
বাংলাদেশের রেলক্রসিংগুলো আজ এক নীরব সংকটের প্রতীক, যেখানে প্রতিদিনই যেন জীবন আর মৃত্যুর মধ্যে লড়াই চলে। ঢাকার মগবাজার রেলক্রসিংয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গেটকিপার মোহাম্মদ শাহিনের চোখে সেই বাস্তবতার ছাপ স্পষ্ট। তার কাজ কাগজে-কলমে সহজ—ট্রেন আসার আগেই সতর্ক থাকা—কিন্তু বাস্তবে এটি এক অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব। তিনি প্রতিনিয়ত মানুষের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করেন, কখনো পথচারীদের সরিয়ে দেন, কখনো গাড়িচালকদের থামান। ট্রেন যখন গর্জে ওঠে, তখন তিনি মাত্র কয়েক ফুট দূরে দাঁড়িয়ে সংকেত দেন, নিজের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে রেখে। এই দৃশ্য শুধু একটি পেশার চিত্র নয়, এটি বাংলাদেশের রেল নিরাপত্তার বাস্তবতা।
গত এক দশকে বাংলাদেশে রেল দুর্ঘটনায় ১০ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৩,৬৫৬ জন মারা গেছেন শুধুমাত্র লেভেল ক্রসিংয়ে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন একজন মানুষ এই ক্রসিংগুলোতে প্রাণ হারাচ্ছেন। এই পরিসংখ্যান ভয়াবহ হলেও বাস্তবতা আরও কঠিন। দেশের প্রায় ৩,৩০৬টি রেলক্রসিংয়ের মধ্যে প্রায় ৩৯ শতাংশই অননুমোদিত, যেখানে কোনো সুরক্ষা ব্যবস্থা নেই। অনুমোদিত ক্রসিংগুলোর মধ্যেও প্রায় ৪২ শতাংশে নেই কোনো গেটকিপার। ফলে অনেক জায়গায় মানুষকে নিজেদের ঝুঁকিতে রাস্তা পার হতে হয়, যেখানে সামান্য অসাবধানতাই মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ দুর্ঘটনা এই সংকটের একটি স্পষ্ট উদাহরণ। ঈদের সময় একটি আন্তঃজেলা বাসের সঙ্গে ট্রেনের সংঘর্ষে ১২ জন প্রাণ হারান এবং বহু মানুষ আহত হন। ট্রেনটি বাসটিকে প্রায় ৭০০ মিটার টেনে নিয়ে যায়, যা দুর্ঘটনার ভয়াবহতা বুঝিয়ে দেয়। দুর্ঘটনার পর দায় চাপানো হয় গেটকিপারদের ওপর, তাদের অবহেলাকে মূল কারণ হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু তদন্তে উঠে আসে ভিন্ন চিত্র। ঘটনাস্থলে কোনো কার্যকর সিগন্যাল, সাইরেন বা বিদ্যুৎ ছিল না। ট্রেন আসার আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা কার্যকর ছিল না। এমনকি দুর্ঘটনার কয়েক সপ্তাহ পরেও স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম পুরোপুরি সচল হয়নি।
এই দুর্ঘটনার পেছনে একাধিক স্তরের ব্যর্থতা কাজ করেছে। গেটকিপাররা দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন এবং দুর্ঘটনার সময় তারা ঘুমিয়ে ছিলেন। পাশাপাশি, আগের স্টেশন থেকে কোনো সতর্কবার্তা পাঠানো হয়নি। সিগন্যাল ব্যবস্থা অকার্যকর ছিল এবং আশপাশে অবৈধ নির্মাণ কাজের কারণে চালকের দৃষ্টিসীমা বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। অর্থাৎ, যে চারটি স্তরের নিরাপত্তা থাকার কথা—মানবিক সতর্কতা, প্রযুক্তিগত সিগন্যাল, প্রশাসনিক যোগাযোগ এবং অবকাঠামোগত স্বচ্ছতা—সবগুলোই একসঙ্গে ব্যর্থ হয়েছিল।
বাংলাদেশ রেলওয়ের আরেকটি বড় সমস্যা হলো জনবল সংকট। অনুমোদিত প্রায় ৪৭ হাজার পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ২৩ হাজারের মতো মানুষ। ফলে একজন কর্মকর্তাকে প্রায় ৫০টিরও বেশি ক্রসিং তদারকি করতে হয়, যা কার্যত অসম্ভব। গেটকিপারদের কাজের সময়ও অত্যন্ত চাপপূর্ণ। নিয়ম অনুযায়ী ৮ ঘণ্টার শিফট থাকলেও বাস্তবে তা অনেক সময় ১৬ বা ২৪ ঘণ্টায় পরিণত হয়। কোনো সাপ্তাহিক ছুটি বা পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ না থাকায় তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। এই ক্লান্তি অনেক সময় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
