পৃথিবীর ইতিহাস শুধু মানুষের সভ্যতা কিংবা ডাইনোসরের গল্পে সীমাবদ্ধ নয়। কোটি কোটি বছরের এই দীর্ঘ যাত্রায় অসংখ্য ঘটনা পৃথিবীর ভূ-পৃষ্ঠ, জলবায়ু এবং জীবনের গতিপথ বদলে দিয়েছে। সেই ঘটনাগুলোর অন্যতম হলো মহাকাশ থেকে বিশাল উল্কাপিণ্ডের আঘাত। এত দিন বিজ্ঞানীরা জানতেন, প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে একটি বিশাল গ্রহাণুর আঘাতে ডাইনোসরদের বিলুপ্তির সূচনা হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা জানাচ্ছে, তারও বহু আগে—প্রায় ৩০০ কোটি বছর আগে—পৃথিবীতে আরও একটি ভয়াবহ মহাজাগতিক সংঘর্ষ ঘটেছিল, যা পৃথিবীর প্রাচীন ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার পিলবারা অঞ্চলের নর্থ পোল ডোম এলাকায় পরিচালিত গবেষণায় এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেছেন। তাদের দাবি, এটিই পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন পরিচিত উল্কাপাতের গর্ত, যার বয়স প্রায় ৩০০ কোটি বছর। অর্থাৎ ডাইনোসরের যুগের তুলনায় এটি দশ গুণেরও বেশি পুরোনো।
পৃথিবীর প্রাচীন ইতিহাস অনুসন্ধান করা সহজ কাজ নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, ক্ষয়প্রক্রিয়া এবং টেকটোনিক প্লেটের চলাচলের কারণে বহু প্রাচীন ভূতাত্ত্বিক নিদর্শন মুছে গেছে। ফলে পৃথিবীর আদিম যুগের কোনো ঘটনার সরাসরি প্রমাণ খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। এ কারণেই নর্থ পোল ডোম এলাকার এই আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
গবেষকদের মতে, বহু বছর ধরেই সন্দেহ ছিল যে এই অঞ্চলটি কোনো প্রাচীন উল্কাপাতের স্থান হতে পারে। তবে নির্ভুল প্রমাণের অভাবে বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক ছিল। আধুনিক খনিজ বিশ্লেষণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে এবার সেই বিতর্কের অবসান ঘটেছে। শিলার ভেতরে সংরক্ষিত খনিজের গঠন পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন যে এখানে একসময় বিশাল এক মহাজাগতিক সংঘর্ষ হয়েছিল।
এই গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘খনিজ ঘড়ি’ ব্যবহার করে সময় নির্ধারণ। পৃথিবীর কিছু খনিজ কোটি কোটি বছর ধরে প্রায় অপরিবর্তিত অবস্থায় টিকে থাকতে পারে। বিশেষ করে জিরকন নামের ক্ষুদ্র কিন্তু অত্যন্ত টেকসই খনিজ ভূতত্ত্বে সময় নির্ধারণের অন্যতম নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবে পরিচিত। প্রচণ্ড তাপ ও চাপের প্রভাবে জিরকনের অভ্যন্তরীণ গঠন পরিবর্তিত হয় এবং সেই পরিবর্তনের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা নির্ধারণ করতে পারেন, ঘটনাটি ঠিক কত বছর আগে ঘটেছিল।
নর্থ পোল ডোম এলাকার শিলায় পাওয়া জিরকনের বিশ্লেষণ থেকে জানা গেছে, প্রায় ৩০০ কোটি বছর আগে এখানে এক বিশাল উল্কাপিণ্ড আঘাত হেনেছিল। গবেষণার ফল আরও নিশ্চিত করতে বিজ্ঞানীরা অ্যাপাটাইট নামের আরেকটি খনিজও পরীক্ষা করেন। বিস্ময়করভাবে সেখান থেকেও একই সময়কাল পাওয়া যায়। দুটি পৃথক খনিজের বিশ্লেষণে একই ফলাফল আসায় গবেষণার নির্ভরযোগ্যতা আরও বেড়ে যায়।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, সেই সময় পৃথিবী আজকের মতো ছিল না। তখন পৃথিবীতে জটিল প্রাণের অস্তিত্ব ছিল না, এমনকি বর্তমান মহাদেশগুলোরও সৃষ্টি সম্পূর্ণ হয়নি। পৃথিবীর ভূ-পৃষ্ঠ ছিল তুলনামূলকভাবে অস্থিতিশীল এবং গ্রহটি তখনও ধীরে ধীরে নিজের বর্তমান রূপ ধারণ করছিল। এমন অবস্থায় বিশাল একটি উল্কার আঘাত স্থানীয় ভূত্বক, শিলা এবং পরিবেশে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটাতে পারে।
