূল্যবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নিহতের সঠিক পরিচয় নিশ্চিত করা, তাঁদের পরিবারের প্রতি সম্মান দেখানো এবং যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
ভবিষ্যতে এই বিতর্ক কমাতে একটি স্বাধীন, স্বচ্ছ এবং প্রযুক্তিনির্ভর জাতীয় ডাটাবেস তৈরি করা প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। সেখানে হাসপাতাল, পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন, আদালত, মানবাধিকার সংস্থা এবং পরিবারের তথ্য সমন্বয় করে প্রতিটি ঘটনার পৃথক নথি সংরক্ষণ করা যেতে পারে। প্রয়োজনে ডিএনএ শনাক্তকরণ, ডিজিটাল আর্কাইভ এবং উন্মুক্ত তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থাও রাখা যেতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিতর্কের মূল কারণ একটি নয়; বরং এটি প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা, তথ্য সংগ্রহের জটিলতা, ভিন্ন সংজ্ঞা, রাজনৈতিক অবস্থান, অসম্পূর্ণ নথি, প্রযুক্তিগত প্রতিবন্ধকতা এবং চলমান তদন্ত—সবকিছুর সম্মিলিত ফল। তাই নির্ভুল সংখ্যা নির্ধারণের জন্য আবেগ নয়, প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক, স্বচ্ছ এবং স্বাধীন অনুসন্ধান। ইতিহাসের প্রতি দায়িত্বশীল হতে হলে প্রতিটি প্রাণহানির সত্য ঘটনা যথাযথভাবে নথিভুক্ত করা জরুরি। কারণ শেষ পর্যন্ত সংখ্যা নয়, প্রতিটি মানুষের জীবনই ইতিহাসের সবচেয়ে মূল্যবান দলিল।
আপনার মতামত জানানঃ