যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতীকী বিজয় অনেক সময় বাস্তবতার চেয়ে বেশি আলোচিত হয়। ইতিহাসের পাতায় এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে, যেখানে একটি পতাকা উত্তোলন, একটি দুর্গ দখল কিংবা একটি কৌশলগত স্থানের নিয়ন্ত্রণকে বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু সেই প্রতীকী বিজয়ের আড়ালে অনেক সময় লুকিয়ে থাকে দীর্ঘমেয়াদি সংকট, সামরিক ব্যর্থতা এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। লেবাননের প্রায় ৯০০ বছরের পুরোনো বিউফোর্ট দুর্গ দখলকে ঘিরে ইসরায়েলে যে উচ্ছ্বাস দেখা যাচ্ছে, তা এমনই এক বাস্তবতার দিকে নতুন করে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
দক্ষিণ লেবাননের পাহাড়চূড়ায় অবস্থিত বিউফোর্ট দুর্গ মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। ক্রুসেডারদের নির্মিত এই দুর্গ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিভিন্ন সামরিক শক্তির নিয়ন্ত্রণে এসেছে। কৌশলগত অবস্থানের কারণে এটি শুধু একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন নয়, বরং সামরিক পর্যবেক্ষণ ও প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক অভিযানে ইসরায়েলি বাহিনী দুর্গটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর দেশটির গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার শুরু হয়। দুর্গের ওপর ইসরায়েলি পতাকা ও গোলানি ব্রিগেডের পতাকা উড়ানোর ছবি জাতীয় গৌরবের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই দখল কি সত্যিই যুদ্ধের গতিপথ বদলে দিতে সক্ষম? নাকি এটি একটি প্রতীকী অর্জন, যার মাধ্যমে চলমান সংঘাতের গভীর সমস্যাগুলো আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে?
মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, লেবাননে ইসরায়েলের অভিযান কখনোই সহজ ছিল না। ১৯৮২ সালের লেবানন যুদ্ধের সময়ও বিউফোর্ট দুর্গ দখল করতে গিয়ে ইসরায়েলি বাহিনী বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছিল। গোলানি ইউনিটের কমান্ডারসহ একাধিক সেনা নিহত হয়েছিল। সেই সময়ের যুদ্ধের স্মৃতি আজও অনেক ইসরায়েলির মনে দগদগে ক্ষত হয়ে রয়েছে। অথচ বর্তমান প্রজন্মের অনেকের কাছে সেই ইতিহাস প্রায় অজানা।
বর্তমান পরিস্থিতির বিশেষত্ব হলো, হিজবুল্লাহকে অনেকেই দুর্বল মনে করলেও বাস্তবে সংগঠনটি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েনি। বরং সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, তারা তাদের কৌশল পরিবর্তন করেছে। অতীতে হিজবুল্লাহ একটি আধা-সামরিক সংগঠন হিসেবে সুসংগঠিত কাঠামোয় কাজ করত। এখন তারা আরও বিকেন্দ্রীভূত ও নমনীয় কৌশল গ্রহণ করেছে। ছোট ছোট ইউনিট স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এবং গেরিলা যুদ্ধের কৌশলে ফিরে যাচ্ছে।
গেরিলা যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো অভিযোজন ক্ষমতা। প্রচলিত বাহিনীর মতো তাদের নির্দিষ্ট ফ্রন্টলাইন নেই। ফলে একটি এলাকা দখল করা মানেই পুরো প্রতিপক্ষকে পরাজিত করা নয়। বিউফোর্ট দুর্গ দখলের পরও হিজবুল্লাহর ড্রোন হামলা এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। বরং ইসরায়েলি বাহিনী লেবাননের আরও গভীরে প্রবেশ করায় তারা নতুন নতুন লক্ষ্যবস্তু খুঁজে পাচ্ছে।
ড্রোন যুদ্ধ বর্তমান সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা যোগ করেছে। অতীতে যুদ্ধের প্রধান শক্তি ছিল ট্যাংক, আর্টিলারি এবং যুদ্ধবিমান। এখন তুলনামূলক কম খরচের ড্রোনও বড় ধরনের সামরিক প্রভাব ফেলতে পারে। হিজবুল্লাহর ব্যবহৃত ড্রোনগুলো অনেক ক্ষেত্রে ফাইবার অপটিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে, যা এগুলোকে শনাক্ত ও প্রতিহত করা আরও কঠিন করে তুলছে। ইসরায়েলের মতো প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত সামরিক শক্তির জন্যও এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
ইসরায়েলের রাজনৈতিক বাস্তবতাও এই সংঘাতকে জটিল করে তুলেছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা ও সামরিক সাফল্যকে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন। কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর যে প্রশ্ন উঠেছিল, তা এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। এরপর গাজা যুদ্ধ, ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা এবং লেবানন সীমান্তে সংঘাত—সব মিলিয়ে ইসরায়েল এক দীর্ঘ নিরাপত্তা সংকটের মধ্যে রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে বিউফোর্ট দুর্গ দখল একটি রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে। এটি জনগণকে দেখানোর চেষ্টা করে যে সেনাবাহিনী এখনো সফলভাবে অভিযান পরিচালনা করছে। কিন্তু সামরিক বিজয়ের প্রতীকী চিত্র সব সময় বাস্তব পরিস্থিতিকে প্রতিফলিত করে না। যুদ্ধের প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় হতাহতের সংখ্যা, অর্থনৈতিক ক্ষতি, সামাজিক অস্থিরতা এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা পরিস্থিতির মাধ্যমে।