অনেক গবেষকের মতে, পৃথিবীর প্রাচীন মহাদেশ গঠনের পেছনেও এমন মহাজাগতিক সংঘর্ষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বিশাল আঘাতের ফলে ভূত্বকের কিছু অংশ গলে গিয়ে নতুন শিলা সৃষ্টি হতে পারে, আবার কোথাও ভূ-পৃষ্ঠ উঁচু বা নিচু হয়ে নতুন ভূ-প্রকৃতির জন্ম দিতে পারে। ফলে উল্কাপাত শুধু ধ্বংসই নয়, পৃথিবীর বিবর্তনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ডাইনোসরদের বিলুপ্তির সঙ্গে যুক্ত চিকশুলুব উল্কাপাতের কথা প্রায় সবাই জানেন। প্রায় ৬৬ মিলিয়ন বছর আগে বর্তমান মেক্সিকোর ইউকাতান উপদ্বীপে প্রায় ১০ কিলোমিটার ব্যাসের একটি গ্রহাণু আঘাত হানে। এর ফলে সৃষ্টি হয় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, ধুলিকণায় সূর্যের আলো বাধাগ্রস্ত হয়, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তিত হয় এবং পৃথিবীর প্রায় ৭৫ শতাংশ জীব বিলুপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু ৩০০ কোটি বছর আগের পৃথিবীতে এমন জটিল প্রাণী ছিল না। তাই সেই সংঘর্ষের প্রভাব ছিল মূলত ভূতাত্ত্বিক।
এই নতুন গবেষণা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও মনে করিয়ে দেয়—মহাজাগতিক সংঘর্ষ পৃথিবীর ইতিহাসে অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়। সৌরজগতের প্রায় সব গ্রহ ও উপগ্রহেই অসংখ্য উল্কাপাতের চিহ্ন রয়েছে। চাঁদের অসংখ্য গর্ত তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। পৃথিবীতেও এমন বহু গর্ত ছিল, কিন্তু ক্ষয়, আগ্নেয়গিরি ও প্লেট টেকটোনিকসের কারণে অধিকাংশই সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গেছে।
আধুনিক প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে এখন বিজ্ঞানীরা আগের তুলনায় অনেক সূক্ষ্মভাবে শিলা ও খনিজ বিশ্লেষণ করতে পারছেন। ফলে পৃথিবীর এমন সব ঘটনার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, যা কয়েক দশক আগেও কল্পনা করা কঠিন ছিল। জিওকেমিস্ট্রি, আইসোটোপ বিশ্লেষণ এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মাইক্রোস্কোপের সমন্বয়ে এখন কোটি কোটি বছর আগের ঘটনাও তুলনামূলক নির্ভুলভাবে পুনর্গঠন করা সম্ভব হচ্ছে।
কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, এই আবিষ্কার ভবিষ্যতের আরও অনেক গবেষণার পথ খুলে দেবে। পৃথিবীর অন্যান্য প্রাচীন শিলাস্তরেও একই ধরনের প্রমাণ খুঁজে দেখা হতে পারে। এতে পৃথিবীর আদিম ইতিহাস, মহাদেশ গঠন এবং প্রাচীন ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।
এই গবেষণার আরেকটি গুরুত্ব রয়েছে মহাকাশবিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও। সৌরজগতের প্রাথমিক সময়ে গ্রহ ও গ্রহাণুর সংঘর্ষ ছিল খুবই সাধারণ ঘটনা। পৃথিবীতে সেই সংঘর্ষগুলোর নিদর্শন যত বেশি পাওয়া যাবে, বিজ্ঞানীরা তত ভালোভাবে বুঝতে পারবেন কীভাবে সৌরজগতের গ্রহগুলো ধীরে ধীরে বর্তমান রূপ লাভ করেছে।
আজকের পৃথিবীতে বড় ধরনের উল্কাপাত খুবই বিরল হলেও ছোট আকারের মহাজাগতিক বস্তু প্রায় প্রতিদিনই পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে। অধিকাংশই বায়ুমণ্ডলে পুড়ে যায়। তবে বড় আকারের কোনো গ্রহাণু পৃথিবীর জন্য সম্ভাব্য ঝুঁকি হতে পারে। সে কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন মহাকাশ সংস্থা পৃথিবীর কাছাকাছি আসা গ্রহাণুগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছে এবং ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে সেগুলোর গতিপথ পরিবর্তনের প্রযুক্তিও উন্নয়ন করছে।
প্রায় ৩০০ কোটি বছর আগের এই উল্কাপাতের নির্ভুল সময় নির্ধারণ শুধু একটি নতুন বৈজ্ঞানিক তথ্য নয়; এটি পৃথিবীর জন্ম ও বিবর্তনের ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে একটি বড় অগ্রগতি। প্রতিটি নতুন আবিষ্কার আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবী একটি গতিশীল গ্রহ, যার অতীত অসংখ্য নাটকীয় ঘটনার সাক্ষী।
মানবসভ্যতার ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের, কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাস কয়েকশ কোটি বছরের। সেই বিশাল সময়ের প্রতিটি অধ্যায় ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে বিজ্ঞানীদের নিরলস গবেষণায়। পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার নর্থ পোল ডোমে পাওয়া এই প্রাচীন উল্কাপাতের প্রমাণ সেই দীর্ঘ ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যোগ করেছে। ভবিষ্যতে আরও উন্নত প্রযুক্তি ও গবেষণার মাধ্যমে হয়তো পৃথিবীর আরও প্রাচীন রহস্য উন্মোচিত হবে, যা আমাদের গ্রহ এবং মহাবিশ্ব সম্পর্কে নতুন উপলব্ধি এনে দেবে।
আপনার মতামত জানানঃ