অন্যদিকে, অনেক গেটকিপার কাজ করেন অস্থায়ী ভিত্তিতে, দৈনিক মজুরিতে। তারা কোনো স্থায়ী সুবিধা পান না, নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম বা আর্থিক সুরক্ষা। এমনকি কর্মরত অবস্থায় মৃত্যু হলে তাদের পরিবার তেমন কোনো সহায়তাও পায় না। এই অবহেলা শুধু মানবিক দিক থেকেই নয়, বরং পেশাগত দিক থেকেও বড় একটি সমস্যা সৃষ্টি করে।
রেলক্রসিংগুলোর অবকাঠামোগত দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অনেক জায়গায় সিগন্যাল কাজ করে না, সতর্কতামূলক আলো বা সাইরেন নেই, অথবা থাকলেও তা নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অকার্যকর হয়ে পড়ে। কোথাও কোথাও অবৈধ স্থাপনার কারণে ট্রেনের দৃষ্টিসীমা বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে চালক ও পথচারীরা ট্রেন আসার আগাম ধারণা পান না।
এই সমস্যার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাব। রেলওয়ে, সড়ক বিভাগ এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় না থাকায় অনেক সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে থেকে যায়। যেমন, অবৈধ ক্রসিংগুলো বন্ধ করা বা সেগুলোকে নিরাপদ করা, সিগন্যাল ব্যবস্থার উন্নয়ন, কিংবা নিয়মিত তদারকি—এসব ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগের অভাব রয়েছে।
এই দুর্ঘটনাগুলোর প্রভাব শুধু প্রাণহানিতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের জীবনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও অনেক সময় তা বাস্তবে কার্যকর হয় না। ফলে তারা একদিকে প্রিয়জন হারানোর শোক, অন্যদিকে আর্থিক সংকটে পড়ে যান। অনেক পরিবার চিকিৎসার খরচ বহন করতে গিয়ে ঋণের বোঝা বইতে বাধ্য হয়।
বাংলাদেশের রেলব্যবস্থা দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন মাধ্যম হলেও এর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখনো অনেকাংশে দুর্বল। এই পরিস্থিতি পরিবর্তন করতে হলে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রথমত, পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ করতে হবে এবং গেটকিপারদের জন্য মানবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আধুনিক সিগন্যালিং ব্যবস্থা চালু করে তা নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। তৃতীয়ত, অবৈধ ক্রসিংগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো বন্ধ বা নিরাপদ করতে হবে। চতুর্থত, প্রশাসনিক সমন্বয় জোরদার করতে হবে যাতে দ্রুত সমস্যা সমাধান সম্ভব হয়।
একই সঙ্গে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করাও অত্যন্ত জরুরি। অনেক দুর্ঘটনা ঘটে মানুষের অসাবধানতার কারণে। তাই পথচারী ও চালকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে তারা রেলক্রসিং পার হওয়ার সময় সতর্ক থাকে।
মোহাম্মদ শাহিনের মতো হাজারো গেটকিপার প্রতিদিন নিজেদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে রেখে কাজ করছেন। তাদের এই নীরব সংগ্রাম আমাদের চোখে না পড়লেও, তাদের ওপর নির্ভর করে অসংখ্য মানুষের জীবন। তাই তাদের কাজের পরিবেশ উন্নত করা এবং তাদের যথাযথ সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
বাংলাদেশের রেলক্রসিংগুলো আজ যে অবস্থায় আছে, তা দীর্ঘদিনের অবহেলার ফল। কিন্তু এই অবস্থা পরিবর্তন করা অসম্ভব নয়। সঠিক পরিকল্পনা, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা গেলে এই মৃত্যুর মিছিল থামানো সম্ভব। কারণ প্রতিটি জীবন মূল্যবান, এবং একটি দুর্ঘটনাও যেন আর না ঘটে—এই লক্ষ্য নিয়েই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।
আপনার মতামত জানানঃ