লেবানন সীমান্তে চলমান সংঘাতে ইতোমধ্যে বহু ইসরায়েলি সেনা নিহত ও আহত হয়েছে। অন্যদিকে লেবাননের সাধারণ মানুষও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা প্রায় ভেঙে পড়েছে। হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। কৃষি, ব্যবসা এবং স্থানীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
যুদ্ধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব। হিজবুল্লাহ বহু বছর ধরে নিজেদেরকে লেবাননের রক্ষাকবচ হিসেবে উপস্থাপন করে এসেছে। যখন ইসরায়েলি বাহিনী লেবাননের গভীরে প্রবেশ করে, তখন সংগঠনটি সেই ঘটনাকে নিজেদের প্রচারণায় ব্যবহার করতে পারে। তারা দাবি করতে পারে যে তারা বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়ছে। ফলে সামরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও রাজনৈতিক ও সামাজিক সমর্থন ধরে রাখার সুযোগ তৈরি হয়।
ইতিহাস বলে, কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে গেরিলা সংগঠনকে সম্পূর্ণ নির্মূল করা অত্যন্ত কঠিন। আফগানিস্তান, ইরাক, ভিয়েতনাম এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাত সেই বাস্তবতার সাক্ষ্য বহন করে। একটি সংগঠনের অবকাঠামো ধ্বংস করা সম্ভব হলেও তার আদর্শ, সমর্থনভিত্তি এবং স্থানীয় নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা অনেক বেশি কঠিন।
বিউফোর্ট দুর্গ দখলের মধ্য দিয়ে ইসরায়েল হয়তো একটি কৌশলগত সুবিধা অর্জন করেছে। দুর্গটির অবস্থান থেকে আশপাশের অঞ্চল পর্যবেক্ষণ করা সহজ। নির্দিষ্ট সামরিক স্থাপনায় হামলার ক্ষেত্রেও এটি সহায়ক হতে পারে। কিন্তু বৃহত্তর কৌশলগত প্রশ্ন হলো, এই সুবিধা কি যুদ্ধের সামগ্রিক চিত্র বদলে দিতে পারবে?
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আন্তর্জাতিক রাজনীতি। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের প্রধান মিত্র। কিন্তু ওয়াশিংটনেরও নিজস্ব কৌশলগত হিসাব রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে একাধিক ফ্রন্টে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে। একই সময়ে ইরান, উপসাগরীয় অঞ্চল এবং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখতে হয়।
নেতানিয়াহুর সামনে তাই দ্বৈত চ্যালেঞ্জ। একদিকে তাঁকে দেশের জনগণকে নিরাপত্তার আশ্বাস দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মিত্রদেরও সন্তুষ্ট রাখতে হচ্ছে। এই অবস্থায় সামরিক সাফল্যের প্রতীকী প্রদর্শন রাজনৈতিকভাবে লাভজনক হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে তা বাস্তব সমাধান এনে দিতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতগুলো সাধারণত সরল সমীকরণে ব্যাখ্যা করা যায় না। এখানে সামরিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয়, ঐতিহাসিক এবং ভূরাজনৈতিক উপাদান একসঙ্গে কাজ করে। একটি দুর্গ দখল বা একটি শহর নিয়ন্ত্রণ নেওয়া কখনো কখনো সংবাদ শিরোনাম হতে পারে, কিন্তু তা পুরো যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণ করে না।
বিউফোর্ট দুর্গের বর্তমান ঘটনাও সেই বাস্তবতার প্রতিফলন। ইসরায়েলি গণমাধ্যমে এটি গৌরবের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হলেও সমালোচকেরা মনে করেন, এর আড়ালে আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন চাপা পড়ে যাচ্ছে। হিজবুল্লাহ কীভাবে এখনো কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলছে, ড্রোন হামলা কেন থামছে না, সীমান্ত অঞ্চলের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে এবং এই সংঘাতের শেষ কোথায়—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
যুদ্ধক্ষেত্রে পতাকা উড়ানো সহজ, কিন্তু স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা অনেক কঠিন। বিউফোর্ট দুর্গের দেয়ালে আজ যে পতাকা উড়ছে, তা হয়তো একটি সাময়িক সামরিক অর্জনের প্রতীক। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘ সংঘাতের ইতিহাস আমাদের শেখায়, প্রকৃত বিজয় তখনই আসে যখন অস্ত্রের শব্দ থামে, মানুষ ঘরে ফিরতে পারে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আশা করতে শেখে।
সেই অর্থে বিউফোর্ট দুর্গ দখল হয়তো একটি সামরিক অধ্যায়, কিন্তু যুদ্ধের শেষ অধ্যায় নয়। বরং এটি এমন এক সংঘাতের নতুন পর্ব, যার পরিণতি এখনো অনিশ্চিত এবং যার উত্তর খুঁজছে পুরো মধ্যপ্রাচ্য।
আপনার মতামত জানানঃ